ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে রাজধানীসহ এর আশপাশ এলাকায় দিনভর বিক্ষোভ, অবরোধ ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। গতকাল রাজধানীর মিরপুর, সাভারের হেমায়েতপুর ও গাজীপুরের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে এসব ঘটনায় পুলিশের গাড়ি ও পুলিশ বক্সে অগ্নিসংযোগ, কারখানা, ব্যাংক ও যানবাহনে ভাংচুরের ঘটনা ঘটেছে। এতে আন্দোলনকারী, পুলিশ সদস্য ও সাংবাদিকদের আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। শ্রমিকদের অবরোধে ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন স্থানে জলকামান, কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে পুলিশ। শ্রমিক অসন্তোষের কারণে গাজীপুর ও সাভারের বিভিন্ন কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়।

গতকাল সকাল ৮টার দিকে রাজধানীর মিরপুরে কয়েকটি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা মিরপুর-১০ নম্বর মোড়ে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন। এতে মিরপুর-১০, ১১, ১২, ১৪ নম্বরসহ আশপাশ এলাকায় যান চলাচল ব্যাহত হয়। পরে শ্রমিকদের সড়ক থেকে সরাতে গেলে বেলা সোয়া ১১টার দিকে পুলিশের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ শুরু হয়। দুপুর পৌনে ১২টা পর্যন্ত উভয় পক্ষের মধ্যে দফায় দফায় পাল্টাপাল্টি ধাওয়া চলে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, পুলিশ বারবার শ্রমিকদের সড়ক থেকে সরে যাওয়ার অনুরোধ করে। একপর্যায়ে শ্রমিকরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছুড়তে শুরু করেন। তখন পুলিশ লাঠিপেটা করে তাদের ধাওয়া দেয়। এ সময় জলকামান থেকে পানি ছোড়ার পাশাপাশি সাউন্ড গ্রেনেড ও কাঁদানে গ্যাসের শেল ব্যবহার করা হয়। এতে শ্রমিকরা ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলেও পরে আবার সংগঠিত হয়ে বিভিন্ন দিক থেকে পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছোড়েন। এর মধ্যে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে মিরপুর-১১ নম্বর মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দেয়া হয়। এতে স্টেশনের পানির লাইন পুড়ে যায়। ঘটনার পর স্টেশনের পূর্ব পাশের একটি গেট বন্ধ রাখা হয়।

শ্রমিক আন্দোলন ও সংঘর্ষের প্রভাব পড়ে মেট্রোরেল চলাচলেও। নিরাপত্তাঝুঁকি বিবেচনায় বেলা সাড়ে ১১টার দিকে মিরপুর-১০ স্টেশনে ট্রেন থামানো বন্ধ করা হয়। এর কিছু সময় পর কাজীপাড়া স্টেশনের গেট বন্ধ করে দেয়া হয়। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে পল্লবী স্টেশনেও ট্রেন থামানো বন্ধ রাখা হয়। ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) জানায়, নিরাপত্তাঝুঁকি বিবেচনায় তিনটি স্টেশনে ট্রেন থামানো বন্ধ রাখা হয়েছিল। পরে পর্যায়ক্রমে স্টেশনগুলো চালু করা হয়। বেলা ২টার দিকে মেট্রোরেল চলাচল পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়।

দুপুরে পুলিশ আন্দোলনকারীদের সড়ক থেকে সরিয়ে দিলে মিরপুর এলাকায় যান চলাচল স্বাভাবিক হতে শুরু করে। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) যুগ্ম কমিশনার মহিদুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, জনভোগান্তি কমাতে পর্যাপ্ত পুলিশ সদস্য ও কর্মকর্তা নিয়ে সড়ক পরিষ্কার করা হয়েছে। এ সময় সাউন্ড গ্রেনেড ও বাঁশি ব্যবহার করা হলেও লাঠিচার্জ করা হয়নি। কাউকে আটক করা হয়নি এবং পুলিশের কোনো সদস্য আহত হননি।

অন্যদিকে শ্রমিক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও নাশকতার চেষ্টার অভিযোগে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের ১১ নেতাকর্মীকে গ্রেফতারের কথা জানিয়েছে ডিবির মিরপুর বিভাগ। ডিবির উপকমিশনার মোহাম্মদ রাকিব খান জানান, সাধারণ শ্রমিকদের ব্যবহার করে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীরা নাশকতার চেষ্টা করছিলেন। গ্রেফতার ব্যক্তিরা বিভিন্ন জেলার তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মী। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট অন্যদের শনাক্ত ও গ্রেফতারে অভিযান চলছে।

4

দিনভর সড়ক অবরোধ ও সংঘর্ষের কারণে মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রীরা। যানবাহন না পেয়ে অনেকে হেঁটে গন্তব্যে রওনা হন। স্কুলে থাকা সন্তানদের আনতে গিয়েও বিপাকে পড়েন অভিভাবকরা। আবাসিক এলাকার কোনো কোনো প্রবেশপথ বন্ধ থাকায় স্থানীয় বাসিন্দাদেরও চলাচলে ভোগান্তি পোহাতে হয়।

সাভারে মহাসড়ক অবরোধ, ভাংচুর: সাভারের হেমায়েতপুরে বেতন বাড়ানোসহ বিভিন্ন দাবিতে গতকাল দুপুরে মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন পোশাক কারখানার শ্রমিকরা। এ সময় কারখানায় ভাংচুর এবং প্রায় ২৫টি যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আন্দোলনের ভিডিও ধারণ করতে গিয়ে বাধা ও মারধরের শিকার হন কয়েকজন। গতকাল সকালে শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক আন্দোলন শুরু হলেও হেমায়েতপুর এলাকায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক ছিল। বেলা ৩টার দিকে হেমায়েতপুরের একেএইচ গার্মেন্টসের শ্রমিকরা কারখানা ছুটি দেয়ার দাবি জানান। এ সময় আশপাশ থেকেও কিছু লোকজন এসে কারখানার সামনে অবস্থান নিয়ে ভাংচুর শুরু করেন। এ সময় কারখানার ভেতর থেকে শ্রমিকদের একটি অংশ বের হয়ে চলে যান এবং একটি অংশ আন্দোলনে যোগ দেন। একপর্যায়ে আন্দোলনকারীরা ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের উভয় পাশ অবরোধ করে টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। পরে তারা কারখানার ভেতরে ঢুকে ভাংচুর করেন। এরপর কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত গাড়ি, শ্রমিক পরিবহনের বাস, লরি এবং মহাসড়কে থাকা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ও সাধারণ মানুষের গাড়িসহ প্রায় ২৫টি যানবাহন ভাংচুর করা হয়।

এ সময় সাংবাদিকদের দেখে হামলার চেষ্টা চালায় আন্দোলনকারীদের একটি অংশ। ভিডিও ধারণ ও ছবি তুলতে বাধা দেয়া হয়। সাধারণ মানুষও এ বাধার মুখে পড়ে। ভিডিও ধারণ করায় একজনের মুঠোফোন কেড়ে নিয়ে তাকে মারধর করা হয়। বিকাল ৫টার দিকে পুলিশ ঘটনাস্থলে অবস্থান নিলে আন্দোলনকারীরা সরে যেতে থাকেন। পরে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক হয়।

শিল্প পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার মমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া বণিক বার্তাকে জানান, পোশাক কারখানার শ্রমিকরা সকাল থেকেই কাজে যোগ দিয়েছিলেন। এর মধ্যে দুপুর পর্যন্ত ৫০টি পোশাক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। শিল্পাঞ্চলজুড়ে অতিরিক্ত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন রয়েছেন এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

গাজীপুরে ৭ ঘণ্টা মহাসড়ক অবরোধ: গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলেও গতকাল সকাল থেকে দিনভর বিক্ষোভ, অবরোধ ও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। একপর্যায়ে বিভিন্ন স্থানে পুলিশ বক্স, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গাড়ি, ব্যাংক ও কারখানায় ভাংচুর চালানো হয়। চন্দ্রা পল্লীবিদ্যুৎ এলাকায় ট্রপিক্যাল নিটেক্স লিমিটেডের ঝুটগুদামেও আগুন লাগে। শ্রমিকদের ইটপাটকেলের আঘাতে ৮-১০ পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন তিন সাংবাদিকও। এ সময় দীপ্ত টিভির সাংবাদিক জাহাঙ্গীর আলমের ক্যামেরা ছিনিয়ে নেয়া হয়। আরেক সাংবাদিকের মুঠোফোন ছিনিয়ে নেয়া হলেও পরে তা ফিরিয়ে দেয়া হয়।

সকাল ৮টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে অবরোধের কারণে জয়দেবপুর চৌরাস্তা থেকে চন্দ্রা পর্যন্ত যান চলাচল বন্ধ থাকে। এতে আটকা পড়ে দূরপাল্লার বাস, পণ্যবাহী ট্রাকসহ বিভিন্ন যানবাহন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পাঁচ প্লাটুন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতায়েন করা হয়। পুলিশ বিক্ষোভকারীদের সরিয়ে দিতে লাঠিপেটার পাশাপাশি জলকামান, কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে। বেলা ৩টার দিকে শ্রমিকদের সড়ক থেকে সরিয়ে দিলে যান চলাচল স্বাভাবিক হতে শুরু করে।

শিল্প পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সকাল সাড়ে ৮টার দিকে বিভিন্ন কারখানায় কাজে যোগ দেয়ার পর শ্রমিকদের একটি অংশ বেরিয়ে এসে বিক্ষোভ শুরু করেন। প্রথমে কালিয়াকৈরের মৌচাক, সফিপুর ও চন্দ্রা পল্লীবিদ্যুৎ এলাকায় আন্দোলন শুরু হলেও পরে তা কোনাবাড়ী, রতনপুর, কাশিমপুরসহ আশপাশের শিল্পাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে হাজার হাজার শ্রমিক লাঠিসোঁটা ও লোহার পাইপ হাতে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নেন। সড়কের মাঝখানে মোটরসাইকেল ও কাঠের জিনিসপত্রে আগুন ধরিয়ে দিয়ে যান চলাচল বন্ধ করে দেন তারা। আন্দোলনের কারণে আশপাশের কারখানাগুলোতে ছুটি ঘোষণা করা হলে শ্রমিকদের জমায়েত আরো বাড়ে।

আন্দোলনরত শ্রমিকদের দাবি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে বর্তমান মজুরিতে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এর সঙ্গে ওভারটাইমের সুযোগ কমে যাওয়ায় আয়ও কমেছে। ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করতে হবে। শ্রমিকদের দাবি, তারা শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করছিলেন। এর মধ্যে বহিরাগতরা ঢুকে কারখানায় ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করেছে।

গাজীপুর ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ-২-এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন পিপিএম জানান, গুদামে আগুন লাগার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেলেও কেউ আগুন দিয়েছে, নাকি অন্য কোনো কারণে এর সূত্রপাত হয়েছে, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বিষয়টি তদন্ত করে দেখতে হবে।

গাজীপুরের পুলিশ সুপার মো. জসিম উদ্দিন বলেন, ‘বর্তমানে জেলার সার্বিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। শ্রমিকদের দাবির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সরকার মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর উদ্যোগ ও আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত এ সমস্যার সমাধান হবে।’