সাভারে কমছেই না ডেঙ্গুর প্রকোপ। প্রতিদিন শুধু জ্বর নিয়েই উপজেলার একমাত্র সরকারি হাসপাতাল ৫০ শয্যার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিতে আসছে শতাধিক রোগী। এর মধ্যে ভর্তি আছে ৩০ জন ডেঙ্গু রোগী। শয্যা সংকটে হাসপাতালের বারান্দা ও মেঝেতে বিছানা পেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে তাদের। একই অবস্থা বেসরকারি হাসপাতালগুলোরও। রোগীর চাপ বাড়লেও প্রয়োজনীয় শয্যার অভাবে চিকিৎসাসেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে ভুল পরিকল্পনায় মশা নিধন কার্যক্রম, জমে থাকা পানি ও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ ডেঙ্গুর ঝুঁকি বাড়াচ্ছে বলে মত গবেষকদের।
জানা গেছে, সাভারে এক কোটির বেশি মানুষ বসবাস করে। এ বিশালসংখ্যক মানুষের চিকিৎসায় সরকারি হাসপাতাল বলতে রয়েছে কেবল ৫০ শয্যার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ডেঙ্গুর এ মৌসুমে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় প্রতিদিন দ্বিগুণ রোগী চিকিৎসা নিতে আসছে। এতে ব্যস্ত সময় পার করছেন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা। এছাড়া ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ায় ও হাসপাতালে শয্যা সংকট থাকায় সব রোগীকে ভর্তি রেখে চিকিৎসা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। আরো জানা যায়, শুধু অক্টোবরেই ২৯১ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি থেকে চিকিৎসা নিয়েছে। বর্তমানে ডেঙ্গু ছাড়াও প্রতিদিন ৮৫-৯০ জন রোগী ভর্তি থেকে চিকিৎসা নিচ্ছে।
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ঘুরে দেখা যায়, এখানে পুরুষ ওয়ার্ডে ২৫ ও নারী ওয়ার্ডে ২৫টি সিট আছে। ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ায় রোগীদের চাপে হাসপাতালের বারান্দা ও হাঁটাচলার রাস্তায় বিছানা পেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। সেখানে মশারি টানিয়ে অবস্থান করে সেবা নিচ্ছে রোগীরা।
সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. ফজলে বারী বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করি কোনো রোগী যাতে ফিরে না যায়। এজন্য সাধ্যের মধ্যে যতটুকু করা সম্ভব, তা করছি। রোগীদের জ্বর তিনদিন পার হয়ে গেলে আমরা ভর্তি করে নিই। কিন্তু ৫০ শয্যার হাসপাতাল হিসেবে এখানে চিকিৎসক ও নার্সের সংকট আছে। এর মধ্যেই প্রতিদিন ৮০-৯০ জন রোগীকে সেবা দিয়ে যাচ্ছি।’
একই অবস্থা বেসরকারি হাসপাতালগুলোরও। সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, সেখানেও ডেঙ্গু রোগীর শয্যা খালি নেই। তবু রোগীদের অবস্থা বেশি খারাপ হলে অন্য ওয়ার্ডে ভর্তি করে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে বলে জানান হাসপাতালটির ম্যানেজার ইউসুফ। তিনি জানান, গত শনিবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ১৯১ জন রোগী ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছে। শয্যা খালি না থাকায় অনেক রোগীকে ফিরিয়ে দেয়া হয়।
হাসপাতালটিতে কথা হয় আহসান হাবিব রেদুয়ানের সঙ্গে। তার শাশুড়ির জ্বর আসার পর শারীরিক অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। এর পরই এনাম মেডিকেল হাসপাতালে আনা হয়। তবে প্রথমে শয্যা পাননি। বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরে একপর্যায়ে অন্য একটি ওয়ার্ডে তার শাশুড়িকে ভর্তি করাতে পারেন। আহসান হাবিব বলেন, ‘প্রথমে সরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাই, কিন্তু সিট পাইনি। এরপর এনামে আনার পর তারাও সিট নেই বলে ফিরিয়ে দেন। পরে পরিচিত কয়েকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করে একটা সিট পাই। এরপর চিকিৎসা শুরু হয়।’
এদিকে সাভারের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে জানা যায়, জমে থাকা পানি, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও বাড়ির আশপাশে ময়লা-আবর্জনা পড়ে থাকা নিয়ে অভিযোগ রয়েছে স্থানীয়দের। তাদের আশঙ্কা, এসব স্থানে এডিস মশার বংশবিস্তার ডেঙ্গুর সংক্রমণ আরো বাড়িয়ে তুলতে পারে। এদিকে ডেঙ্গুর প্রকোপ না কমার পেছনে অপরিকল্পিত মশক নিধন কার্যক্রম ও সচেতনতার অভাবকে দায়ী করছেন গবেষকরা। তাদের মতে, সংক্রমণের উৎসে নজর না দিলে এডিস মশার বিস্তার ঠেকানো যাবে না। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার জানান, ডেঙ্গু এখন আর নির্দিষ্ট কোনো মৌসুমে সীমাবদ্ধ নেই। সময়ের সঙ্গে মশাবাহিত এ ভাইরাসের প্রভাব এখন সারা বছরই দেখা যাচ্ছে। নভেম্বরেও ডেঙ্গুর প্রকোপ থাকবে।
তিনি বলেন, ‘এডিস মশার জন্ম হয় মূলত বাড়ির আঙিনা বা ছাদে জমে থাকা পানি, ফুলের টব, পরিত্যক্ত টায়ার, দুই ভবনের মাঝের অংশে ও গাড়ির গ্যারেজে। এসব জায়গায় জমে থাকা পানিতে ৭০ শতাংশের বেশি এডিস মশার জন্ম হয়। কিন্তু ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলো এডিস মশার লার্ভা ধ্বংস করতে ওষুধ ছিটায় ড্রেনে, মাঠের কোণে, খালি জায়গায় বা ময়লার স্তূপে। আদতে ওইসব জায়গায় জন্মায় কিউলেক্স মশা; এডিস মশা না। ফলে ধ্বংস হয় কিউলেক্স মশা, এডিস মশার কিছুই হয় না।’
মশক নিধন কার্যক্রমের বিষয়ে সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘পৌরসভায় কিছু জনবল দিয়ে অভিযান চালানো গেলেও ইউনিয়ন পর্যায়ে তা সম্ভব হচ্ছে না।’ সীমাবদ্ধতার কথা জানিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের জনবলের যেমন ঘাটতি আছে, তেমনি অর্থ ও সরঞ্জামেরও সংকট আছে। তবু জনসাধারণকে সচেতন করার চেষ্টা করে যাচ্ছি।’










