নিম্ন আয়ের দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দেশে উত্তরণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প বা এসএমই খাত। এসএমই খাতের উন্নয়নে কাজ করছে এসএমই ফাউন্ডেশন। এ খাতের বর্তমান অবস্থা, ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা নিয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন এসএমই ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মাসুদুর রহমান। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাবিদিন ইব্রাহিম।

দেশের অর্থনীতিতে এসএমই খাতের ভূমিকা কীভাবে মূল্যায়ন করবেন এসএমই খাতের একজন শীর্ষ প্রতিনিধি হিসেবে?

যেকোনো দেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি এসএমই খাত। প্রতিটি দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের সিংহভাগ অংশীদার অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা। পৃথিবীর একেবারে উন্নত দেশগুলোর মধ্যে জাপানের জিডিপির ৯০ শতাংশ আসে এসএমই খাত থেকে। চীনের মতো শীর্ষ অর্থনীতির জিডিপিতে ৭০-৭৫ শতাংশ ভূমিকা রাখে খাতটি। এগুলো হচ্ছে বৃহৎ অর্থনীতির কথা। ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে প্রায় ৬০ শতাংশ ভূমিকা এসএমই খাতের। সারা দেশে যে ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তা বা অতিক্ষুদ্র উদ্যোক্তা আছেন, তারা যে উদ্ভাবনী ক্ষমতা নিয়ে তাদের ব্যবসা করতে আসেন তা অর্থনীতিতে ব্যাপক ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি যেকোনো দেশের শিল্পায়ন ও পরিষেবা খাতে কর্মসংস্থানে ৮০-৯০ ভাগ ভূমিকা রাখেন এসএমই উদ্যোক্তারা। বাংলাদেশের শিল্প খাতে শ্রমশক্তির প্রায় ৮০ শতাংশই এসএমই খাতের। যেকোনো দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে মূল ভূমিকাটা পালন করছে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা। তাদের যত বেশি সহযোগিতা ও মূল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সংযুক্ত করা যায় ততই দেশের জন্য মঙ্গল।

এক্ষেত্রে এসএমই ফাউন্ডেশন বর্তমানে কী ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করছে?

২০০৮-এ যখন এসএমই ফাউন্ডেশন কার্যক্রম শুরু করে তখন বাংলাদেশ সরকার তার কাজের ম্যান্ডেট নির্ধারণ করে দিয়েছে। এসএমই ফাউন্ডেশন শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন একটি প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা উন্নয়ন থেকে শুরু করে তাদেরকে দেশের মূল অর্থনীতিতে সম্পৃক্ত করার ক্ষেত্রে আমাদের ওপর কতগুলো দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে। তার মধ্যে মূল কয়েকটি কাজ হচ্ছে—

প্রথমত, আমাদের যে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা শ্রেণী আছে তাদের লালনের পাশাপাশি আরো নতুন ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা তৈরি করা। এ উদ্যোক্তা তৈরির জন্য আমরা কতগুলো কাজ করি। আমাদের যে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা রয়েছেন তাদের ব্যবসা পরিচালনার জন্য যে তাত্ত্বিক, প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও সরকারি যেসব বিধিমালা আছে তা প্রতিপালন নিশ্চিত করা। এছাড়া দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পরিবর্তনশীল বিশ্ব পরিস্থিতিতে কীভাবে টিকে থাকা যায় সেক্ষেত্রে সহায়তা করা। এর অংশ হিসেবে বিভিন্ন ট্রেনিং ফ্যাসিলিটি দেয়া হচ্ছে। আমরা যদি উদ্যোক্তাদের যথাযথ প্রশিক্ষণ না দিয়ে আধুনিক ব্যবসার কলাকৌশল সম্পর্কে জানাতে না পারি, তারা কিন্তু টিকতে পারবেন না। পাশাপাশি আমাদের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে যে অসংখ্য কর্মী কাজ করেন তাদের মানোন্নয়নের জন্য আমরা ট্রেনিং ফ্যাসিলিটি প্রদান করি। নতুন উদ্যোক্তা তৈরি এবং তাদেরকে শুধু তাত্ত্বিক নয়, বাস্তব জ্ঞানের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার জন্য কাজ করছি। উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য যে কাজগুলো করা দরকার তা বিভিন্ন ইনকিউবেশন সেন্টারের মাধ্যমে হাতে-কলমে শেখাচ্ছি। একদিকে যেমন নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে সহায়তা করছি, তেমনি তারা যেন ব্যবসায় টিকে থাকেন সেজন্য তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সার্বিক সহায়তা দিচ্ছি।

এখানে উল্লেখ্য, এসএমই খাতের একটা বড় অংশ নারী উদ্যোক্তা। নারী উদ্যোক্তা তৈরি ও তাদের সহায়তায় কার্যকর ভূমিকা রাখছে এসএমই ফাউন্ডেশন। নারী উদ্যোক্তাদের কেন্দ্র করে আমরা বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করি। আমাদের নেতৃত্বে এখন পর্যন্ত সারা দেশে এসএমই ফাউন্ডেশনের সহায়তায় নারীদের নিয়ে ১৪টি চেম্বার অব কমার্স বা অ্যাসোসিয়েশন তৈরি হয়েছে। এই অ্যাসোসিয়েশনগুলোর মধ্য দিয়ে সারা দেশে নারী উদ্যোক্তা তৈরির চেষ্টা করছি। আমাদের সব নারী উদ্যোক্তাকে একটি সাংগঠনিক কাঠামোর আওতায় আনার চেষ্টা করছি। আমাদের সমাজে নারীরা এমনতিতেই মূল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে থাকেন। তাদেরকে মূল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করতে আমাদের কর্মসূচিগুলো অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করছে। পাশাপাশি বাংলাদেশে আমরা প্রথম ২০০৯ সালে এক অংকের সুদে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ঋণ দেয়া শুরু করি। এর আগে বাংলাদেশে কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান এক অংকের সুদে ঋণ প্রদান করত না। চাহিদার তুলনায় আমাদের ঋণ প্রদানের পরিমাণ কম হলেও পরিশোধের ক্ষেত্রে আমরা বেশ সাফল্য অর্জন করেছি। বলা যায়, বাংলাদেশে ঋণ পরিশোধে আমরা একটি সফল মডেল উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছি। আমরা নিজেরা ঋণ দিই না; সহযোগী আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দিয়ে থাকি। আমাদের রিকভারি রেট প্রায় শতভাগ। 

এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সাম্প্রতিক গবেষণায় আমাদের ঋণ প্রদান পদ্ধতিকে একটি রোল মডেল হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। আমাদের গৃহীত নীতি সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকগুলো অনুসরণের চেষ্টা করছে।

উদ্যোক্তাদের জন্য আমরা আরেকটি কাজ করার চেষ্টা করি। দেখা যায়, বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের এক ধরনের জোটবদ্ধতা আছে। আমরা যদি তৈরি পোশাক খাতের দিকে তাকাই তাহলে দেখব, সেগুলো কিন্তু আশুলিয়া, সাভার, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামকেন্দ্রিক। আমরা সেভাবে সারা দেশে ক্লাস্টার উন্নয়নের চেষ্টা করছি। একটি নির্দিষ্ট এলাকায় যদি ৫০টি কারখানা থাকে যারা একই ধরনের পণ্য বা সেবা উৎপাদন করে, সেসব ইউনিটকে আমরা ক্লাস্টার হিসেবে গণ্য করে থাকি। ক্লাস্টারগুলোয় কী ধরনের কাজ হয় তার একটি ছোট্ট উদাহরণ দেয়া যায়। ভৈরবে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য নিয়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ভালো উপস্থিতি রয়েছে। সেখানে ৫০০-৬০০ ছোট কারখানা গড়ে উঠেছে। এ কারখানাগুলোয় কর্মরত কর্মীদের প্রশিক্ষণ, নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা প্রয়োজন। এ কারখানাগুলো কিন্তু অত্যন্ত ছোট। তাদের আধুনিক যন্ত্রপাতি ক্রয়ের সক্ষমতা নেই। সেখানে বিশ্বব্যাংক একটি প্রজেক্ট দাঁড় করিয়েছে; সেটা হচ্ছে কমন ফ্যাসিলিটি ডেভেলপ করা। ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের সহায়তায় ভৈরবে একটি কমন ফ্যাসিলিটি সেন্টার (সিএফসি) কারখানা তৈরি হয়েছে। এখানে বৃহৎ ও আধুনিক মেশিনারি আনা হয়েছে। এখানে ছোট ছোট উদ্যোক্তা তাদের প্রয়োজন মতো কাজগুলো করে নিয়ে আসছেন। আর্থিক সক্ষমতার অভাবে ভারী যন্ত্রপাতি ক্রয় যেখানে এসএমই খাতের জন্য চ্যালেঞ্জিং সেখানে আমরা কমন ফ্যাসিলিটি সরবরাহ করছি।

আমরা আগামী কয়েক মাসের মধ্যে রাজশাহীর কালুহাটিতে একটি সিএফসি উদ্বোধন করতে যাচ্ছি। অন্যান্য জায়গায়ও আমরা সিএফসি তৈরি করব। এর ফলে আধুনিক প্রযুক্তিগুলো তারা ব্যবহার করতে পারবে। এতে তাদের পণ্যের উৎকর্ষ বাড়ার পাশাপাশি পণ্য উৎপাদনের গতিশীলতা বাড়বে। ফলে তাদের প্রতিযোগিতা করার ক্ষমতাও আগের থেকে বাড়বে। আমি মনে করি, ক্লাস্টার ডেভেলপমেন্টের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এ কাজ এসএমই ফাউন্ডেশন করছে। ক্লাস্টার ডেভেলপমেন্টের ক্ষেত্রে প্রযুক্তি হস্তান্তর, নতুন পণ্যের বহুমুখিতার বাইরেও প্রশিক্ষণ সুবিধা এবং বাজারের সঙ্গে সংযোগ তৈরির কাজও আমরা করে থাকি।

করোনা মহামারীতে এ খাত মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। খাতটি পুনরুদ্ধারে এসএমই ফাউন্ডেশন কী কী পদক্ষেপ নিয়েছে? 

আপনারা জানেন যে ২০২০ সালের মার্চে করোনা মহামারীর প্রাদুর্ভাবের পর পরই প্রথম কোয়ারেন্টিন পিরিয়ড শুরু হয়। তখন আমরা শিল্প মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে আমাদের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের টিকিয়ে রাখার জন্য প্রণোদনা প্যাকেজের প্রস্তাবনা দিই। তাতে সাড়া দিয়ে ওই বছরের এপ্রিলের শুরুতেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বৃহৎ শিল্প এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তা যারা আছেন তাদের রক্ষার জন্য একটি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছিলেন। ওই প্যাকেজে প্রথমে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ২০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করেন। প্রধানমন্ত্রী এর পর আরো ৩ হাজার কোটি টাকা আমাদের প্রণোদনা প্যাকেজ হিসেবে দিয়েছিলেন। আমি মনে করি, করোনা মহামারী শুরুর কয়েক দিনের মধ্যেই ‘এসএমই ফাউন্ডেশন’ শিল্প মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অধিদপ্তর থেকে তাদের জন্য একটা প্রণোদনা প্যাকেজ হাজির করতে পেরেছি। এটা ওই সময়ে এসএমই ফাউন্ডেশনের গুরুত্বপূর্ণ একটা কাজ ছিল। কারণ এ টাকাগুলো দিয়ে উদ্যোক্তাদের মধ্যে প্রাথমিকভাবে যে ধাক্কাটা তৈরি হয়েছিল সে ধাক্কাটাকে আমরা মোটামুটিভাবে মেটানোর চেষ্টা করেছি। পরবর্তী বিভিন্ন সময়ে আমরা বাংলাদেশ ব্যাংক এবং সরকারি-বেসরকারি কমার্শিয়াল ব্যাংকগুলোর সঙ্গে একত্রে মিলে করোনার সময় সৃষ্ট আর্থিক ব্যবস্থাপনার সংকট মোকাবেলার চেষ্টা করেছি। পাশাপাশি আরেকটি কাজ আমরা করার চেষ্টা করেছি ওই সময়। করোনার ভয়াল সময়গুলোয় আমাদের বড় বড় চারটি জাতীয় উৎসবে পণ্যসেবা বিক্রি করা সম্ভব হয়নি। কেননা ওই সময় লকডাউন ছিল, বাজারগুলো বন্ধ ছিল। এ সময়ে সারা দেশে আঞ্চলিক পর্যায়ে আটটি ডিজিটাল মেলা আয়োজন করেছি। আইসিটি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ওই মেলাগুলো আয়োজন করা হয়। এসব মেলার মধ্য দিয়ে আমরা বাজারের সঙ্গে খাতটির সংযোগ রক্ষার চেষ্টা করেছি। ‌করোনার সময় আর্থিক ব্যবস্থাপনা, বাজার ব্যবস্থাপনা ও সরবরাহ শৃঙ্খল বজায় রাখতে আমরা এসএমই ফাউন্ডেশন, শিল্প মন্ত্রণালয়, সরকারি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়সহ সারা দেশের বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সঙ্গে নিয়েই ওই অবস্থাটা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করেছি। করোনা-পরবর্তী সময়ে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে যে অবস্থা তৈরি হয়েছে তা উত্তরণে বাংলাদেশ ব্যাংক এসএমই উদ্যোক্তার জন্য ২৫ হাজার কোটি টাকার একটি রিফাইন্যান্সিং স্কিম ঘোষণা করেছে। সারা দেশে ব্যাংকারদের সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের সংযোগ করার চেষ্টা করছি। বাজার ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য আমরা প্রচুর চেষ্টা করছি। কেননা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের একটি বড় সমস্যা, তারা সরাসরি বাজারের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত হতে পারেন না। এজন্য আমরা বিভাগীয় শহরগুলোয় মেলা করছি এবং অনলাইন প্লাটফর্ম ব্যবহারের চেষ্টা করছি। বাংলাদেশে দেশী-বিদেশী যে বড় বড় অনলাইন প্লাটফর্ম আছে তাদের সঙ্গে আমরা কাজ করছি। তাদের সঙ্গে কাজ করতে গেলে কতগুলো নীতিমালা (কমপ্লায়েন্স) মেনে চলতে হয়। আমাদের উদ্যোক্তাদের দিয়ে সে কাজগুলো করার চেষ্টা করছি। আশা করি, এর ফলে আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই আমাদের অনেক উদ্যোক্তা এসব অনলাইন প্লাটফর্মে তাদের প্রডাক্টগুলো বিক্রি করতে পারবেন। এছাড়া বাজারের যে দুর্বলতা ছিল তার কিছুটা তারা এর মধ্য দিয়ে কাটিয়ে উঠতে পারবেন বলে আমি বিশ্বাস করি।

ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের মধ্যে বড় একটা অংশ নারী। এ নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ কোনো কর্মসূচি কি নেয়া হয়েছে? 

বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সরকারি পর্যায়ে যে প্রতিষ্ঠান নারীদের জন্য আলাদা কার্যক্রম পরিচালনা করে, বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য, সেটা কিন্তু আমাদের এসএমই ফাউন্ডেশন। এই ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে দেয়া ঋণের ২৬-৩০ শতাংশ পেয়ে থাকেন নারী উদ্যোক্তারা। অন্যদিকে জাতীয় পর্যায়ে কিন্তু এর পরিমাণ মাত্র ৫-৬ শতাংশ। আমরা ঋণ প্রদান প্রক্রিয়ার মধ্যেই ‌নারী উদ্যোক্তাদের অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছি। পাশাপাশি নারী উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য আমরা তাদের বিভিন্ন ধরনের ট্রেনিং দেশব্যাপী দিয়ে থাকি। আমাদের কাজটা শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক নয়। বাংলাদেশের প্রান্তিক পর্যায়ে যে উদ্যোক্তারা আছেন, বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তারা, তাদেরকেও আমরা সংযুক্তির চেষ্টা করছি।

উদ্যোক্তা তৈরি ও দক্ষতা উন্নয়নে কী কী উদ্যোগ নিয়েছে এসএমই ফাউন্ডেশন?

এসএমই ফাউন্ডেশনের কাজটাই হলো উদ্যোক্তা তৈরি, তাদের উন্নয়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধি। আমাদের কাজের মধ্যে বিশাল একটা অংশ হচ্ছে, প্রশিক্ষণ প্রদান, নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত করা, প্রযুক্তি যাতে তারা গ্রহণ করতে পারে সে বিষয়‌ে সক্ষমতা বৃদ্ধি করা, পণ্যের বহুমুখীকরণ, যেমন প্রডাক্ট ডাইভারসিফিকেশন। এটা উদ্যোক্তাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। কেননা আমাদের ছোট ছোট উদ্যোক্তার তাত্ত্বিক জ্ঞান থাকে না বা তারা সে ধরনের ঝুঁকিও নিতে চান না। আমাদের যে তাঁত শিল্প, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, মৃৎশিল্প, হস্তশিল্প, পাট শিল্প রয়েছে তাতে নজর দিলে দেখা যাবে যে সেখানে পণ্যের বহুমুখীকরণ হয়েছে। পাট ও পাটজাত পণ্যের যে শিল্পগুলো আছে সেগুলোর পণ্যের ডিজাইন ও উৎপাদনের ক্ষেত্রে কিন্তু একটা বহুমুখীকরণ হয়েছে। চামড়াজাত‌ শিল্পের ক্ষেত্রেও কিন্তু সেটা আমরা করতে পেরেছি। আমরা মনে করি যে বাজারে পণ্যের বহুমুখীকরণের ক্ষেত্রে একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছি। আমরা যা কিছু করছি তার সবই নতুন নতুন উদ্যোক্তা তৈরি এবং তাদের সক্ষমতা সৃষ্টির পাশাপাশি তা ধরে রাখার জন্যই করছি। 

চামড়াজাত শিল্পের কথা বলছিলেন। কোরবানির ঈদে চামড়ার একটা বিশাল সংগ্রহ হয়। চামড়া শিল্পে সংশ্লিষ্ট এসএমই প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে আপনাদের কী কার্যক্রম বা পরিকল্পনা আছে?

আমরা ‘‌র’ চামড়ার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত নই যা ট্যানারিরা করে। চামড়া যখন ফিনিশড প্রডাক্টে রূপান্তর হয়, তখন আমাদের কার্যক্রম শুরু হয়। আপনি যদি হাজারীবাগ যান কিংবা আশুলিয়া, সাভার, ভৈরব ও চট্টগ্রামে যান দেখবেন অসংখ্য ছোট কারখানা তৈরি হয়েছে। সে কারখানাগুলো চামড়াজাত পণ্য উৎপাদন করে। জুতা, ব্যাগ থেকে শুরু করে অন্যান্য অ্যাকসেসরিজ তারা তৈরি করে। আমরা এসব উদ্যোক্তার সঙ্গে কাজ করি। এক্ষেত্রে আমাদের কাজের বড় একটা অংশ অ্যাডভোকেসি। অ্যাডভোকেসি হচ্ছে শিল্পের উন্নয়নের ক্ষেত্রে নীতিগত পরিবর্তনে কী কী দরকার তা আইডেন্টিফাই করি। এরপর সেগুলো আমরা সরকারের নীতিনির্ধারকদের কাছে তুলে ধরি। কারণ পলিসি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক। এগুলোকে সরকারের উন্নয়ন নীতিমালায় সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন। আমাদের কাজের একটা বড় অংশই হচ্ছে পলিসি অ্যাডভোকেসি করা। 

২০২৬ সালে বাংলাদেশের এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন হবে। এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের মধ্য দিয়ে আমাদের যথেষ্ট সুযোগের পাশাপাশি চ্যালেঞ্জও তৈরি হবে। অর্থাৎ আজকে আমাদের উদ্যোক্তারা যেসব সুবিধা ভোগ করছেন তার অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেই সুবিধাগুলো ভোগ করতে পারবেন না। এক্ষেত্রে বড় একটা কাজ হচ্ছে পণ্যের মানোন্নয়নের পাশাপাশি পণ্যের স্ট্যান্ডার্ডাইজেশন ও সার্টিফিকেশন তৈরি করা। এ জিনিসগুলো নিশ্চিত না হলে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য বিক্রি কঠিন হয়ে পড়বে। কীভাবে এ স্ট্যান্ডার্ডাইজেশন ও সার্টিফিকেশন হবে তা নিশ্চিতে আমরা নীতিমালা ও প্রটোকল তৈরি করছি। যারা এই সার্টিফিকেশনগুলো দিয়ে থাকে তাদের সঙ্গে আমাদের উদ্যোক্তাদের নিয়ে কাজ করছি। যেমন বাংলাদেশে খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ কয়েক বছরে অত্যন্ত সফল উদ্যোগ হিসেবে পরিণত হয়েছে। অভ্যন্তরীণ বাজারে খাদ্যপণ্য প্রক্রিয়াকরণের প্রচুর চাহিদা বেড়েছে। পাশাপাশি বিদেশেও প্রচুর রফতানি হয়েছে। গত দুই বছরে ১৩টি খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ কোম্পানির জন্য আইএসও সার্টিফিকেশন আমরা আনতে পেরেছি। 

আন্তর্জাতিক এমএসএমই দিবস উপলক্ষে আপনাদের কী পরিকল্পনা রয়েছে? 

এসএমই ফাউন্ডেশনের প্রতিদিনের কাজই হচ্ছে আমাদের এসএমই উদ্যোক্তাদের নিয়ে। তবে ২৭ জুন আন্তর্জাতিক এসএমই দিবস। জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নে এসএমইর ভূমিকা যে অসীম তা দেশের জনগণ, নীতিনির্ধারকদের কাছে তুলে ধরার জন্যই এ দিবস। কারণ ৫০ বছর ধরে শিল্পায়ন বা অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে আমাদের মূল ফোকাস ছিল বড় বড় শিল্প-কারখানা গড়ে তোলা। বড় শিল্প-কারখানা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে উদ্যোক্তাদের বিভিন্ন সহযোগিতার ক্ষেত্রে আমাদের বিভিন্ন সরকার পলিসি তৈরি করেছে, তাদেরকে সহযোগিতা করেছে। কোনো দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বড় শিল্পের ভূমিকাকে আমি অস্বীকার করব না। কিন্তু বড় শিল্পকে যদি টিকিয়ে রাখতে হয় তার ফরওয়ার্ড ও ব্যাকওয়ার্ড লিংক হিসেবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের তৈরি করতে হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা তৈরি করতে না পারলে এসব বড় উদ্যোক্তা টিকে থাকবেন না। যেমন আমাদের গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রি। ৮০-৯০ দশকে যখন গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রি তৈরি হলো, তখন প্রায় শতভাগ জিনিস বিদেশ থেকে আমদানি করতে হতো। কিন্তু আজকে ৬০-৭০ ভাগ শিল্প উপকরণ আমরা স্থানীয়ভাবে নিজেরা উৎপাদন করতে পারছি। একই চিত্র কিন্তু প্লাস্টিক শিল্পের। 

এসএমই খাতের উন্নয়নে আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী? 

আমরা প্রতি বছরই একটা কর্মপরিকল্পনা তৈরি করি। আমাদের কর্মপরিকল্পনা তৈরি হয় বিশেষত ২০১৯ সালের এপ্রিলে একনেকে গৃহীত পলিসি যেটা তৈরি করা হয়েছিল, তা ২০২২ সালে শিল্পনীতিতে সংযুক্ত রয়েছে। সেই শিল্পনীতিতে এসএমইর জন্য ১১টি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ১১ সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের জন্য আমাদের প্রায় কয়েকশ কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। তার মধ্যে কিছু স্বল্পমেয়াদি, কিছু মধ্যমেয়াদি, কিছু দীর্ঘমেয়াদি। এসএমই ফাউন্ডেশনের ভবিষ্যৎ কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে জাতীয় শিল্পনীতিতে এসএমই খাতের উন্নয়নের জন্য যে লক্ষ্যমাত্রাগুলো নির্ধারণ করা হয়েছিল তা অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় কাজগুলোকে আমরা সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করি। বাজার সবসময় পরিবর্তনশীল। পরিবর্তনশীল বাজারে উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি তৈরি করতে হয়, বাজারের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের কর্মসূচিতেও পরিবর্তন আনি। সেই লক্ষ্যে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।