চলমান ডলার সংকট সত্ত্বেও নতুন অর্থবছরে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানির পরিকল্পনা করা হয়েছে, যার অর্ধেকের বেশি খরচ হবে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি আমদানি করতে। বাজেট প্রণয়নে বিবেচনায় নেয়া হয়নি বিকল্প নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর নির্ভরতা বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা। বর্তমানে দেশে বিভিন্ন পণ্য আমদানির জন্য ব্যাংকগুলো যথেষ্ট পরিমাণে ঋণপত্র (এলসি) ইস্যু করতে পারছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ প্রায় ২৯ বিলিয়ন ডলার। এ অবস্থায় শুধু জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানির জন্য ১০ ডলার ব্যয়ের পরিকল্পনা অবিবেচনাপ্রসূত ও অদূরদর্শিতার পরিচায়ক। প্রতি মাসের হিসাবে জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানিতে ব্যয় হবে গড়ে ৮০০ মিলিয়ন ডলারের অধিক। অন্যদিকে জ্বালানি সংকটে পড়ে বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো উৎপাদন বন্ধ রাখলেও আকাশচুম্বী ক্যাপাসিটি চার্জ দিয়ে যেতে হবে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে। ২০২১-২২ অর্থবছরে শুধু ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে দিতে হয়েছিল ১৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। শুধু ক্যাপাসিটি চার্জ নয়, এর সঙ্গে রেন্টাল বিদ্যুৎ প্লান্টগুলোর জন্য রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে একই সঙ্গে দিতে হয় পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় এবং জ্বালানি ব্যয়।

আর ইত্যাকার ব্যয়ের জোগান দিতে বাড়াতে হবে ভর্তুকির পরিমাণ; এরই মধ্যে বিদ্যুৎ খাতে সরকারের ভর্তুকির পরিমাণ ২০১৭ সালের ৪ হাজার কোটি থেকে ২০২৩ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৩ হাজার কোটি টাকায়। সরকারের মোট ভর্তুকির প্রায় ৩৮ শতাংশ বরাদ্দ আছে এ বিদ্যুৎ খাতে। কিন্তু এর চেয়েও আশঙ্কার বিষয় বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের অপারেটিং লস বা পরিচালন খাতে লোকসানের পরিমাণ চার বছরে চার গুণের অধিক বেড়ে ২০২২ সালে দাঁড়িয়েছিল প্রায় সাড়ে ২৭ হাজার কোটি টাকা। কাজেই এ অবস্থা চলতে থাকলে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত অতিকায় শ্বেতহস্তীতে পরিণত হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের এ শ্বেতহস্তী রূপ ধারণের জন্য সরকারের অদূরদর্শী জ্বালানি নীতিকে দায়ী করেছেন সিপিডির গবেষকরা।

বিদ্যুৎ খাতে অনিয়ম সর্বজনবিদিত। কিন্তু এ নিয়ে আইনি কোনো প্রশ্ন তোলার সুযোগ রাখা হয়নি। ২০১০ সালে প্রণীত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইনের কারণে বিদ্যুৎ খাতের কোনো অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিকার চেয়ে আদালতে যাওয়ার সুযোগ নেই জনতার। আইনটিকে তাই অনেকে বিদ্যুৎ খাতের দায়মুক্তি আইন বলেও আখ্যায়িত করেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে টেকসই উন্নয়নের জন্য সরকারের উচিত ছিল নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে জোরারোপ। তারা একই সঙ্গে দেশের ভেতর নতুন গ্যাস আবিষ্কারের উদ্যোগ নিতেও বলেছেন। নতুন বাজেটে বিদ্যুৎ খাতে বরাদ্দ ২৮ শতাংশ বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। বাড়তি বরাদ্দের ৯৩ শতাংশ রাখা হয়েছে পাওয়ার জেনারেশনে। কিন্তু বাজেটে ৯৬টি প্রজেক্টের মধ্যে মাত্র পাঁচটি নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে কেন্দ্র করে, যা অত্যন্ত হতাশাব্যঞ্জক। স্বীকার্য যে উত্তোলিত গ্যাস দিয়ে দেশের দৈনিক গ্যাসের চাহিদা পূরণ সম্ভব নয়। কিন্তু তাই বলে হ্রাসমান মজুদ বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়িয়ে কিংবা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই উন্নয়নের কথা চিন্তা না করে গ্যাস আমদানির পরিকল্পনা অনাকাঙ্ক্ষিত। সরকার নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের জন্য যথাযথ ব্যবস্থাও গ্রহণ করেনি। 

সরকারের ইন্টিগ্রেটেড পাওয়ার সিস্টেম মাস্টারপ্ল্যানে বলা হয়েছে, ২০৪১ সালে বাংলাদেশ ৬০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জন করবে। কিন্তু অত্যন্ত হতাশাজনক হলো যে সরকার তার ১২ ভাগের মাত্র ১ ভাগ অর্থাৎ ৫ হাজার মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে উৎপাদনের পরিকল্পনা করেছে। দেশে উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মজুদ বর্তমানে রয়েছে প্রায় নয় ট্রিলিয়ন ঘনফুট, যা বর্তমান উত্তোলনের হার অনুসারে আগামী আট-নয় বছরে শেষ হয়ে যাবে। সেক্ষেত্রে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ না হলে এক দশক পর দেশের সম্পূর্ণ বিদ্যুৎ চাহিদা আমদানীকৃত জীবাশ্ম জ্বালানি দিয়ে উৎপাদন করতে হবে। বিবেচ্য যে বৈশ্বিক জীবাশ্ম জ্বালানির মজুদও সসীম। বর্তমান ব্যবহারের হার চলমান থাকলে তা প্রায় ৫০ বছর টিকবে। সেক্ষেত্রে এক দশক পর জ্বালানির দুষ্প্রাপ্যতার আশঙ্কা আছে। আবার অন্যদিকে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন রুখতে জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা ২০৫০ সাল নাগাদ কার্বন নির্গমনের হার শূন্যতে নিয়ে যাওয়ার তাগাদা দিচ্ছেন। সেক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে সরকারের উচিত এখন থেকেই নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর জোরারোপ করা। অন্যথায় খোদ বাংলাদেশের উপকূলবর্তী এলাকাগুলো বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়লে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে এবং বারবার জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড়ে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

অথচ আমাদের সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার বৃদ্ধির উল্লেখযোগ্য কোনো কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ না করে বরং মধ্যপ্রাচ্যের কাতার ও ওমানের সঙ্গে এলএনজি আমদানির জন্য দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করেছে। বলা হচ্ছে, আগামীতে ২৩ হাজার মেগাওয়াট নতুন বিদ্যুৎ যোগ হতে যাচ্ছে। কিন্তু বাড়তি বিদ্যুৎ কীভাবে কাজে লাগবে তা নিয়ে সরকারের কোনো কর্মপরিকল্পনা জানা যায়নি। সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধিতে যতটা আগ্রহী, বিদ্যুৎ সংযোগ সম্প্রসারণে ততটা আগ্রহী নয়।

২০১০ সালের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইনটি দুই বছরের জন্য প্রণীত হলেও আইনটির মেয়াদ পরে সংশোধন করে চার দফা বাড়ানো হয়েছে। সর্বশেষ ২০২১ সালের সংশোধনীতে বিদ্যুৎ খাতে এ দায়মুক্তির আইনটির মেয়াদ ২০২৬ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। তাই বিদ্যুৎ খাত দুর্নীতির দুষ্টচক্রে আটকে পড়ার নেপথ্য কারণ হিসেবে অনেকে এই আইনি দায়মুক্তির ব্যবস্থাকে দায়ী করেছেন।

অ্যান্টি-করাপশন এভিডেন্স রিসার্চ পার্টনারশিপ কনসোর্টিয়ামের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুশতাক হোসেন খান বাংলাদেশের ২০০৪ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে স্থাপিত ৫৮টি বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্র বিষয়ে গবেষণা করে দেখিয়েছিলেন যে বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোকে ভর্তুকি হিসেবে শুধু সরকারি জমি ইজারা দেয়ার কারণে বিদ্যুতের দাম ১৫ শতাংশ বেড়ে যায়। তার গবেষণা অনুসারে, শুধু রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে বিদ্যুৎ খাতে ২০১৭ সাল পর্যন্ত বছরে ক্ষতি হয়েছিল ১ বিলিয়ন ডলার। এ ক্ষতির পরিমাণ কি বেড়েছে না কমেছে তা নতুন গবেষণার বিষয় হতে পারে।

কাজেই, দীর্ঘমেয়াদে টেকসই উন্নয়নের জন্য চাই নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর জোরারোপ এবং বিদ্যুৎ খাতে অব্যবস্থাপনার পরিসমাপ্তির জন্য চাই আইনি দায়মুক্তির অবসান।