চলতি বছরের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল আমাদের শুধু হতাশ করেনি, ব্যথিতও করেছে। প্রশ্নটা সামনে চলে আসছে আমরা প্রজন্মকে কীভাবে গড়ে তুলছি? এবার পরীক্ষা দিয়েছে ১০ লাখ ৪৮ হাজার ৫৩০ জন। পাসের হার ৫১ দশমিক ৬২ শতাংশ, যা ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। জিপিএ ৫ পেয়েছে মাত্র ৩৫ হাজার ৯৪৮ জন। অথচ ২০২১ সালে পাসের হার ছিল প্রায় ৯৫ শতাংশ, আর জিপিএ ৫ পেয়েছিল ১ লাখ ৮৯ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী। মাঝের বছরগুলোতেও ওঠানামা চোখে পড়ার মতো। ২০২৪ সালে পাসের হার ছিল ৭৫ দশমিক ৫৬ শতাংশ, ২০২৫ সালে ৫৭ দশমিক ১২ শতাংশ। কোনো স্থিতিশীল ব্যবস্থায় এমন ওঠানামা হওয়ার কথা নয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘ শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা থেকে মনে হয়, ফল বিপর্যয়ের একটি বড় কারণ শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত মুখস্থনির্ভরতা এবং প্রশ্নব্যাংক ধরে পরীক্ষার প্রস্তুতি। পরীক্ষায় অপরিচিত প্রশ্ন এলে অনেকেই উত্তর দিতে পারে না। এবারের খারাপ ফল তারই ইঙ্গিত। শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তন না আনলে ভবিষ্যতেও এমন বিপর্যয়ের আশঙ্কা থাকবে। তাই সংস্কারের সময় এখনই।

শিক্ষা ব্যবস্থা সময়ের সঙ্গে বদলায়। কৃষিনির্ভর সমাজের শিক্ষা শিল্প বিপ্লবের যুগে একই থাকেনি। পরবর্তী প্রতিটি শিল্প বিপ্লবের সঙ্গে সঙ্গে নতুন চাহিদা তৈরি হয়েছে, আর সেই চাহিদা মেটাতে শিক্ষা ব্যবস্থাও নতুন রূপ নিয়েছে। তবে প্রতিটি ব্যবস্থাই সমাজের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও মূল্যবোধ সংরক্ষণের দায়িত্বও পালন করেছে। অর্থাৎ পরিবর্তন মানে শেকড় ছেড়ে দেয়া নয়; সময়ের প্রয়োজনের সঙ্গে নিজের মূল্যবোধের সমন্বয় ঘটানো। তাই আজকের সংস্কারও করতে হবে এ যুগের চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে। মুখস্থনির্ভর ও উচ্চ ঝুঁকির পরীক্ষাভিত্তিক মূল্যায়ন এ যুগের জন্য উপযোগী নয়।

তবে শুধু এইচএসসি পর্যায়ে সংস্কার করলে চলবে না। শুরু করতে হবে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে, যেখানে শিশুরা প্রথম শেখে—শিক্ষা মানে বুঝে পড়া, নাকি শুধু মুখস্থ করা।

মুখস্থনির্ভর ও উচ্চ ঝুঁকির পরীক্ষার ব্যর্থতা

ব্রিটিশ আমল থেকে এ দেশে মুখস্থনির্ভর ও উচ্চ ঝুঁকির পরীক্ষা চালু আছে। সময়ের সঙ্গে বিষয় ও পাঠ্যবস্তু বেড়েছে, কিন্তু পরীক্ষার ধরন প্রায় একই রয়ে গেছে। ফলে শেখার চেয়ে মনে রাখার চাপই বড় হয়ে উঠেছে।

যখন একটি পরীক্ষার ওপর পুরো ফলাফল নির্ভর করে, তখন শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষক—সবার লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় যেভাবেই হোক ভালো নম্বর পাওয়া। জ্ঞান অর্জন তখন গৌণ হয়ে যায়। শ্রেণীকক্ষের জায়গা নিয়ে নেয় গাইড বই, নোট, প্রশ্নব্যাংক ও কোচিং। শিক্ষার্থীরা খোঁজে কোন প্রশ্ন বেশি আসে, কোন উত্তর লিখলে নম্বর নিশ্চিত। বিষয়টি বোঝার প্রয়োজনই তারা অনুভব করে না।

মুখস্থ করা তথ্য দ্রুত ভুলে যাওয়া যায়, নতুন পরিস্থিতিতে প্রয়োগ করাও কঠিন। যে শিক্ষার্থী শুধু উত্তর মুখস্থ করেছে, সে একটু ঘুরিয়ে করা প্রশ্নেই দিশেহারা হয়ে পড়ে। সৃজনশীল পদ্ধতি চালুর উদ্দেশ্য ছিল ঠিক এ সমস্যা কাটানো। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, সৃজনশীল প্রশ্নের নমুনা উত্তরও মুখস্থ করার একটি নতুন ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। পদ্ধতি বদলেছে, মূল্যায়নের দর্শন ও প্রস্তুতির সংস্কৃতি বদলায়নি। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, প্রশ্নপত্রের মান ও খাতা মূল্যায়নের পদ্ধতিও এ পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি। এর মানসিক মূল্যও কম নয়।

জিপিএ ৫-কে সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি ধরার ফলে যারা প্রত্যাশা পূরণ করতে পারে না, তারা নিজেদের ব্যর্থ ভাবতে শুরু করে। পরিবার ও সমাজের প্রত্যাশার চাপ সেই বোঝা আরো ভারী করে। এসব কারণেই এ পদ্ধতি বদলের যুক্তি আজ আরো জোরালো।

অনিশ্চিত যুগের শিক্ষা

আমরা এমন এক যুগে বাস করছি, যেখানে আজ যা শেখানো হচ্ছে, ১০ বছর পর তার কতটা কাজে লাগবে তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও অটোমেশনের কারণে অনেক পেশা বদলে যাচ্ছে, কিছু বিলুপ্ত হচ্ছে, আবার এমন কাজের জন্ম হচ্ছে যার নামও আমরা এখনো জানি না। যে তথ্য মুখস্থ করে উত্তরপত্রে লেখা যায়, তা এখন যন্ত্রের কাছ থেকে মুহূর্তেই পাওয়া যায়। তাই শিক্ষার লক্ষ্য হওয়া উচিত তথ্য জমানো নয়, বরং বুঝে শেখা, প্রশ্ন করা, বিশ্লেষণ করা এবং নতুন পরিস্থিতিতে জ্ঞান প্রয়োগ করার সামর্থ্য গড়ে তোলা।

এজন্য পাঠ্যক্রমে সমালোচনামূলক চিন্তা, সমস্যা সমাধান, সৃজনশীলতা, যোগাযোগ দক্ষতা, দলগত কাজ ও ডিজিটাল সাক্ষরতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। মূল্যায়নও একটি উচ্চ ঝুঁকির পরীক্ষার ওপর নির্ভর না করে ধারাবাহিক মূল্যায়ন, প্রকল্পভিত্তিক কাজ, মৌখিক উপস্থাপনা ও ব্যবহারিক দক্ষতা যাচাইয়ের দিকে এগোতে হবে, যাতে শিক্ষার্থী জিপিএর পেছনে না ছুটে শেখার আনন্দ খুঁজে পায়। তবে এসব পরিবর্তন কাজে আসবে তখনই, যখন শিক্ষকরা যথাযথ প্রশিক্ষণ পাবেন এবং তথ্য সরবরাহকারীর ভূমিকা ছেড়ে শিক্ষার্থীর পথপ্রদর্শক হয়ে উঠবেন। আর শেখার প্রতি আগ্রহ ও আজীবন শিক্ষার মানসিকতা যেহেতু শৈশবেই গড়ে ওঠে, সংস্কারের সূচনা হতে হবে প্রাথমিক স্তর থেকেই।

আজ যারা প্রথম শ্রেণীতে ভর্তি হয়েছে, ১২ বছর পর তারা এইচএসসি পরীক্ষার্থী হবে, আরো চার বছর পর উচ্চ শিক্ষা শেষে কর্মজীবনে পা রাখবে। অর্থাৎ ২০৪০-এর দশকের কর্মবাজারের জন্য আমরা আজ তাদের তৈরি করছি। সে সময়ের সমাজ ও বৈশ্বিক অর্থনীতি কেমন হবে, তা আজ আমাদের কল্পনার বাইরে। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত করে বলা যায়: সমালোচনামূলক চিন্তা, সৃজনশীলতা, নৈতিক বিবেচনা, সহযোগিতা ও জটিল সমস্যা সমাধানের মতো কিছু মানবিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সামর্থ্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও যন্ত্র সহজে আয়ত্ত করতে পারবে না। শিক্ষা সংস্কারের ভিত্তি হতে হবে এসব দক্ষতা, আর প্রশ্ন হবে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার সময় কীভাবে সেগুলো অর্জন করতে পারে।

এ কাজ কোনো একক মন্ত্রণালয় বা কর্মকর্তার পক্ষে সম্ভব নয়। শিক্ষা গবেষক, শিক্ষাবিদ, ব্যবসায়ী, অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকদের নিয়ে একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি গঠন করা যেতে পারে। কমিটি পাঠ্যক্রম, মূল্যায়ন পদ্ধতি ও শিক্ষক প্রশিক্ষণের একটি সুস্পষ্ট দীর্ঘমেয়াদি রূপরেখা তৈরি করবে। সবচেয়ে জরুরি, সরকার বদলালেই যেন শিক্ষা ব্যবস্থা না বদলায়। শিক্ষা একটি জাতীয় বিনিয়োগ, যার ফল পেতে এক প্রজন্ম লেগে যায়। তাই এর দিকনির্দেশনা হতে হবে দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে। আজ সিদ্ধান্ত না নিলে আরেকটি প্রজন্ম প্রস্তুতি ছাড়াই অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি হবে। তাই আর কালক্ষেপণ নয়।

এমএম শহিদুল হাসান: ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর, ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি ও সাবেক অধ্যাপক, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)