দেশে খাদ্যদ্রব্যের বাজারদর ঊর্ধ্বমুখী। এর প্রভাব পড়েছে সার্বিক মূল্যস্ফীতিতে। গত দুই বছর বাংলাদেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। খাদ্যপণ্যের বাড়তি দামের চাপে পিষ্ট সাধারণ মানুষের দিন যাপন। চলতি বছরের মার্চে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি কমলেও এপ্রিলে ১০ শতাংশের ওপরে উঠে খাদ্য মূল্যস্ফীতি। ওই সময় সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৭৪ শতাংশ। এদিকে আবারো খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ায় মে মাসেও বেড়েছে সার্বিক মূল্যস্ফীতি। দরিদ্র ও স্বল্প আয়ের মানুষের ওপর এর নেতিবাচক অভিঘাত পড়ছে। ক্রমে ছোট হয়ে আসছে তাদের ভোগ্যপণ্যের তালিকা।  

সম্প্রতি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) মূল্যস্ফীতির হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ করেছে। এতে দেখা গেছে, এপ্রিলের মতো মে মাসেও দেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক ৭৬ শতাংশে। একই সঙ্গে বেড়েছে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির হারও। গত মাসে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৯ দশমিক ৮৯ শতাংশ। যদিও খাদ্য মূল্যস্ফীতি বাড়লেও গত মাসে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমেছে।  

সরকার নানা ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে উচ্চ মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরতে। তবে কোনো পদক্ষেপই এখন পর্যন্ত ফলপ্রসূ হয়নি। একই কথা প্রযোজ্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংকের নেয়া সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির ক্ষেত্রে। তাদের মুদ্রানীতির ছাপ অর্থনীতিতে নেই। সরকারও দাম বেঁধে, শুল্ক কমিয়ে, সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অভিযানে নামিয়েও খাদ্যপণ্যের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। এভাবে কেবল একটি সুবিধা হয়েছে—বাজার ব্যবস্থাপনায় বিশৃঙ্খলার স্বরূপ আরো স্পষ্টরূপে প্রকাশ পেয়েছে। আর দিন দিন নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য কেনা অলীক কল্পনা হয়ে যাচ্ছে। 

বলাবাহুল্য, উচ্চ মূল্যস্ফীতিই এখন দেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। নতুন অর্থবছর আসন্ন। নতুন অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এজন্য খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমানো অত্যন্ত জরুরি। নয়তো দরিদ্র মানুষদের মূল্যস্ফীতি নামক জাতাকলে পিষে যাওয়া থেকে বাঁচানো সম্ভব হবে না। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারও অসম্ভব হয়ে পড়বে। 

চলতি অর্থবছরের শুরুতে মূল্যস্ফীতিকে ৬ শতাংশের মধ্যে আটকে রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল সরকার। কিন্তু নানা পদক্ষেপ নিয়েও তা কোনোভাবেই ৯ শতাংশের নিচে নামানো যায়নি। দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপর রয়েছে টানা ২৪ মাস। গত ১২ মাসের গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ। করোনা মহামারীর আগ পর্যন্ত বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি কমবেশি ৫ শতাংশের মধ্যে ছিল। মূল্যস্ফীতি বাড়ায় স্বাভাবিকভাবেই সব শ্রেণী-পেশার মানুষকে খাদ্যপণ্যের পেছনে গুনতে হচ্ছে বাড়তি টাকা। আবার ব্যয় অনুসারে মানুষের আয় বাড়েনি। ফলে চাপ পড়ছে মানুষের সঞ্চয়ে, কমছে বিনিয়োগ; যা অর্থনীতির গতিশীলতাকে ধীর করছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সার্বিক অর্থনীতির শৃঙ্খলা ও সুশাসন জড়িত। সুতরাং শৃঙ্খলা ও সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র পাকিস্তান ছাড়া অন্য সব দেশের মূল্যস্ফীতি তুলনামূলক কম। দেউলিয়া হওয়া শ্রীলংকার অর্থনীতি পর্যন্ত ঘুরে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের সংকটকালে দেশটির মূল্যস্ফীতি হয়েছিল ৪৯ শতাংশের বেশি। ২০২৩ সালের জুলাইয়ে এ হার নেমে দাঁড়ায় ৬ দশমিক ৩ শতাংশে। মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছে শ্রীলংকা। এর মধ্যে কঠোর মুদ্রানীতি, ব্যাংকের সুদহার ও রাজস্ব আয় বাড়ানো, ঋণ পুনর্গঠন, শিল্প ও কৃষি খাতে উৎপাদন বাড়ানো উল্লেখযোগ্য।

বাংলাদেশ সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকও এমন ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে মূল্যস্ফীতি কমাতে। ব্যাংক খাতে ঋণের সুদহার কয়েক দফা বাড়ানো হয়েছে। সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির অংশ হিসেবে টাকা ছাপিয়ে সরকারকে ঋণ প্রদানের নীতি থেকেও সরে এসেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সম্প্রতি সুদহার বাজারভিত্তিক করা হয়েছে এবং ক্রলিং পেগ নীতি নেয়া হয়েছে। বাজার নিয়ন্ত্রণে কয়েক দফায় নির্দিষ্ট কিছু নিত্যপণ্যের দরও নির্ধারণ করে দেয়া হয়। মজুদদারি নিয়ন্ত্রণে বারবার অভিযানেও নেমেছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এতসব প্রয়াস সত্ত্বেও দেশে মূল্যস্ফীতির হার নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি। এর অন্যতম কারণ বাজারে সরবরাহজনিত সংকট ও নীতি সমন্বয়হীনতা। 

সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি নেয়া হলেও বাজেট ছিল সম্প্রসারণমূলক। অন্যদিকে রাজস্ব আয় বাড়ানো যায়নি। পরোক্ষ কর বাড়ানো হয়েছে কিন্তু প্রত্যক্ষ করের আওতা বৃদ্ধি সম্ভব হয়নি। এসবের বিপরীতে অবস্থা আরো শোচনীয় হয়েছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে কেবল নীতি প্রণয়ন নয়, সমন্বয়ও জরুরি। আর খাদ্য মূল্যস্ফীতি বাড়ার পেছনে বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও কথিত সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যকে অস্বীকার করার উপায় নেই।

প্রাথমিকভাবে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমাতে হলে সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে শক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে এবং সরবরাহ শৃঙ্খল ঠিক রাখা জরুরি। পাশাপাশি উৎপাদন বাড়াতে হবে। বাজার অর্থনীতিতে দাম নির্ধারণ করে বাজারদর নিয়ন্ত্রণ বেশ কঠিন। অতিমুনাফা অর্জনে কেউ যেন কৃত্রিম সংকট তৈরি না করতে পারে এবং দাম বাড়িয়ে দিতে না পারে তা নিশ্চিত করতে হবে। সরকারের এ বিষয়ে তৎপরতা বাড়ানো প্রয়োজন। বিশেষ করে সরকারিভাবে কৃষিদ্রব্যের গুদামজাত যত বেশি করা যাবে, অবৈধ মজুদকারীর দৌরাত্ম্য তত কমানো সম্ভব হবে। পাশাপাশি কৃষি উৎপাদন বাড়িয়ে আমদানিনির্ভরতা থেকে ধীরে ধীরে সরে আসা দরকার। বাজারে পণ্যের সরবরাহ বাড়ানোর মাধ্যমে প্রতিযোগিতা বাড়াতে হবে। তাহলে দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখা যাবে। 

তবে উৎপাদন বাড়ানো বেশ সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। আবার বর্তমানে ডলার সংকটের মুখে আমদানিতেও ব্যাঘাত ঘটছে। সরবরাহ সংকট দূর করতে হলে সময়মতো ও প্রয়োজনমাফিক আমদানি করা জরুরি। সরকারকে এ বিষয়ে আরো দূরদর্শী ভূমিকা পালন করতে হবে। শুল্ক বাড়িয়ে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি আমদানি সংকটকে তীব্র করে কেবল। এমন হঠকারিতা থেকে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন। এছাড়া আমদানি-রফতানি ব্যবস্থাপনায় কঠোর নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিতে তৎপরতা দরকার। বর্তমানে নিম্ন ও স্বল্প আয়ের মানুষকে বাড়তি দামের অভিঘাত থেকে রক্ষা করতে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) মাধ্যমে পণ্যের সরবরাহ বাড়াতে হবে। টিসিবির মাধ্যমে খোলাবাজারে পণ্য বিপণন ও তদারকিতে জোর প্রদান আবশ্যক। সবচেয়ে বেশি জরুরি আসন্ন অর্থবছরে সামাজিক নিরাপত্তা জালের পরিধি বাড়ানো।