মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতির পরিপ্রেক্ষিতে রোববার সংসদে বাজেট আলোচনার সমাপনী বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারি কর্মচারীদের বেতন ৫ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব করেছেন। তিনি বলেন, ‘সরকারি কর্মচারী যারা আছেন তাদের বিশেষ বেতন হিসাবে মূল বেতনের ৫ শতাংশ এ আপৎকালীন সময়ে প্রদানের বিষয়টি বিবেচনা করার জন্য অর্থমন্ত্রীকে অনুরোধ জানাচ্ছি।’ বর্তমান সময়টিকে ‘আপৎকাল’ হিসেবে দেখছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী।

সরকারি কর্মচারীরা প্রতি বছর এমনিতেই ৫ শতাংশ হারে ইনক্রিমেন্ট পান। ঘোষিত প্রণোদনার ৫ শতাংশ মিলে তাদের এবার বেতন বাড়ছে ১০ শতাংশ। আপৎকালে সরকারি কর্মচারীদের আয় বাড়ানোর ঘোষণা এলেও নিশ্চয়তা নেই বেসরকারি খাতের কর্মচারীদের। তাদের ঈদের উৎসব ভাতা প্রাপ্তিরও নিশ্চয়তা নেই। ২০১৫ সালে প্রণীত বাংলাদেশ শ্রম বিধিমালার ১১১ ধারা অনুযায়ী, কলকারখানার মালিকরা শ্রমিকদের চাকরি এক বছর পূর্ণ হওয়া সাপেক্ষে বছরে দুটি উৎসব ভাতা দিতে বাধ্য। কিন্তু প্রতি বছর ঈদের আগে খবরের কাগজে দেখা যায়, অর্ধেকের মতো শ্রমিকের ঈদ ভাতা রয়ে গেছে অপরিশোধিত। তাদের অনেক নিয়োগকর্তা কারখানা বন্ধ করে লাপাত্তা হয়ে যান।

বণিক বার্তায় প্রকাশ, দেশের শিল্প অধ্যুষিত আটটি এলাকার ৪৬ দশমিক ৩২ শতাংশ কারখানায় রোববার বেলা ২টা পর্যন্ত এখনো ঈদ বোনাস দেয়া হয়নি। উল্লিখিত এলাকাগুলোয় মোট কারখানার সংখ্যা ৯ হাজার ৯১৫। এর মধ্যে ৪ হাজার ৫৯৩ বা ৪৬ দশমিক ৩২ শতাংশ শিল্প-কারখানায় ঈদ বোনাস পরিশোধ এখনো বাকি।

বিবেচ্য যে শ্রমিকের ঈদ বোনাস কিন্তু মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) বৃদ্ধিতেও ভূমিকা রাখে। মুসলমান অধ্যুষিত দেশ হওয়ায় দুটি ঈদ উৎসব দেশের অর্থনীতিতে গতি সঞ্চারে অতিগুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যেহেতু অধিকাংশ শ্রমিক তাদের কর্মস্থল ত্যাগ করে গ্রামে গিয়ে ঈদ উদযাপন করেন, তাদের উৎসব ভাতা গ্রামাঞ্চলের স্থানীয় অর্থনীতিতে ভোগ-ব্যয় বৃদ্ধি করে আর্থসামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখে। যেহেতু ঈদুল আজহার প্রধান ধর্মীয় উপাচার গৃহপালিত পশু কোরবানি, তা একই সঙ্গে দেশের মাথাপিছু প্রোটিন গ্রহণের পরিমাণ বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। আর কারখানার অনেক শ্রমিকই কোরবানি পশু ক্রয়ের জন্য হয়তো তাদের ঈদ বোনাসের অপেক্ষা করছেন। উৎসবে অংশগ্রহণে সমর্থ হলে শ্রমক্লান্ত মানুষ উজ্জীবিত হয়ে ওঠে, কিন্তু ব্যর্থ হলে সেই একই মানুষ বিষাদক্লিষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাই অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের জন্য শ্রমিককে তার উৎসব ভাতা যথাসময়ে পরিশোধ করা উচিত।

এ অর্থে উৎসব ভাতা হিসেবে ঈদ বোনাস শ্রমিকের অবশ্যপ্রাপ্য অধিকার। কিন্তু সেই বোনাস যথাসময়ে পরিশোধের জন্য দেশের শাসন কাঠামো প্রস্তুত নয়। বণিক বার্তার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৬ জুন অনুষ্ঠিত জাতীয় ত্রিপক্ষীয় পরামর্শ পরিষদের (টিসিসি) ৭৫তম এবং আরএমজি টিসিসির ১৫তম সভায় সভাপতি হিসেবে বক্তব্য দেয়ার সময় শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী বেগম মন্নুজান সুফিয়ান ঈদুল আজহার ছুটির আগেই শ্রমিকদের ঈদ বোনাস এবং জুনের ১৫ দিনের বেতন দেয়ার জন্য মালিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন। সংবাদপত্রের পাতায় শ্রমিকের অধিকার রক্ষায় আমাদের সরকারের তরফ থেকে এর চেয়ে বেশি উদ্যোগ প্রতিফলিত হয়নি। তাই শ্রমিকের শ্রমাধিকার ও মানবাধিকারের রক্ষাকবচ হিসেবে ভূমিকা পালন করতে সরকারি নিয়ন্ত্রক ও তদারকি সংস্থাগুলো প্রস্তুত কিনা তা প্রশ্ন সাপেক্ষ। কেননা শ্রমাধিকারের দাবিতে দরিদ্র শ্রমিক শ্রম আদালতে যাওয়ার সামর্থ্য রাখেন না। সবচেয়ে বড় বিষয়, তারা তো শ্রম আদালতের জটিল বিচার ব্যবস্থার আইনি প্রক্রিয়ার ব্যয় বহনে সমর্থও নয়। এখন পর্যন্ত খবরে দেখা যায়নি কোনো কারখানা মালিককে বেতন-ভাতা বিলম্বে পরিশোধের কারণে শ্রমিকের জীবনে বিড়ম্বনা বাড়ানোর দায়ে শাস্তি পেতে। বরং পোশাক শিল্পের মতো বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনকারী শিল্প খাতগুলোয় সরকার অনেক বড় আকারের ভর্তুকিও দিয়ে থাকে।

শ্রমিকরা দেশের সবচেয়ে বড় রফতানি খাত পোশাক শিল্পের প্রধানতম চালিকাশক্তি। দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ বৈদেশিক মুদ্রার জোগান দেয় পোশাক শ্রমিকের শ্রমের ফসল তৈরি পোশাক। কিন্তু সেই বৈদেশিক মুদ্রার কতটুকু হিস্যা তাদের পকেটে যায়? দেড় হাজার কারখানায় জরিপের ভিত্তিতে অক্সফামের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ক্রমাগত ওভারটাইম করার পরও বাংলাদেশের ১০০ শ্রমিকের ৯৮ জন পোশাক শিল্পীই বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম মজুরি পাচ্ছেন না। পোশাক শিল্প ছাড়াও শিল্প খাতের অন্যান্য উপখাতেও একই অবস্থা। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) প্রকাশিত বৈশ্বিক বেতন-ভাতা প্রতিবেদন ২০২০-২১ (গ্লোবাল ওয়েজ রিপোর্ট) অনুযায়ী, এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ন্যূনতম মজুরিতে সবচেয়ে পিছিয়ে বাংলাদেশ। প্রতিবেদনটিতে তালিকাভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র বাংলাদেশের ন্যূনতম মজুরি আন্তর্জাতিভাবে স্বীকৃত দারিদ্র্যসীমার নিচে।

কিন্তু আশ্চর্যজনক হলো, উৎপাদনশীলতার প্রবৃদ্ধিতে অন্যতম শীর্ষে আমাদের শ্রমিকরা। অপেক্ষাকৃত বেশি উৎপাদন করেও বেতন-বোনাসের ক্ষেত্রে দেশের শ্রমিকদের বঞ্চনা টেকসই উন্নয়নের জন্য সহায়ক নয়। শ্রম অসন্তোষের কারণে দেশের অর্থনীতি বড় ধরনের ক্ষতির শিকার হতে পারে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে তা দেশের নেতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করতে পারে।

কাজেই দেশের শিল্প খাতের টেকসই উন্নয়নের জন্য তথা অন্তর্ভুক্তিমূলক মানব উন্নয়নের জন্য এবং একই সঙ্গে সমাজে ধর্মীয় ও উৎসবসঞ্জাত সৌহার্দ্য বৃদ্ধির খাতিরে শ্রমিকদের ঈদ বোনাস আশু পরিশোধের ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে আমরা প্রত্যাশা করি।