প্রাণিজ আমিষের অন্যতম উৎস হিসেবে মাছকে গণ্য করা হয়। আমাদের খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে মাছ ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকায় বাজারে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে মাছের খাবারের মূল্য বেড়েছে। এখন বর্ষা মৌসুম চললেও স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত হচ্ছে না। এতে অন্য সব ধরনের মাছের মতো রুই-কাতলার দামও বেড়ে গেছে। এমনকি নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের সুলভ আমিষের উৎস হিসেবে পরিচিত তেলাপিয়া ও পাঙাশের দামও এখন বাড়তির দিকে। এর প্রভাব খুবই নেতিবাচক হতে পারে। প্রয়োজনীয় আমিষের অভাবে শিশুদের বিকাশ লাভে বাধা ও খর্বকায় হওয়ার আশঙ্কা থাকে। সর্বোপরি দেশের নিম্ন আয়ের মানুষের প্রয়োজনীয় আমিষপ্রাপ্তি বাধাগ্রস্ত হবে। অথচ বাজারে চাষকৃত বড় মাছগুলোর মধ্যে পাঙাশের দাম দীর্ঘদিন ধরে তুলনামূলক কম ছিল। খামার পর্যায়েও প্রায় দেড় দশক ধরে মাছটি কেজিপ্রতি ১০০ টাকার নিচে বিক্রি হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে খুচরা বাজারে মাছটির দামে হেরফের হলেও তা কোনো সময়েই ১৫০ টাকার বেশি হয়নি। নানা খাদ্যগুণে সমৃদ্ধ ও সুলভ মাছটি এখন দরিদ্রদের হাতের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। এজন্য মৎস্য খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধিকে কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বণিক বার্তায় প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, বিগত দুই বছরে মৎস্য খাদ্যের দাম প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে। আবার বর্ষার ভরা মৌসুমেও প্রায় খরার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দেশ। এ সময়ে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কম বৃষ্টিপাত হচ্ছে। ফলে এখন মাছের উৎসগুলোয় পর্যাপ্ত পানি নেই, যে কারণে মাছের বৃদ্ধি ও উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এদিকে পানি না থাকায় প্রাকৃতিক জলাধারেও মাছের দেখা মিলছে না। পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকায় মৎস্য উদ্যোক্তাদের অনেকেই এখন খামার বন্ধ বা আয়তন কমিয়ে ফেলছেন। যে কারণে সার্বিকভাবে মাছের সরবরাহ কমেছে। এর সঙ্গে পরিবহন খরচও বেড়েছে। যার ফলে মাছের দাম বাড়ছে।
মাছের দাম বাড়ার ক্ষেত্রে সরবরাহ কম থাকার কথা বলা হচ্ছে। এছাড়া দেশে বর্ষার ভরা মৌসুমেও বৃষ্টিপাত না হওয়ায় মাছের প্রজনন ও দৈহিক বৃদ্ধিতে এর প্রভাব পড়ছে। পর্যাপ্ত পানি না থাকায় প্রাকৃতিক উৎস জলাধার থেকে মৎস্য আহরণ ব্যাপক মাত্রায় কমেছে। এতে চাহিদার পুরো চাপ চাষের মাছে পড়ছে। আবার মিঠা পানিতে মা-মাছ নিধন বন্ধে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ না থাকায় প্রজনন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এদিকে মৎস্যচাষীরা যে দামে মাছ বিক্রি করেন তা কয়েক হাত বদলে অনেক বেড়ে যায়। এটিও নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন বলে বাজারসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। এক্ষেত্রে মৎস্য চাষের উদ্যোক্তাদের সঠিক দাম পাওয়া নিশ্চিত করতে হবে। না হলে তারা মাছ চাষে উৎসাহ হারিয়ে ফেলতে পারেন।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এফএওর দ্য স্টেট অব ওয়ার্ল্ড ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাকুয়াকালচার ২০২২ প্রতিবেদন অনুযায়ী, মুক্ত জলাশয় বা স্বাদুপানির মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে। চাষের মাধ্যমে মৎস্য উৎপাদনে (অ্যাকুয়াকালচার) বাংলাদেশের অবস্থান এখন বিশ্বে পঞ্চম। আগামী দিনগুলোয়ও এর ধারাবাহিকতা থাকবে বলে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিশ্লেষক-পর্যবেক্ষক সংস্থা মত দিয়েছে।
সরকারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৬-১৭ অর্থবছরেই বাংলাদেশ মাছ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করে। অর্থাৎ, সেই সময় থেকে প্রতি বছর দেশজ চাহিদার শতভাগ দেশীয় উৎপাদন দিয়েই পূরণ করার সক্ষমতা তৈরি হয়। কিন্তু উৎপাদনের ক্ষেত্রে ক্রমাগত উন্নতি হলেও এর সুফল মানুষ পাচ্ছে না বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
এজন্য মৎস্যচাষীদের মাছের খাবার তৈরির সক্ষমতা বৃদ্ধি, মধ্যস্বত্বভোগী কমানো ও বাজার তদারকি করা হলে মাছের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে থাকবে বলে আশা করা যায়।
সবচেয়ে বড় কথা সাধারণ মানুষের জন্য পর্যাপ্ত আমিষ যেন সহজলভ্য হয়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। কারণ মানবদেহে প্রয়োজনীয় আমিষের সরবরাহ না থাকলে তা মোটেও ভালো ফল বয়ে আনবে না। এজন্য নিম্নবিত্ত মানুষের কথা ভেবে মাছের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখার পদক্ষেপ নিতে হবে। মাছ চাষের সর্বোচ্চ ফলাফল পেতে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে মৎস্যচাষীদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দেয়া প্রয়োজন।
একটা বিষয় মনে রাখতে হবে, মাংসের দাম এরই মধ্যে নিম্নবিত্তদের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ায় মাছের ক্ষেত্রে বাজার যেন নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে না পড়ে সেটি আমলে নেয়া প্রয়োজন। কারণ শুধু সবজি ও ডিম খেয়ে নিম্নবিত্ত মানুষ জীবনধারণ করতে চাইবে না। এজন্য আমিষের উৎস হিসেবে যেন মাছের উপস্থিতি নিশ্চিত করা যায়, সেক্ষেত্রে বাজার পর্যবেক্ষণ জরুরি। ‘মাছেভাতে বাঙালি’ কথাটি যেন বাস্তবিক অর্থে বজায় থাকে তা দেখভাল করতে হবে। আমরা প্রত্যাশা করি জনস্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে সরকার মাছ চাষ থেকে শুরু করে সার্বিক ক্ষেত্রে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা তৈরিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। আগামী দিনের সুস্থ প্রজন্মের জন্যই মৎস্য চাষের সুফল নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ একান্তভাবে কাম্য।










