শ্রম অসন্তোষের জেরে একদিনেই বন্ধ হয়ে গেছে দেশের বিভিন্ন শিল্প অধ্যুষিত এলাকার ৫২৯টি পোশাক কারখানায় উৎপাদন। এসব কারখানার প্রায় ৯ লাখ ৮৭ হাজার শ্রমিক গতকাল কাজ না করেই কর্মস্থল ত্যাগ করেন। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে আজও উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করছেন শিল্প মালিকরা। এ অবস্থায় শ্রম আইনের ১৩(১) ধারা অনুযায়ী ‘কাজ নেই, মজুরি নেই’ নীতিতে কারখানা বন্ধ রাখার বিষয়টিও বিবেচনায় নিয়েছেন তারা।

এদিকে কারখানা চালু রাখতে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে শ্রমিকদের স্বার্থরক্ষা, রফতানি কার্যক্রম নির্বিঘ্ন ও জননিরাপত্তা ঠিক রাখতে তিনি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছেন।

শ্রমিক অসন্তোষের প্রেক্ষাপটে গতকাল সন্ধ্যায় সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে প্রায় দেড় ঘণ্টা বৈঠক করেন সরকারপ্রধান। ওই বৈঠক শেষে এ নির্দেশনার কথা তুলে ধরেন শ্রম ও প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী।

প্রধানমন্ত্রী কী বলেছেন জানতে চাইলে শ্রমমন্ত্রী বলেন, ‘উনি বলছেন যে কলকারখানা-শিল্প-কারখানা যেন সঠিকভাবে চলে, জনগণের জানমালের যেন নিরাপত্তা থাকে, আমরা সবাই যেন সবাই সজাগ থাকি। এ ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছেন।’

পোশাক শ্রমিকদের নিম্নতম মজুরি পুনর্নির্ধারণে ছয় সদস্যের মজুরি বোর্ডও গঠন করেছে সরকার। বোর্ড গঠনের ঘোষণা দিয়ে গতকাল শ্রমিকদের আন্দোলন ছেড়ে কাজে ফেরার আহ্বান জানান শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। তবে এর পরও শ্রম অসন্তোষের অবসান এবং কারখানার উৎপাদন স্বাভাবিক হওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি।

তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) নেতারা বলছেন, সব কারখানা চালু রাখার চেষ্টা করছেন মালিকরা। তবে উৎপাদন চালু রাখার মতো পরিবেশ নিশ্চিত না হলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে।

বিজিএমইএর হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, দেশের তিন শিল্প অধ্যুষিত মিরপুর, গাজীপুর-ময়মনসিংহ, সাভার-আশুলিয়ায় গতকাল সংগঠনটির আওতাধীন ২ হাজার ১৩৪টি কারখানার মধ্যে সচল ছিল ১ হাজার ৮১৬টি। তবে শ্রম অসন্তোষের জেরে বেলা সাড়ে ৩টা পর্যন্ত ৫২৯টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়। এর মধ্যে ঢাকা মহানগরীর মিরপুরে শ্রমিকরা কাজ না করে বেরিয়ে গেলে ৬৮টি কারখানা ছুটি ঘোষণা করা হয়। এসব কারখানায় শ্রমিকের সংখ্যা ৫১ হাজার ৬২৫। গাজীপুর ও ময়মনসিংহ এলাকায় ৮৩৬টির মধ্যে ২৭৬ কারখানার ৬ লাখ ৪৫ হাজার ৩৬০ শ্রমিক অসন্তোষের কারণে কর্মস্থল ত্যাগ করেন। সাভার, আশুলিয়া ও জিরানী এলাকায় ৪৪১টি কারখানার মধ্যে ১৮৫টির শ্রমিকরা কাজ না করে বেরিয়ে যান। এ এলাকায় গতকাল কাজ করেননি মোট ২ লাখ ৯০ হাজার ২০৫ শ্রমিক।

শ্রম অসন্তোষের মধ্যে কারখানা চালু রাখা নিয়ে গতকাল বিকালে বিজিএমইএ কমপ্লেক্সে সদস্য কারখানার মালিকদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে সংগঠনের সাবেক সভাপতি ও বর্তমান নেতাসহ ২৫০ জনের বেশি প্রতিনিধি অংশ নেন। তারা প্রায় ৭০০ কারখানার প্রতিনিধিত্ব করেন। বৈঠকে বারবার উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং আজ কারখানা চালু রাখা নিয়ে অনিশ্চয়তার বিষয়টি উঠে আসে। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে শ্রম আইনের ১৩(১) ধারা অনুযায়ী ‘কাজ নেই, মজুরি নেই’ নীতিতে কারখানা বন্ধ রাখার সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা করেন মালিকরা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মজুরি বোর্ড গঠন নিয়ে শ্রমিকদের যে উদ্বেগ ছিল, সরকার তা সমাধান করেছে। এর পরও যদি কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা হয়, তাহলে আমরা আর এটিকে শুধু মজুরি বোর্ড গঠন নিয়ে অসন্তোষ হিসেবে দেখব না। তখন মনে হবে, আমাদের এ খাতকে ধ্বংস করার চেষ্টা চলছে। আমরা সোমবার (আজ) পর্যন্ত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করব।’

কারখানা চালু রাখার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘কোনো কারখানা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত আমরা দিইনি। সব কারখানাই চালু থাকবে। তবে চালু করার মতো পরিবেশ না থাকলে সেটি ভিন্ন বিষয়। সবাই কারখানা চালুর চেষ্টা করছেন, কিন্তু আতঙ্কের কারণে রোববার (গতকাল) অনেকে বন্ধ রাখেন।’

পোশাক শ্রমিকদের মজুরি পুনর্নির্ধারণে ছয় সদস্যের নতুন বোর্ড গঠন করেছে সরকার। মজুরি বোর্ডের চেয়ারম্যান সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ শেখ আশফাকুর রহমান এ বোর্ডের প্রধান। এছাড়া মালিক পক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে বিজিএমইএর পরিচালক এবিএম সামছুদ্দিন ও বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের যুগ্ম মহাসচিব আসিফ আইয়ুব, শ্রমিক পক্ষের প্রতিনিধি বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল শ্রমিক ফেডারেশনের (বিজিআইডব্লিউএফ) সাধারণ সম্পাদক বাবুল আখতার ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে রাখা হয়েছে। আর নিরপেক্ষ প্রতিনিধি হিসেবে বোর্ডে আছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ।

মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দিতে গতকাল আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে শ্রমমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, ‘গার্মেন্টস শ্রমিকদের নিম্নতম মজুরি পুনর্নির্ধারণে গঠন করা হয়েছে ছয় সদস্যের বোর্ড। শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের দাবি বিবেচনায় নিয়ে তাদের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করেই বোর্ড গঠন করা হয়েছে।’ বোর্ডের সদস্যরা দ্রুততম সময়ের মধ্যে আলোচনা ও পর্যালোচনার মাধ্যমে উপযুক্ত মজুরি নির্ধারণ করবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। একই সঙ্গে শ্রমিকদের রাজপথ ছেড়ে নিজ নিজ কারখানায় কাজে ফেরার আহ্বান জানান মন্ত্রী।

পোশাক শ্রমিকদের নিম্নতম মজুরি গত দুই দশকে কয়েক দফায় পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০০৬ সালে নিম্নতম মজুরি ছিল ১ হাজার ৬৬২ টাকা ৫০ পয়সা। ২০১০ সালে তা বাড়িয়ে ৩ হাজার, ২০১৩ সালে ৫ হাজার ৩০০, ২০১৮ সালে ৮ হাজার এবং সর্বশেষ ২০২৩ সালে পোশাক শ্রমিকদের নিম্নতম মজুরি সাড়ে ১২ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়, যা ওই বছরের ডিসেম্বরে কার্যকর হয়েছিল। নতুন মজুরি নির্ধারণের বিষয়ে শ্রমমন্ত্রী বলেন, ‘মজুরি বোর্ড স্বাধীনভাবে কাজ করবে। মালিক ও শ্রমিক পক্ষের প্রতিনিধিরা পারস্পরিক আলোচনা ও পর্যালোচনার মাধ্যমে উপযুক্ত মজুরি নির্ধারণ করবেন। সরকার দ্রুততম সময়ের মধ্যে বোর্ডের কার্যক্রম এগিয়ে নিতে চায়।’

মজুরি বোর্ড গঠনের পরও রাজধানীর মিরপুর, গাজীপুরের কালিয়াকৈর, ঢাকার সাভার ও আশুলিয়ায় বিক্ষোভ, অবরোধ ও গাড়িতে আগুন দেয়ার ঘটনা ঘটে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে সন্ধ্যায় বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

বৈঠকের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন ও স্বার্থরক্ষার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দিয়েছেন। একই সঙ্গে শিল্পের উৎপাদন ও রফতানি যাতে ব্যাহত না হয়, সে বিষয়েও পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণের জন্য বোর্ড গঠন করা হয়েছে। এখন আলোচনার মাধ্যমে তাদের জীবনমান উন্নয়নের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। সহিংসতার সঙ্গে কোনো প্রকৃত শ্রমিক বা শ্রমিক সংগঠন জড়িত বলে তারা মনে করেন না। যারা সহিংসতা ও বিশৃঙ্খলার সঙ্গে জড়িত হবে, তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের কাছে যে তথ্য রয়েছে, তা বিশ্লেষণ করে দেখেছি, নিরীহ গার্মেন্টস শ্রমিকদের ব্যবহার করে অনেকেই সীমান্তের ওপার থেকে ইন্ধন জোগাচ্ছে। এখানে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি, আমাদের রফতানি বাণিজ্য ও গার্মেন্টসের উৎপাদন ব্যাহত এবং দেশে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা চলছে। এ ধরনের অপতৎপরতা কঠোরভাবে মোকাবেলা করা হবে।’

গার্মেন্টস শিল্প মালিকদের প্রতি কারখানা ও উৎপাদন চালু রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘কোনোভাবেই রফতানি সংকট তৈরি হয়, এমন পদক্ষেপ নেয়া উচিত হবে না। শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে মালিকদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।’ কারখানা বন্ধের সিদ্ধান্ত সাময়িক হতে পারে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।

শ্রম অসন্তোষের পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে বলে মনে করছেন পোশাক শিল্পের কয়েকজন মালিক। তাদের দাবি, কয়েকটি কারখানায় ককটেল পাওয়া গেছে এবং নিক্ষেপের ঘটনাও ঘটেছে। শ্রমিকদের মজুরি দাবির সঙ্গে এ ধরনের সহিংসতার সম্পর্ক নেই।

এর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে স্প্যারো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চলমান ঘটনা দেশের জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটি দেশের সক্ষমতা ও স্থিতিশীলতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সময়মতো পণ্য জাহাজীকরণ ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার মতো সূচক বিবেচনায় নেয়া হয়। ৫২৯টি কারখানা এ ঘটনায় প্রভাবিত হওয়ায় দেশের ভাবমূর্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে সময়মতো পণ্য জাহাজীকরণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের যে সুনাম রয়েছে, সেটিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।’

এ পরিস্থিতিকে জাতীয় নিরাপত্তার সংকট হিসেবে দেখা হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলনের নামে যে অরাজকতা ও তাণ্ডব চলছে তা অযৌক্তিক। এ ধরনের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।’

শ্রমিকদের ন্যায্য ও যৌক্তিক মজুরি সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলে মনে করে মালিক পক্ষ। তাদের মতে, পাঁচ বছর পরপর মজুরি বোর্ড গঠনের বিধান থাকলেও অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তা তিন বছর করা হয়েছে। দেশে বাধ্যতামূলক ৯ শতাংশ বার্ষিক মজুরি বৃদ্ধির বিধান থাকার পরও তারা সরকারের এ সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছেন বলে জানান।

এ বিষয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছতে গঠনমূলক সংলাপ, পারস্পরিক বোঝাপড়া ও দায়িত্বশীল আলোচনার বিকল্প নেই বলে মনে করেন দেশের অন্যতম বড় পোশাক রফতানিকারক এক প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শ্রমিকদের যৌক্তিক দাবিকে পুঁজি করে সহিংসতা, ভাংচুর ও নাশকতার সুযোগ নিয়ে দেশী-বিদেশী রাজনৈতিক বা স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের উদ্দেশ্য হাসিলের চেষ্টা করতে পারে। এতে একদিকে শিল্পের স্থিতিশীলতা বিঘ্নিত হবে, অন্যদিকে ঝুঁকিতে পড়বে লাখ লাখ শ্রমিকের জীবন ও জীবিকা।’