২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ফ্রান্সে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় ছাত্র বিক্ষোভ চলছে। প্যারিসের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত সুবিধাবঞ্চিত উপশহর ক্রেতেই-এর একটিমাত্র উচ্চ বিদ্যালয়ে (ফরাসি ভাষায় লিসে) একটি ছোট বিক্ষোভ হিসেবে শুরু হয়েছিল। এখন তা দেশব্যাপী এক আন্দোলনে পরিণত হয়েছে, যেখানে শত শত মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং ১ অক্টোবর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও অংশ নিয়েছেন। শিক্ষক, অভিভাবক এবং ট্রেড ইউনিয়নগুলো এর সমর্থনে যোগ দিয়েছে। শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো মূলত শিক্ষক সংকট, পড়াশোনার পরিবেশ, অবকাঠামো (অতিরিক্ত ভিড়যুক্ত শ্রেণীকক্ষ, জরাজীর্ণ ভবন), অতিরিক্ত ব্যস্ত সময়সূচি এবং বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে।

একটি স্কুলভিত্তিক প্রতিবাদ আন্দোলনের জন্য রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া ছিল অস্বাভাবিক মাত্রার। সহিংসতা শুরু হওয়ার পর থেকে ৫ হাজার ৬০ জনকে পুলিশি হেফাজতে নেয়া হয়েছে, যাদের ৮৭ শতাংশ অপ্রাপ্তবয়স্ক। ১ হাজার ৮০২ জন বিচারের মুখোমুখি। প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লেকোর্নু জানিয়েছেন, সংঘর্ষের সময় ২১৫ জন শিক্ষার্থী এবং ৮৫ জন শিক্ষাকর্মী আহত হয়েছে, এবং তিনি এটিকে কয়েক দশকের মধ্যে স্কুল ব্যবস্থার জন্য সবচেয়ে বড় ক্ষতি বলে অভিহিত করেছেন।

এ সংকট রাষ্ট্রপতি ইমানুয়েল মাখোঁ সরকারের জন্য একটি রাজনৈতিক পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে, যা একটি বিতর্কিত ব্যয় সংকোচন বাজেট এবং ২০২৭ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রস্তুতির সঙ্গে মিলে গেছে। রাজনৈতিক দলগুলো এ আন্দোলন সম্পর্কে অত্যন্ত ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছে। কিছু বিরোধী রাজনীতিবিদ ছাত্রদের সমর্থন করছেন এবং পুলিশের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করছেন, অন্যদিকে অন্যরা সহিংসতা, ভাংচুর এবং স্কুল অবরোধের কারণে সৃষ্ট বিশৃঙ্খলার ওপর আলোকপাত করেছেন।

অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট গুরুত্বপূর্ণ

সরকার একটি কঠিন আর্থিক পরিস্থিতির সম্মুখীন। সরকার ২০২৭ সালের জন্য এমন একটি বাজেট পেশ করেছিল যেখানে ৪৩ বিলিয়ন ইউরো ব্যয় সংকোচনের কথা বলা হয়েছিল। ফ্রান্সের সরকারি ঋণের পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়েছিল, সরকারি বন্ডের সুদ কয়েক দশকের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের নির্বাচনের পর সংসদে সরকারের সংখ্যালঘু অবস্থান বাজেট পাস করাকে কঠিন করে তুলেছিল। উল্লেখযোগ্য আর্থিক চাপের মুখে এ বিক্ষোভগুলো সংঘটিত হয়েছিল। একদিকে যেমন তাকে জনসেবা খাতে বৃহত্তর বিনিয়োগের দাবি মেটাতে হবে, তেমনই ফ্রান্সের বাজেট ঘাটতি ও ঋণ কমানোরও চেষ্টা করতে হবে। সামাজিক দাবি এবং আর্থিক সীমাবদ্ধতার মধ্যকার এ সংঘাতই চলমান বিক্ষোভের অন্যতম প্রধান কারণ। জন ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া এ বিক্ষোভ ফ্রান্সে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বিষয় হয়ে উঠেছে, বিশেষ করে যেহেতু দেশটি তার পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

ফ্রান্সে ২০২৬ সালের ছাত্র বিক্ষোভ সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি অপর্যাপ্ত বিনিয়োগের ফলে সৃষ্ট একটি গভীর সংকটকে উন্মোচিত করেছে। এ আন্দোলন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সাহায্যে দ্রুত ও বিকেন্দ্রীভূতভাবে সংগঠিত হয় এবং স্থানীয় অবরোধ থেকে একটি দেশব্যাপী সামাজিক আন্দোলনে রূপান্তরিত হয়। সরকারের প্রতিক্রিয়া—সীমিত ছাড় এবং কঠোর দমনপীড়নের মিশ্রণ—এ অস্থিরতা দমনে ব্যর্থ হয়েছে। বরং পুলিশের সহিংসতার ঘটনা আরো বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এ বিক্ষোভ আন্দোলনের সঙ্গে আর্থিক কৃচ্ছ্রসাধন এবং নির্বাচনী রাজনীতির সম্পৃক্ততা এটিকে বর্তমানে ফ্রান্সের মুখোমুখি হওয়া একাধিক সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছে।

ফ্রান্সে ছাত্র বিক্ষোভ থেকে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা

ফ্রান্সের ২০২৬ সালের ছাত্র আন্দোলন সমসাময়িক ইউরোপে যুব রাজনীতি, নাগরিক অবকাঠামো, পুলিশের কার্যকলাপ এবং সামাজিক আন্দোলন সম্পর্কে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়।

সমস্যা সংকটে পরিণত হওয়ার আগেই ছাত্রদের কথা শোনা। সবচেয়ে স্পষ্ট শিক্ষাগুলোর মধ্যে একটি হলো, সরকারের উচিত প্রাথমিক পর্যায়েই ছাত্রদের উদ্বেগকে গুরুত্ব সহকারে নেয়া। এ বিক্ষোভগুলো প্রমাণ করে যে তরুণরা সম্মিলিতভাবে সংগঠিত হতে এবং তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করতে সক্ষম। আন্দোলনটি স্কুলের দৈনন্দিন পরিস্থিতি নিয়ে স্থানীয় অভিযোগ দিয়ে শুরু হলেও দ্রুতই এটি একটি জাতীয় ইস্যুতে পরিণত হয়। এ সংকট দেখিয়ে দিয়েছে যে সরকারি শিক্ষায় দীর্ঘস্থায়ী স্বল্প বিনিয়োগ সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং দ্রুতই প্রাতিষ্ঠানিক নাগরিক অস্থিরতায় রূপান্তরিত হয়। তরুণদের কেবল সরকারি নীতির প্রাপক হিসেবে নয়, গণতন্ত্রের অংশগ্রহণকারী হিসেবে গণ্য করা উচিত। ছাত্র, শিক্ষক এবং অভিভাবকদের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা সরকারকে সমস্যাগুলো বড় আকারের বিক্ষোভে পরিণত হওয়ার আগেই চিহ্নিত করতে সাহায্য করতে পারে।

ডিজিটাল প্লাটফর্ম (সোশ্যাল মিডিয়া) দ্রুত গণসংহতিকে ত্বরান্বিত করতে পারে। সোশ্যাল মিডিয়া স্থানীয় ছাত্র কমিটিগুলোকে অবরোধ সমন্বয় করতে, কাঁদানে গ্যাস মোকাবেলার কৌশল ভাগ করে নিতে এবং সংঘর্ষের সরাসরি চিত্র প্রকাশ করতে সাহায্য করেছিল। আন্দোলনটি উল্লেখযোগ্য গতিতে ছড়িয়ে পড়ে এবং এতে সোশ্যাল মিডিয়া একটি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে। শিক্ষার্থীরা পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, জ্বলন্ত ব্যারিকেড এবং কাঁদানে গ্যাস ব্যবহারের দৃশ্য ধারণ করে এবং সেই ফুটেজ আপলোড করে, যা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং আন্দোলনের বিস্তারকে বাড়িয়ে তোলে। এ গতিশীলতা আন্দোলনটির তীব্রতা বৃদ্ধিতেও অবদান রাখে। পুলিশের সহিংসতার নাটকীয় ফুটেজ ক্ষোভকে উসকে দেয় এবং আরো অংশগ্রহণকারীকে আকৃষ্ট করে, অন্যদিকে সংঘর্ষের বিষয়বস্তুর ভাইরাল প্রকৃতি আরো সহিংস দৃশ্যের জন্য উৎসাহ জুগিয়ে থাকতে পারে। কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই বুঝতে হবে যে যুব আন্দোলনগুলো এখন বিকেন্দ্রীভূত, অ্যালগরিদম দ্বারা বিবর্ধিত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরিচালিত হয়, যা প্রচলিত যোগাযোগ কৌশলগুলোর পক্ষে সহজে মোকাবেলা করা সম্ভব নয়।

যখন অপ্রাপ্তবয়স্করা জড়িত থাকে, তখন পুলিশের প্রতিক্রিয়া অবশ্যই বিশেষভাবে সতর্ক হতে হবে। বলপ্রয়োগ একটি বড় বিতর্কের বিষয় হয়ে উঠেছে। তরুণ বিক্ষোভকারীদের ওপর পুলিশি ব্যবস্থা গুরুতর ঝুঁকি বহন করে। বিক্ষোভগুলোতে পুলিশের কার্যকলাপ ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয় এবং আন্দোলনটিকে আরো উগ্রপন্থী করে তুলেছে বলে মনে হয়। যখন বিক্ষোভে অপ্রাপ্তবয়স্করা জড়িত থাকে, তখন জীবন রক্ষা করা এবং গুরুতর আঘাত প্রতিরোধ করাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া উচিত।

সামাজিক বৈষম্য একটি শিক্ষাগত সমস্যায় পরিণত হতে পারে। অনেক বিক্ষোভের সূত্রপাত হয়েছিল সুবিধাবঞ্চিত এলাকার শিক্ষার্থীদের দ্বারা বা তারা এতে জড়িত ছিল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত ৬ অক্টোবর ফ্রান্সে ছাত্র বিক্ষোভের জন্য "ব্যাপক অভিবাসন" এবং "ইসলামকে দায়ী করেছেন। তার দেশের কঠিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে তিনি অবিবেচকভাবে তার বয়ানকে আরো জোরালো করতে এ মন্তব্য করেন। তাদের বিক্ষোভগুলো তুলে ধরে যে সম্পদ, স্কুলের অবস্থা এবং সুযোগের পার্থক্যের মতো সামাজিক বৈষম্য কীভাবে পিছিয়ে পড়ার অনুভূতিতে অবদান রাখতে পারে। শিক্ষানীতিতে অধিক সুবিধাবঞ্চিত বিদ্যালয় ও জনগোষ্ঠীর প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেয়া উচিত।

সরকারি যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ। এ বিক্ষোভগুলো এও দেখায় যে কোনো আন্দোলন বড় আকার ধারণ করার পরই কেবল তার প্রতিক্রিয়া জানালে উত্তেজনা আরো বাড়তে পারে। বিক্ষোভকারীরা সরকারের কিছু পদক্ষেপ ও ঘোষণাকে অপর্যাপ্ত বলে মনে করেছিল। সরকারের উচিত, শুধু প্রতিশ্রুতির ওপর নির্ভর না করে স্পষ্টভাবে যোগাযোগ করা, ন্যায্য উদ্বেগগুলোকে স্বীকার করা এবং পদক্ষেপের জন্য সুনির্দিষ্ট সময়সীমা প্রদান করা।

শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ একটি গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক অধিকার। এ বিক্ষোভগুলো নাগরিকদের শান্তিপূর্ণভাবে অসন্তোষ প্রকাশের সুযোগ দেয়ার গুরুত্ব তুলে ধরে। একই সঙ্গে সহিংসতা, ভাংচুর এবং মানুষের ওপর আক্রমণকে শুধু বিক্ষোভ চলাকালীন ঘটেছে বলেই ন্যায্য বলে প্রমাণ করা যায় না। এ আন্দোলনে ন্যায্য অভিযোগ এবং সহিংসতার ঘটনা উভয়ই অন্তর্ভুক্ত ছিল। সরকারের উচিত, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার রক্ষা করা এবং একই সঙ্গে জননিরাপত্তার প্রতি প্রকৃত হুমকির ক্ষেত্রে আনুপাতিকভাবে প্রতিক্রিয়া জানানো। পুলিশের ছোড়া একটি গ্রেনেডে এক কিশোরের কনুই পর্যন্ত উড়ে যাওয়ার পর ফরাসি সরকার প্রতিবাদী হাই স্কুল শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে পুলিশের স্টান গ্রেনেড ব্যবহার স্থগিত করেছে। জাতীয় পুলিশের জেনারেল ইন্সপেক্টরেট কথিত অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলপ্রয়োগ-সংক্রান্ত একাধিক ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে।

এরই মধ্যে সরকার একটি পাঁচ দফা কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। ছাত্রসংগঠনগুলো তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে এবং এ আন্দোলন আরো প্রসারিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ছাত্রসংগঠনগুলো একটি নতুন কর্মসূচিসহ আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। ৩১ অক্টোবর তৃতীয় শনিবারের মতো বিক্ষোভ কর্মসূচি আয়োজনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। ১৭ অক্টোবরের ঘটনার পুনরাবৃত্তি—যখন হাজার হাজার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত বা লুটপাটের শিকার হয়েছিল—তা রোধ করতে কর্তৃপক্ষ এবার বিক্ষোভের সংখ্যা ও পথ কঠোরভাবে সীমিত করার উদ্যোগ নিয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরঁ নুনেস বলেছেন যে, গত ৩১ অক্টোবর ফ্রান্সজুড়ে বিক্ষোভ চলাকালে "জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত হওয়ার অত্যন্ত উচ্চ ঝুঁকি" রয়েছে। মিছিল করার অনুমতি দেয়া হবে, তবে শহরের কেন্দ্রস্থলে নয়।

শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদের বিষয়ে ফরাসি সরকারের প্রতিক্রিয়াকে পুরোপুরি সক্রিয় (proactive) না বলে, বরং পরিস্থিতি অনুযায়ী সাড়া দেয়া বা প্রতিক্রিয়াশীল (reactive) হিসেবে অভিহিত করা যেতে পারে। প্রতিবাদ কর্মসূচিগুলো গত ২১ সেপ্টেম্বরের দিকে শুরু হলেও শিক্ষার্থী ও অভিভাবক সংগঠনগুলোর সঙ্গে শিক্ষামন্ত্রীর বৈঠকের সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল ২ অক্টোবর—অর্থাৎ প্রায় ১১ দিন পর। ফরাসি সরকার এ প্রতিবাদের ব্যাপকতা অনুধাবনে ধীর ছিল এবং শুরুতে তারা জনশৃঙ্খলা রক্ষার ওপরই অত্যধিক গুরুত্ব দিয়েছিল।

ড. সাজ্জাদ মোহাম্মদ জসীমউদ্দীন: ফ্রান্সের কেজ বিজনেস স্কুলের সিনিয়র অধ্যাপক এবং সেখানকার ‘জিওপলিটিকস স্ট্র্যাটেজি ল্যাব’-এর প্রধান