চলতি বছরের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পাসের হার ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ। গত বছর এ হার ছিল ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ। ২০২৪ সালে ছিল ৭৭ দশমিক ৭৮। অর্থাৎ কয়েক বছর ধরে এইচএসসি ও সমমানের ফল নিম্নমুখী, বিশেষত এবারের ফল গত ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। কমেছে জিপিএ ৫ প্রাপ্তির সংখ্যাও। বেড়েছে কেবল একজন পরীক্ষার্থীও পাস করেনি এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা, ২৯৩টি। ফলাফলের এমন বিপর্যয় উদ্বেগজনক। তবে এ উদ্বেগ যতটা না শিক্ষার্থীদের ঘিরে হওয়া সমীচীন, তার চেয়েও বেশি ভাবনা প্রয়োজন পুরো শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঘিরে।
একই পাঠ্যক্রম ও পরীক্ষায় অংশ নিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভেদে ফলাফলের বড় ব্যবধান রয়েছে। ফলাফল বিশ্লেষণের ভিত্তিতে বণিক বার্তার প্রতিবেদন জানাচ্ছে, স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর অধিকাংশই ভালো ফল ধরে রেখেছে। দেশের ১২টি ক্যাডেট কলেজে শতভাগ শিক্ষার্থী পাস করেছে। অন্যদিকে ২৯৩টি প্রতিষ্ঠানের একজন শিক্ষার্থীও উত্তীর্ণ হতে পারেননি। ঢাকা মহানগরীতে পাসের হার যেখানে ৭৯ দশমিক ৩৩ শতাংশ, সেখানে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের অধীন ১৩ জেলার মধ্যে সাতটির পাসের হার ৫০ শতাংশের নিচে। এ ফলাফল কেবল শিক্ষার্থীদের মেধা কিংবা পরিশ্রমের পার্থক্য দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। বরং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ, শিক্ষক সক্ষমতা, পাঠদানের ধারাবাহিকতা ও ব্যবস্থাপনার মানের পার্থক্য আছে কিনা সেটিও পর্যালোচনার দাবি রাখে। বণিক বার্তাকে দেয়া ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানের বক্তব্যেও অধিকাংশ কলেজে অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষের পদ শূন্য থাকা, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের ঘাটতি, দুর্বল তদারকি এবং শিক্ষকদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার বিষয়গুলো উঠে এসেছে।
আবার শ্রেণীকক্ষে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিও অনেক প্রতিষ্ঠানে ৪০ শতাংশের নিচে ছিল বলে জানা গেছে। এসব তথ্য স্পষ্ট করে যে শিক্ষার সংকট কেবল শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত ব্যর্থতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি কেন নিশ্চিত করতে পারেনি সে প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের দুর্বল একাডেমিক ব্যবস্থাপনা ও অনিয়মিত পাঠদান অব্যাহত রেখে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ভালো ফল প্রত্যাশা করা বাস্তবসম্মত নয়।
এক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন। উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার ভিত তৈরি হয় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে। এবারের ফলাফলে আবশ্যিক বিষয়গুলোয় শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা বিশেষভাবে লক্ষণীয়। ইংরেজি এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিতে (আইসিটি) বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে। আবার ৪ লাখ ২২ হাজার ৯০৫ শিক্ষার্থী এক বা দুই বিষয়ে উত্তীর্ণ হতে পারেনি। এসব তথ্য শিক্ষার্থীদের শেখার ঘাটতির পাশাপাশি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে তাদের শিক্ষার ভিত কতটা মজবুত হয়েছে, সে প্রশ্নও সামনে আনে। উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে ভালো ফলের জন্য প্রয়োজনীয় মৌলিক দক্ষতা যদি আগের স্তরগুলোয় অর্জিত না হয়, তাহলে পরবর্তী পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের পিছিয়ে পড়া অস্বাভাবিক নয়। চলতি বছর এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফলও সন্তোষজনক ছিল না।
আরেকটি লক্ষণীয় বিষয় হলো, চলতি বছরের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় মানবিক বিভাগে পাসের হার মাত্র ৪২ দশমিক ১৭ শতাংশ। অর্থাৎ এ বিভাগে অর্ধেকের বেশি শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হতে পারেননি। অথচ দেশের বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী এ বিভাগে পড়াশোনা করে। বিজ্ঞান ও ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের তুলনায় মানবিক বিভাগকে তুলনামূলক কম গুরুত্ব দেয়া, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের অভাব কিংবা পাঠদানের দুর্বলতা এ ফলাফলে প্রভাব ফেলছে কিনা তা অনুসন্ধান করা প্রয়োজন।
এর বাইরে শিক্ষা ব্যবস্থার রাজনৈতিকীকরণ ও দলীয়করণও দীর্ঘদিন ধরে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতের পথে বাধা হয়ে রয়েছে। শিক্ষক নিয়োগ, প্রতিষ্ঠান পরিচালনা ও শিক্ষার পরিবেশে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ নতুন নয়। এছাড়া অতীতে নানা প্রেক্ষাপটে অটোপাস, সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে পরীক্ষা এবং মূল্যায়নে নম্বর বাড়িয়ে দেয়ার প্রবণতা শিক্ষার্থীদের প্রকৃত শেখার বিষয়ে বিভ্রান্তিকর ধারণা তৈরি করেছে।
এসব সমস্যার সমাধানে প্রয়োজন অভিভাবক, শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত উদ্যোগ। শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি, পাঠাভ্যাস এবং শেখার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষার্থীরা কোথায় পিছিয়ে পড়ছে, তা শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেয়ার ব্যবস্থা থাকতে হবে।
এবার এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের দ্রুত পুনঃপরীক্ষার সুযোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত ইতিবাচক। এতে অনেক শিক্ষার্থীর একটি বছর নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি কমবে। তবে এটি সাময়িক ব্যবস্থা। দীর্ঘমেয়াদে প্রয়োজন শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়ন, যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ, শূন্য পদ পূরণ, নিয়মিত শ্রেণীকক্ষে পাঠদান এবং কার্যকর তদারকি। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক ফলাফল বিশ্লেষণ করে দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিশেষ সহায়তা দিতে হবে। পরীক্ষার মূল্যায়ন পদ্ধতির নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের শেখার ঘাটতি পূরণে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
প্রয়োজন এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা, যেখানে শিক্ষার্থীরা মানসম্মত পাঠদান পাবে, শিক্ষকরা দায়িত্ব পালনের উপযুক্ত পরিবেশ পাবেন এবং প্রতিষ্ঠানগুলো জবাবদিহির আওতায় থাকবে। শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতার পেছনে ব্যবস্থার দায় চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সংস্কার নিশ্চিত করলে আগামীতে ফলাফল বিপর্যয়ের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হবে না বলে প্রত্যাশা রয়েছে।










