শিক্ষার প্রথম ধাপ প্রাথমিক বিদ্যালয়। এখানেই শিশুর শিক্ষাজীবনের ভিত্তি তৈরি হয়, বিকশিত হয় তার চিন্তা, কল্পনা, সৃজনশীলতা ও সামাজিক বোধ। প্রাথমিক শিক্ষা তাই কেবল বর্ণপরিচয় কিংবা পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান অর্জনের বিষয় নয়; শিশুর শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক বিকাশেরও গুরুত্বপূর্ণ পর্ব। অথচ রাজধানীর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর দিকে তাকালে শিশুদের জন্য একটি উপযুক্ত শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের অবহেলার চিত্রই সামনে আসে। অধিকাংশ বিদ্যালয়ে খেলার মাঠ নেই, অনেক প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক সংকট প্রকট, কোথাও শ্রেণীকক্ষের স্বল্পতা, আবার কোথাও স্যাঁতসেঁতে ও আলো-বাতাসহীন ভবনে চলছে পাঠদান। পর্যাপ্ত টয়লেট ও নিরাপদ পানির মতো মৌলিক সুবিধার ঘাটতিও রয়েছে। এমন পরিবেশে শিশুদের মানসম্মত শিক্ষা ও পূর্ণাঙ্গ বিকাশ কতটা সম্ভব তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। বণিক বার্তার একটি প্রতিবেদনে ঢাকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এ দুরবস্থা উঠে এসেছে।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর ৩৪২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে মাত্র ৯০টিতে খেলার মাঠ রয়েছে। অর্থাৎ ৭৩ দশমিক ৭ শতাংশ বিদ্যালয়েই মাঠ নেই। নগরায়ণ ও জায়গা স্বল্পতার বাস্তবতা থাকলেও শিশুদের জন্য খেলাধুলার জায়গা নিশ্চিত করতে না পারাকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেয়ার সুযোগ নেই। খেলাধুলা শিশুর অবসর বিনোদনের অনুষঙ্গমাত্র নয়; এটি তার শারীরিক সক্ষমতা, মানসিক স্বাস্থ্য, নেতৃত্বের গুণাবলি, দলগত আচরণ ও সামাজিক দক্ষতা বিকাশের অন্যতম মাধ্যম। বিদ্যালয়ে মাঠ না থাকলে এসব বিকাশের স্বাভাবিক সুযোগ সংকুচিত হয়। বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ রাজধানীতে যেসব শিশুর বাড়ির আশপাশেও নিরাপদ খেলার জায়গা নেই, তাদের জন্য বিদ্যালয়ই হতে পারে খেলাধুলা ও সুস্থ বিনোদনের প্রধান অবলম্বন। সেই সুযোগটুকুও না থাকা শিশুদের প্রতি এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক বঞ্চনা।
শিক্ষার পরিবেশের আরেকটি বড় সংকট শিক্ষক স্বল্পতা। কোনো কোনো স্কুলে মাত্র একজন শিক্ষক পড়াচ্ছেন—এমনও তথ্য পাওয়া গেছে। শিক্ষক সংকটের কারণে পাঠদানের পাশাপাশি প্রশাসনিক ও পরীক্ষা-সংক্রান্ত দায়িত্বও অল্পসংখ্যক শিক্ষককে পালন করতে হচ্ছে। ফলে প্রতিটি শিক্ষার্থীর শেখার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ, দুর্বলতা চিহ্নিত করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আলাদা মনোযোগ দেয়ার সুযোগ কমে যাচ্ছে। প্রাথমিক স্তরে যেখানে শিশুর শেখার ভিত্তি তৈরি হওয়ার কথা, সেখানে পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকা ভবিষ্যৎ শিক্ষাজীবনের জন্যও ঝুঁকি তৈরি করছে।
শুধু মাঠ ও শিক্ষক সংকট নয়, বিদ্যালয়ের ভৌত পরিবেশও উদ্বেগজনক। পলাশী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানে আশপাশের উঁচু ভবনের কারণে পর্যাপ্ত সূর্যের আলো প্রবেশ করে না; ভবনের ভেতরে তৈরি হয়েছে স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ। কোনো কোনো বিদ্যালয়ে শ্রেণীকক্ষের স্বল্পতা, অপর্যাপ্ত টয়লেট ও নিরাপদ পানির সংকটও রয়েছে। অথচ একটি শিশুর সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার জন্য পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ, আলো-বাতাসপূর্ণ শ্রেণীকক্ষ এবং স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন অপরিহার্য। এসব সুবিধা নিশ্চিত করা বিলাসিতা নয়, বরং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ন্যূনতম দায়িত্ব। শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ সময় এমন পরিবেশে কাটাতে বাধ্য করা তাদের স্বাস্থ্য ও শেখার সক্ষমতা—উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর।
এসব সীমাবদ্ধতার প্রভাব পড়ছে সরকারি প্রাথমিক শিক্ষার প্রতি অভিভাবকদের আস্থায়। যাদের সামর্থ্য রয়েছে, তাদের অনেকে সন্তানকে কিন্ডারগার্টেন কিংবা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পাঠাচ্ছেন। খেলার মাঠ, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, প্রযুক্তিনির্ভর পাঠদান ও সহশিক্ষা কার্যক্রমের সুযোগকে তারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা হিসেবে দেখছেন। অভিভাবকদের এ প্রত্যাশাকে কেবল সরকারি বিদ্যালয় সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা বলে উড়িয়ে দেয়ার সুযোগ নেই, বরং তাদের উদ্বেগের পেছনে বাস্তব অবকাঠামোগত ও প্রাতিষ্ঠানিক ঘাটতি রয়েছে। সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান নিয়ে শিক্ষকদের প্রতিনিধিদের ভিন্নমত থাকলেও শিক্ষার পরিবেশের সীমাবদ্ধতা অস্বীকার করার উপায় নেই। এর ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নিম্ন আয়ের ও শ্রমজীবী পরিবারের শিশুরা।
আর্থিক সামর্থ্যের অভাবে যাদের বিকল্প শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়ার সুযোগ সীমিত, তাদের অনেককেই অনুপযুক্ত পরিবেশে শিক্ষা গ্রহণ করতে হচ্ছে। অর্থাৎ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দুরবস্থা কেবল একটি শিক্ষা খাতের সমস্যা নয়; এটি শিক্ষায় সমান সুযোগ নিশ্চিত করার সাংবিধানিক ও সামাজিক অঙ্গীকারের সঙ্গেও সম্পর্কিত। রাষ্ট্রীয় বিদ্যালয়ের মান ও পরিবেশ উন্নত না হলে সামর্থ্যবান পরিবারগুলো বিকল্প ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকবে, আর দরিদ্র পরিবারের শিশুরা তুলনামূলক দুর্বল শিক্ষার পরিবেশে আটকে থাকবে। এভাবে প্রাথমিক শিক্ষার মধ্য দিয়েই সামাজিক বৈষম্য আরো গভীর হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে।
রাজধানীর ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় নতুন করে বিদ্যালয়ের জন্য জমি পাওয়া কঠিন—এ বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সমস্যার কার্যকর সমাধান খুঁজতে হবে। যেসব বিদ্যালয়ে নিজস্ব মাঠ নেই, সেগুলোর শিক্ষার্থীদের কাছাকাছি সরকারি খেলার মাঠ, পার্ক কিংবা উন্মুক্ত স্থান নির্দিষ্ট সময় ব্যবহারের সুযোগ দেয়া যেতে পারে। এজন্য স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। বিদ্যালয়ের বিদ্যমান খোলা জায়গা যেন নতুন ভবন বা অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণের মাধ্যমে আরো সংকুচিত না হয় সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ ও স্যাঁতসেঁতে ভবন সংস্কার, শ্রেণীকক্ষের পর্যাপ্ততা, নিরাপদ পানি, স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট এবং আলো-বাতাস প্রবেশের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।
শিক্ষক সংকট নিরসনে বিদ্যালয়ভিত্তিক শিক্ষক চাহিদা নিরূপণ করে দ্রুত নিয়োগ ও পদায়নের ব্যবস্থা করতে হবে। যেসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক সংখ্যা অত্যন্ত কম, সেগুলোকে অগ্রাধিকার দেয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থাকা কিংবা কর্মস্থল ত্যাগ করেও দায়িত্বে বহাল থাকা শিক্ষকদের বিষয়ে প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। তবে শিক্ষক সংকটের দায় কেবল শিক্ষকদের ওপর চাপিয়ে দিলে চলবে না; প্রয়োজনীয় পদ সৃষ্টি, নিয়োগ প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন এবং শিক্ষক পদায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দায়িত্বও প্রশাসনের। পাশাপাশি শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা উন্নয়ন, শ্রেণীকক্ষের পাঠদান পর্যবেক্ষণ এবং শিক্ষার্থীদের শেখার অগ্রগতি মূল্যায়নের কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের উন্নয়নকে কেবল অবকাঠামো নির্মাণ কিংবা পরীক্ষার ফলাফল বৃদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। একটি বিদ্যালয় কতটা শিশুবান্ধব, সেখানে শিক্ষার্থীরা কতটা নিরাপদ, খেলাধুলা ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের সুযোগ কতটা রয়েছে—এসবও শিক্ষার মান নির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হওয়া প্রয়োজন। শিক্ষা বাজেটে এ খাতের জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ, বরাদ্দের কার্যকর ব্যবহার এবং বিদ্যালয়ভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে জোর দিতে হবে। অভিভাবক, শিক্ষক ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীকেও বিদ্যালয়ের পরিবেশ উন্নয়নের প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা যেতে পারে।










