মাথাভর্তি সুন্দর ঝরঝরে চুল কার না কাম্য? অথচ, চুল পড়ছে না এমন মানুষ বর্তমানে খুবই বিরল! অনেক দিন ধরে অতিরিক্ত চুল পড়তে থাকলে এক পর্যায়ে টাক পড়ে যায়, যা আত্মবিশ্বাসে মারাত্মক প্রভাব ফেলে, মনকে অবসাদগ্রস্ত করে ফেলে! যদিও এখন অনেক লোভনীয় আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতির নাম শোনা যায়, তবে সঠিক কারণ এবং রোগের ধরন নির্ধারণের পরই একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নির্ধারণ করেন কোন চিকিৎসা পদ্ধতি কার জন্য কার্যকর ও হেয়ার ট্রান্সপ্লান্টের মতো আধুনিক চিকিৎসা কখন প্রযোজ্য হবে।

চুল পড়ার যত কারণ

বংশগত ও বয়স: মেল ও ফিমেল প্যাটার্ন ব্যাল্ডনেস, বাবা-মায়ের কোন বয়সে চুল পড়া শুরু হয়েছিল অনেকাংশেই তার ওপর নির্ভরশীল।

পুষ্টিহীনতা: প্রোটিন, আয়রন, ভিটামিনের অভাবে চুল গঠনগতভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে যায়।

মাথার তালুর কিছু রোগ: ছত্রাকজনিত রোগ, খুশকি, উকুন সংক্রমণ, অ্যালোপেসিয়া এরিয়াটা, সোরিয়াসিস, লুপাস, অ্যালার্জির সমস্যায়ও চুল পড়তে পারে।

অন্যান্য রোগ: থাইরয়েড ও অন্যান্য হরমোনের সমস্যা, পিসিওডি, অটোইমিউন রোগ, ভাইরাল জ্বর, প্রসবের পর চুল পড়তে পারে।

ওষুধ: কেমোথেরাপি, রেডিয়েশন থেরাপি ইত্যাদির প্রভাব।

দৈনন্দিন অভ্যাস: রাত জাগা, অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা করা, ধূমপান, মদ্যপান, অতিরিক্ত হিট, কেমিক্যাল, হেয়ার ডাই দিয়ে চুল স্টাইল করা।

পরিবেশদূষণ: দূষিত পানি ও অতিরিক্ত কেমিক্যাল দিয়ে পরিশোধিত পানি ব্যবহার।

হেয়ার ট্রান্সপ্লান্ট কী

অটোলগাস হেয়ার ট্রান্সপ্লান্ট বর্তমানে বিপুল জনপ্রিয় একটি আধুনিক অস্ত্রোপচার পদ্ধতি, যাতে শরীরের ডোনার অংশ থেকে সুস্থ চুল নিয়ে চুলহীন অংশে প্রতিস্থাপন করা হয়।

হেয়ার ট্রান্সপ্লান্টের প্রধান ধরন

(ফলিকুলার ইউনিট এক্সট্রাকশন): বিশেষ মাইক্রো-পাঞ্চ যন্ত্রের সাহায্যে একটি করে চুলের ফলিকল ইউনিট প্রতিস্থাপন করা হয়।

সুবিধা: সেলাই লাগে না, দাগ থাকে না।

(ফলিকুলার ইউনিট ট্রান্সপ্লান্টেশন বা স্ট্রিপ মেথড): ডোনার অংশ থেকে চুলযুক্ত পাতলা চামড়ার স্ট্রিপ সংগ্রহ করে প্রতিস্থাপন করা হয়।

অসুবিধা: পেছনের অংশে লম্বা ক্ষত থেকে যেতে পারে।

চুল পড়লেই কি ট্রান্সপ্লান্টের কথা চিন্তা করবেন?

অবশ্যই না! সঠিক রোগে সঠিক চিকিৎসা প্রয়োজন। কিছু কারণে চুল পড়া রোধে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী খাওয়ার ওষুধ, মাথায় লাগানোর সলিউশন, পিআরপি এবং অন্যান্য ইনজেকশন ও চিকিৎসা পদ্ধতি প্রযোজ্য ও যথেষ্ট।

কারা হেয়ার ট্রান্সপ্লান্টের উপযুক্ত

  • মেল/ফিমেল প্যাটার্ন হেয়ার লস নিয়ন্ত্রণে এলে
  • সাধারণত বয়স ২৫ বছর বয়স পার হলে
  • শরীরের যেকোনো অংশে যেমন মাথা, ভ্রু, দাড়ি, বুক ইত্যাদি অংশে সৌন্দর্য বৃদ্ধির লক্ষ্যে অথবা মেডিকেল কারণে কোথাও চুলের ঘাটতি হলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শে হেয়ার ট্রান্সপ্লান্ট করা সম্ভব।

হেয়ার ট্রান্সপ্লান্টের আগে মূল্যায়ন ও পরামর্শ

  • বিশেষজ্ঞ প্রথমে আপনার মাথার ত্বকের অবস্থা ও চুলের ঘনত্ব পরীক্ষা করেন।
  • আপনার প্রত্যাশা ও বাস্তবতার সামঞ্জস্য রেখে কোন পদ্ধতি এফইউই না এফইউটি আপনার জন্য ভালো হবে ডাক্তার তার সিদ্ধান্ত নেন।
  • অস্ত্রোপচারের কয়েক দিন আগে থেকে রক্তপাতের ঝুঁকি বাড়ায় এমন ওষুধ, অ্যালকোহল ও ধূমপান বন্ধ রাখতে হয়।
  • কিছু সিস্টেমিক অথবা লোকাল রোগ আছে, যা নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে।
  • ডাক্তারের পরামর্শে আগে থেকে টপিকাল সলিউশন বা নির্দিষ্ট ভিটামিন ব্যবহার করতে হয়।

হেয়ার ট্রান্সপ্লান্ট কতটা কার্যকরী ও নিরাপদ

নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে দক্ষ ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের মাধ্যমে করালে এটি নিরাপদ এবং দীর্ঘস্থায়ী।

ঝুঁকি ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া

  • যেকোনো অস্ত্রোপচারের মতোই এর কিছু সাধারণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকতে পারে, যেমন সাময়িক ব্যথা, চুলকানি, ফোলা ভাব।
  • অনভিজ্ঞ হাতে করালে ও ঠিকমতো যত্ন না নিলে প্রদাহ, ইনফেকশন, ক্ষত হতে পারে, দ্রুত পড়ে যেতে পারে।

ট্রান্সপ্লান্ট দীর্ঘস্থায়ী করতে যা করবেন

  • চিকিৎসকের পরামর্শে সঠিকভাবে যত্ন করলে ট্রান্সপ্লান্ট করা চুল দীর্ঘস্থায়ী করা সম্ভব।
  • প্রথম কয়েকদিন বিশেষ নিয়মে মাথা পরিষ্কার করতে হবে। চুলকানো, জোরে ঘষা, আঘাত পরিহার করতে হবে।
  • প্রতিস্থাপিত এলাকায় চিকিৎসকের পরামর্শে মিনক্সিডিল, ফিনাস্টারাইড, পিআরপি ও অন্যান্য থেরাপি নিতে হতে পারে।
  • অ্যালকোহল ও ধূমপান বন্ধ রাখতে হবে।
  • চুলকে মজবুত করতে প্রোটিন, বায়োটিন, আয়রন, ভিটামিন সমৃদ্ধ খাবার ডিম, বাদাম, সবুজ শাকসবজি, মাছ বেশি করে খেতে হবে।
  • নির্দিষ্ট সময় পরপর ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।

সতর্কতা

ইদানীং অনেক কম খরচে হেয়ার ট্রান্সপ্লান্টের আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন প্রায়ই চোখে পড়ে! এসব বিজ্ঞাপনে প্রলুব্ধ না হয়ে নিরাপত্তার কথা ভাবতে হবে। মনে রাখতে হবে হেয়ার ট্রান্সপ্লান্ট একটি জটিল অস্ত্রোপচার পদ্ধতি, অদক্ষ হাতে যা থেকে বড় ক্ষতি হতে পারে। তাই ভালোমতো খোঁজখবর নিয়ে একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে, একজন সুদক্ষ বিশেষজ্ঞের হাতে এ চিকিৎসা নেয়া উচিত। সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে হারানো চুল, সৌন্দর্য ও আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়া যেতে পারে।

লেখক : কনসালট্যান্ট চর্মরোগ ও ভেনেরোলজি

অ্যাস্থেটিক, অ্যান্টিএজিং স্পেশালিস্ট

ডার্মাটো-সার্জন, নেইল, ভিটিলিগো

গ্রাফট সার্জন, হেয়ার ট্রান্সপ্লান্ট সার্জন

চেম্বার: ল্যাবএইড অ্যাস্থেটিক অ্যান্ড

লেজার লাউঞ্জ, ঢাকা।