পোশাক শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি ও শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা নিয়ে চলমান আলোচনার মধ্যে সরকার নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। কয়েক সপ্তাহ ধরে শ্রমিকদের বিক্ষোভ ও কারখানায় কাজ বন্ধ থাকার পর ১ নভেম্বর ছয় সদস্যের মজুরি বোর্ড গঠন করে। শ্রম আইন অনুযায়ী, এ বোর্ডের কাজ হলো পোশাক শ্রমিকদের জন্য নতুন মজুরি কাঠামোর সুপারিশ করা। বলার অপেক্ষা রাখে না দীর্ঘদিনের মূল্যস্ফীতির কারণে শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে এবং তাদের টাকায় আগের মতো প্রয়োজনীয় জিনিস কেনা যাচ্ছে না। অন্যদিকে কারখানার মালিকরা জ্বালানির সমস্যা, বাড়তি উৎপাদন ব্যয় এবং বিশ্ববাজারে তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে পড়েছেন। তাই মজুরি নির্ধারণের প্রক্রিয়াকে ন্যায্য, তথ্যভিত্তিক ও বিশ্বাসযোগ্য করতে হবে। একই সঙ্গে শিল্পের উৎপাদন ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতাও ধরে রাখতে হবে।
মজুরি বোর্ডের উচিত পোশাক শিল্প এলাকার মানুষের প্রকৃত জীবনযাত্রার খরচ হিসাব করে স্বচ্ছ পদ্ধতিতে মজুরি হিসাব করা। পরিবারের সদস্য সংখ্যা, স্থানীয় বাজারদর, খাবার ও বাসা ভাড়া, প্রয়োজনীয় সেবা, মূল্যস্ফীতি, উৎপাদনশীলতা, বিভিন্ন পদে মজুরির পার্থক্য এবং কারখানার আর্থিক অবস্থা বিবেচনায় নিতে হবে। শ্রমিকের হাতে বাস্তবে কত টাকা থাকে, ভাতা ও কেটে রাখা টাকার পরিমাণ কত এবং নিয়ম অনুযায়ী মজুরি দেয়া হচ্ছে কিনা— এসবও দেখতে হবে। শ্রমিকদের ওপর জরিপ, কারখানার তথ্য, জীবনযাত্রার খরচের হিসাব এবং শ্রমিক, মালিক ও গবেষকদের সঙ্গে আলোচনা বোর্ডকে ভালো সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে। কোন তথ্য ও ধারণার ভিত্তিতে সুপারিশ করা হয়েছে, তা সবার সামনে প্রকাশ করা উচিত।
এখানে একটি কথা মনে রাখা দরকার। মজুরি বাড়লে কারখানার শ্রম ব্যয় বাড়বে। তবে সব কারখানায় এর প্রভাব এক রকম হবে না। কম মুনাফায় চলা ছোট কারখানাগুলো বড় ও দক্ষ কারখানার তুলনায় বেশি চাপে পড়তে পারে। জ্বালানির ঘাটতি, অর্থায়নের সমস্যা, অনিয়মিত অর্ডার এবং কাঁচামাল ও পরিবহন ব্যয়ও বাড়তি চাপ তৈরি করছে। কাজ বন্ধ থাকলে পণ্য পাঠাতে দেরি হতে পারে, আকাশপথে পণ্য পাঠানোর খরচ বাড়তে পারে। তখন কোনো কোনো কারখানা অতিরিক্ত কাজের সময় বা নতুন নিয়োগ কমাতে পারে, এমনকি সময়মতো মজুরি দিতেও সমস্যায় পড়তে পারে। এসব ঝুঁকিকে গুরুত্ব দিতে হবে, তবে এগুলো দিয়ে জীবনযাত্রার ব্যয়ের তুলনায় মজুরি কম রাখার যুক্তি দেয়া যায় না। তাই এমন একটি পরিবর্তন পরিকল্পনা দরকার, যাতে কারখানাগুলো আগেভাগে প্রস্তুতি নিতে পারে এবং শ্রমিকদের আয়ও সুরক্ষিত থাকে।
অন্য দেশগুলোর সঙ্গে মজুরির তুলনা করার সময় সতর্ক থাকা দরকার। কেননা সব দেশে ন্যূনতম মজুরি একইভাবে নির্ধারিত বা কার্যকর হয় না। কোথাও এটি নির্দিষ্ট কিছু শ্রমিকের জন্য প্রযোজ্য, কোথাও অঞ্চলভেদে মজুরি আলাদা। ভাতা ও অন্যান্য সুবিধাও এক রকম নয়। আবার কোথাও আইন থাকলেও তা পুরোপুরি মানা হয় না। তাই শুধু মজুরির অঙ্ক দেখে দেশগুলোর তুলনা করলে সঠিক ধারণা পাওয়া যায় না। মুদ্রার বিনিময় হারও দেশগুলোর মজুরি তুলনায় প্রভাব ফেলে। তবে ক্রেতারা শুধু মজুরি নয়, পণ্যের খরচ ও মান, ত্রুটির হার, সরবরাহের সময়, অবকাঠামো এবং বাজারে প্রবেশের সুবিধাও বিবেচনা করেন। তাই কম মজুরির ওপর নির্ভর করে বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্ববাজারে অবস্থান ধরে রাখা সম্ভব নয়। উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, দক্ষতা ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ, ব্যবস্থাপনা উন্নত করা, নির্ভরযোগ্য জ্বালানি ও পরিবহন নিশ্চিত করা এবং বেশি মূল্য সংযোজন হয় এমন পণ্য তৈরি করা জরুরি। এতে মজুরি বাড়লেও প্রতি পণ্যের শ্রম ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব। ন্যায্য মজুরি শ্রমিক ধরে রাখতেও সহায়তা করবে; পাশাপাশি নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও শ্রমিক-মালিকের ভালো সম্পর্ক নিশ্চিত করতে হবে।
রফতানিকারকদেরও বড় দায়িত্ব আছে। উৎপাদন ব্যয় কমানো ও প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে কারখানাগুলো উপকরণ ও জ্বালানির দক্ষ ব্যবহার, উন্নত উৎপাদন পরিকল্পনা এবং উপযুক্ত প্রযুক্তি ব্যবহারে সচেষ্ট থাকে। এ উদ্যোগকে আরো এগিয়ে নিতে শ্রমিক ও তত্ত্বাবধায়কদের প্রশিক্ষণ এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনায় বিনিয়োগ প্রয়োজন। উৎপাদনশীলতা বাড়লে সেই লাভের একটি ন্যায্য অংশ শ্রমিকদের মজুরি, ভাতা ও নিরাপদ কর্মপরিবেশে দিতে হবে। শ্রমিকরা যেন ভয় ছাড়াই নিজেদের সমস্যা জানাতে পারেন, তা নিশ্চিত করতে হবে। দক্ষ ও স্থিতিশীল শ্রমিক এবং নির্ভরযোগ্য উৎপাদন কারখানার জন্য ব্যবসায়িক সুবিধা।
আন্তর্জাতিক ক্রেতারা বিভিন্ন দেশের সরবরাহকারীর দাম, পণ্যের মান ও সময়মতো সরবরাহের সক্ষমতা তুলনা করে অর্ডার দেন। তাই বাংলাদেশকে দক্ষতা, মান ও নির্ভরযোগ্যতার মাধ্যমে প্রতিযোগিতামূলক থাকতে হবে। একই সঙ্গে দায়িত্বশীল ক্রয়চর্চার অংশ হিসেবে ক্রেতা ও ব্র্যান্ডের উচিত এমন ন্যায্য ও বাস্তবসম্মত দাম নির্ধারণ করা, যাতে শ্রমমান মেনে উৎপাদন খরচ বিবেচনায় থাকে। অর্ডার ও সরবরাহের সময়সূচি স্থিতিশীল রাখা, শেষ মুহূর্তে পরিবর্তন এড়ানো এবং বিল সময়মতো দেয়াও তাদের দায়িত্ব। মজুরি বাড়লে সরবরাহকারী ও ক্রেতাদের আগেভাগে খরচ ও পণ্যের দাম নিয়ে আলোচনা করতে হবে। এতে কারখানাগুলো শ্রমিকের অধিকার মেনে চলার পাশাপাশি সময়মতো পণ্য সরবরাহের পরিকল্পনা করতে পারবে।
মজুরি বোর্ড গঠন করাই সরকারের একমাত্র দায়িত্ব নয়। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উচিত মজুরি বোর্ডকে কারিগরি সহায়তা দেয়া এবং তথ্য সংগ্রহের সমন্বয় করা। এমন একটি ব্যবস্থা থাকতে হবে যেখানে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো জীবনযাত্রার ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির তথ্য দেবে; শ্রম অধিদপ্তর, মালিক পক্ষের সংগঠন ও শ্রমিক সংগঠনগুলো মজুরি, কর্মপরিবেশ ও কারখানার ব্যয়-সংক্রান্ত তথ্য দেবে। প্রয়োজন হলে স্বাধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সহায়তাও নেয়া যেতে পারে।
শ্রমিক ও মালিক পক্ষের প্রতিনিধিরা যেন অর্থপূর্ণভাবে আলোচনায় অংশ নিতে পারেন, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। নতুন মজুরি কাঠামো চালু হলে শ্রম পরিদর্শকদের নিয়ম মানা হচ্ছে কিনা, মজুরি ও অতিরিক্ত কাজের টাকা সময়মতো দেয়া হচ্ছে কিনা—তা তদারক করতে হবে। বিরোধ আইন মেনে মীমাংসা করতে হবে এবং শ্রমিকদের সংগঠন করা ও দরকষাকষির অধিকার থাকতে হবে। জননিরাপত্তা বজায় রাখার পাশাপাশি শান্তিপূর্ণভাবে মতপ্রকাশের অধিকারও সম্মান করতে হবে। আলোচনা বা আইনসম্মত তদন্তের বদলে গ্রেফতার, চাকরিচ্যুতি বা কারখানা বন্ধ করে সমস্যার সমাধান করা যায় না।
অন্যদিকে সরকারকে এমন ব্যবসাবান্ধব পরিবেশও তৈরি করতে হবে, যেখানে ব্যবসা পরিচালনার খরচ কমবে এবং পণ্য তৈরি করা আরো সাশ্রয়ী ও প্রতিযোগিতামূলক হবে। এজন্য নির্ভরযোগ্য ও তুলনামূলক কম খরচের জ্বালানি, কার্যকর বন্দর ও পরিবহন, দ্রুত কাস্টমস ছাড় এবং ভ্যাট ফেরত, কর ও বাণিজ্যনীতিতে স্থিরতা এবং সহজ শর্তে চলতি মূলধন পাওয়ার ব্যবস্থা দরকার। শ্রম ব্যয় ছাড়া অন্যান্য খরচ কমলে কারখানাগুলো মজুরি বাড়ানোর চাপ সামলে দাম, মান ও সময়মতো সরবরাহের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা করতে পারবে। তবে এজন্য শ্রমিকের অধিকার বা মজুরি দেয়ার নিয়ম দুর্বল করা যাবে না। একই সঙ্গে উন্নত গণপরিবহন, শিল্পাঞ্চলের কাছে সাশ্রয়ী বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিশুযত্নের ব্যবস্থা শ্রমিকদের জীবনযাত্রার খরচ কমাতে পারে।
তাৎক্ষণিকভাবে বড় পরিবর্তন হলে কোনো কোনো দুর্বল কারখানা সমস্যায় পড়তে পারে। সেক্ষেত্রে ধাপে ধাপে মজুরি বাড়ানো যেতে পারে। তবে এজন্য স্পষ্ট ও বাধ্যতামূলক সময়সূচি থাকতে হবে। প্রথম ধাপেই শ্রমিকদের আয় বাড়াতে হবে এবং পরে মূল্যস্ফীতি ও উৎপাদনশীলতার পরিবর্তন দেখে নিয়মিত পর্যালোচনা করতে হবে। ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের কথা বলে মজুরি বৃদ্ধি অনির্দিষ্টকালের জন্য পিছিয়ে দেয়া উচিত নয়। সরকার, রফতানিকারক ও ক্রেতাদের একসঙ্গে এ পরিবর্তনের ব্যবস্থা করতে হবে। কারখানাগুলোকে তাদের ব্যয়ের চাপ ও দক্ষতা বাড়ানোর পরিকল্পনা জানাতে হবে। ক্রেতাদের ন্যায্য দাম ও স্থিতিশীল অর্ডার নিয়ে আলোচনা করতে হবে। সরকারকে একদিকে শ্রমিক ও কারখানাকে দক্ষতা, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তি উন্নয়নে সহায়তা করতে হবে, যাতে কম সময় ও খরচে বেশি ও ভালো মানের পণ্য তৈরি করা যায়। অন্যদিকে কারখানাগুলো শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি দেয় কিনা, কাজের সময় ও নিরাপত্তার নিয়ম মানে কিনা—তা তদারক করতে হবে। ছোট কিন্তু কার্যকর কারখানাকে সহায়তা দিলে তা স্বচ্ছ ও সাময়িক হতে হবে এবং নিয়ম মেনে চলা ও বিনিয়োগের সঙ্গে যুক্ত থাকতে হবে।
মজুরি বোর্ডের সিদ্ধান্তের গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করবে শুধু সুপারিশের ওপর নয়, সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রক্রিয়া কতটা বিশ্বাসযোগ্য এবং তা বাস্তবায়ন হচ্ছে কিনা, তার ওপরও। শ্রমিকের জীবনযাত্রার খরচ মেটানোর মতো মজুরি না হলে অসন্তোষ বাড়বে, কাজে আগ্রহ কমবে এবং আবার উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। আবার কারখানার সক্ষমতা বিবেচনা না করে পরিবর্তন আনলে কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ চাপে পড়তে পারে। বাংলাদেশকে এমন সমাধান খুঁজতে হবে, যাতে শ্রমিকরা তাদের তৈরি করা মূল্যের ন্যায্য অংশ পান, রফতানিকারকরা উৎপাদনশীলতা ও মান দিয়ে প্রতিযোগিতা করেন, আর ক্রেতারা তাদের ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তের দায় নেন। সরকারকে কার্যকর নিয়ম, সামাজিক সংলাপ এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নিশ্চিত করতে হবে। ন্যায্য মজুরি ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা একে অন্যের বিপরীত নয়। সরবরাহ ব্যবস্থার সবাই নিজ নিজ দায়িত্ব নিলে এ দুই লক্ষ্য একসঙ্গে অর্জন করা সম্ভব।
ড. ফাহমিদা খাতুন: অর্থনীতিবিদ ও সন্মাননীয় ফেলো, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ










