চীনের শিল্প উৎপাদনে ফের দেখা গেছে মন্থর গতি। দেশটির উৎপাদন খাতের কার্যক্রম সংকুচিত হয়েছে অক্টোবরে। বিশেষ করে নতুন রফতানি আদেশ কমে যাওয়ায় কারখানাগুলোর উৎপাদন কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এতে থমকে গেছে আগের মাসের পুনরুদ্ধারের ধারাও। অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ বাজারে চাহিদা দুর্বল থাকায় বিদেশের বাজারের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন চীনা উৎপাদনকারীরা। খবর এপি।

প্রতিবেদনে বলা হয়, সস্তা চীনা পণ্যের প্রবেশ বাড়ায় ইউরোপসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক অংশীদারের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। ফলে একদিকে রফতানি বাজার ধরে রাখা, অন্যদিকে বাণিজ্যিক অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা—দুদিক থেকেই চাপে রয়েছে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিটি।

চীনের জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর (এনবিএস) প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, অক্টোবরে দেশটির সরকারি উৎপাদন খাতের পারচেজিং ম্যানেজার্স ইনডেক্স (পিএমআই) কমে ৪৯ দশমিক ৩ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। সেপ্টেম্বরে এ সূচকের মান ছিল ৫০ দশমিক ১ পয়েন্ট। আগস্টে ছিল ৪৯ দশমিক ৮ পয়েন্ট। অর্থাৎ এক মাস আগে উৎপাদন খাতে সম্প্রসারণের যে আভাস দেখা গিয়েছিল, অক্টোবরে তা আবার সংকোচনের দিকে গেছে।

পিএমআই মূলত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওপর পরিচালিত মাসিক জরিপের ভিত্তিতে তৈরি। এ সূচকের মান শূন্য থেকে ১০০-এর মধ্যে পরিমাপ করা হয়। সূচকের মান ৫০-এর বেশি হলে উৎপাদন কার্যক্রম সম্প্রসারণের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। অন্যদিকে ৫০-এর নিচে থাকলে কার্যক্রম সংকুচিত হচ্ছে বলে বিবেচনা করা হয়। সে হিসাবে অক্টোবরে চীনের উৎপাদন খাত আবার সংকোচনের দিকে চলে গেছে।

উৎপাদন খাতের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উপসূচকেও দুর্বলতা দেখা গেছে গত মাসে। এর মধ্যে নতুন রফতানি আদেশের সূচক সেপ্টেম্বরে ৫০ পয়েন্ট থাকলেও অক্টোবরে কমে ৪৮ দশমিক ৭ পয়েন্টে নেমেছে। একই সময়ে উৎপাদন উপসূচক ৫১ দশমিক ৭ থেকে কমে ৪৯ দশমিক ৮ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ নতুন রফতানি আদেশের পাশাপাশি কারখানার উৎপাদন কার্যক্রমও দুর্বল হয়েছে। বিশেষ করে বিদেশের বাজার থেকে নতুন ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ায় চাপ তৈরি হয়েছে উৎপাদনকারীদের ওপর।

চীনের অভ্যন্তরীণ বাজারেও দীর্ঘদিন ধরে চাহিদার দুর্বলতা রয়েছে বলে উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। দেশটির আবাসন খাতে কয়েক বছর ধরে চলা মন্দা ভোক্তাদের ব্যয় ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রভাব ফেলছে। ফলে স্থানীয় বাজারে পর্যাপ্ত ক্রেতা না পাওয়ায় অনেক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বিদেশের বাজারে পণ্য বিক্রির ওপর নির্ভরতা বাড়িয়েছে। কিন্তু চীনের তুলনায় এসব দেশ থেকে পণ্য আমদানির পরিমাণ কম। ফলে চীনের সঙ্গে এসব দেশের বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে চলেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তি শুল্ক আরোপের পর থেকে চীন ইউরোপ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার বাজারে রফতানি বাড়িয়েছে। ফলে এসব অঞ্চলের গুরুত্ব বেড়েছে দেশটির রফতানি বাণিজ্যে। তবে নতুন বাজারে রফতানি বাড়ানোর এ কৌশলও এখন নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। কারণ চীনা পণ্যের প্রবেশ বাড়ায় এসব অঞ্চলের কয়েকটি দেশও নিজেদের শিল্প খাতের সুরক্ষা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে।

সম্প্রতি চীন সফরে গিয়ে বিষয়টি তুলে ধরেন জার্মানির প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্ক-ভাল্টার স্টেইনমায়ার। বৃহস্পতিবার বেইজিং বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘বিশ্বের অন্য দেশগুলোর ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের অর্থনীতিকে বাইরের ঝুঁকি থেকে সুরক্ষিত রাখতে উদ্যোগ নিয়েছে চীন। এটি স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য। কিন্তু সে উদ্যোগের ফলে অন্য দেশ যেন উল্টো চীনের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে না পড়ে।’

এদিকে কয়েকজন অর্থনীতিবিদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছরের বাকি সময় চীনের রফতানি প্রবৃদ্ধি শক্তিশালী থাকতে পারে। এমনকি ২০২৬ সালে দেশটির সামগ্রিক বাণিজ্য উদ্বৃত্ত গত বছরের রেকর্ড ১ লাখ ২০ হাজার কোটি ডলারকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে রফতানি বাড়লেও অভ্যন্তরীণ চাহিদার দুর্বলতা ও বাণিজ্যিক অংশীদারদের অসন্তোষ চীনের অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকছে।

বিশ্লেষকদের মতে, চীনের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক আগামী দিনগুলোয় যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনারও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে। নভেম্বরের মাঝামাঝি চীনের শেনজেনে এশিয়া-প্যাসিফিক ইকোনমিক কো-অপারেশন (এপেক) সম্মেলনের ফাঁকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে শি জিনপিংয়ের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্ক ও শুল্কসংক্রান্ত বিষয়গুলো আলোচনায় আসতে পারে।