চুল পড়া একটি স্বাভাবিক শারীরিক প্রক্রিয়া। তবে স্বাভাবিকের তুলনায় অতিরিক্ত চুল ঝরে পড়া এবং সে অনুপাতে নতুন চুল না গজালে মাথার বিভিন্ন অংশে চুল পাতলা হয়ে যেতে পারে, এমনকি তৈরি হতে পারে টাকের মতো ফাঁকা জায়গা। চিকিৎসাবিজ্ঞানে চুল পড়ে যাওয়ার এ সমস্যাকে সাধারণভাবে অ্যালোপেসিয়া বলা হয়। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে যেকোনো বয়সের মানুষ এ সমস্যায় আক্রান্ত হতে পারে। এমনকি শিশুদের মধ্যেও অ্যালোপেসিয়া দেখা যায়।

যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান এনএইচএসের তথ্যানুযায়ী, প্রতিদিন গড়ে ৫০-১০০টি চুল পড়া স্বাভাবিক। তবে চুল পড়ার পরিমাণ বেড়ে গেলে এবং নতুন চুল না গজালে তা অ্যালোপেসিয়ার লক্ষণ হতে পারে। এ সমস্যায় কারো মাথার নির্দিষ্ট অংশের চুল পড়ে যায়, আবার কারো ক্ষেত্রে মাথার সব চুল ঝরে যেতে পারে। কখনো ভ্রু, চোখের পাপড়ি ও শরীরের অন্যান্য অংশের লোমও পড়ে যায়।

লক্ষণ

অ্যালোপেসিয়ায় আক্রান্ত হলে চুল পড়ার ধরন ও তীব্রতা একেকজনের ক্ষেত্রে একেক রকম হতে পারে। কারো ক্ষেত্রে হঠাৎ করেই মাথার নির্দিষ্ট স্থানের চুল উঠে গিয়ে গোলাকার ফাঁকা অংশ তৈরি হয়। আবার কারো মাথাজুড়ে চুল পাতলা হতে থাকে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সামনের দিকের চুল দ্রুত কমে যেতে পারে। চিরুনি ব্যবহারের সময় অস্বাভাবিক পরিমাণে চুল পড়া, বিছানা-বালিশে প্রচুর চুল জমে থাকা কিংবা মাথার এক বা একাধিক স্থানে চুল উঠে গিয়ে ত্বক দৃশ্যমান হয়ে পড়াও এ সমস্যার লক্ষণ হতে পারে। বিশেষত অল্প সময়ের মধ্যে মাথার কোনো অংশের চুল উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ঝরে পড়লে বিষয়টিকে অবহেলা করা উচিত নয়। এমন পরিস্থিতিতে চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া প্রয়োজন।

কারণ

বিভিন্ন কারণে চুল পড়তে পারে। কিছু ক্ষেত্রে এটি বংশগত বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সম্পর্কিত, আবার কখনো শারীরিক অসুস্থতা, পুষ্টির ঘাটতি কিংবা মানসিক চাপের কারণে চুল ঝরে পড়ে। দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকা, দ্রুত ওজন কমে যাওয়া, শরীরে আয়রন ও প্রোটিনের ঘাটতি এবং ভিটামিন বি ও ডির অভাব চুল পড়ার অন্যতম কারণ হতে পারে।

এছাড়া মানসিক অবসাদ, অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা, মাথার ত্বকের সমস্যা এবং ক্যান্সারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত কিছু পদ্ধতির কারণেও চুল পড়তে পারে। কভিডসহ কিছু অসুস্থতার পরও সাময়িকভাবে চুল ঝরে যাওয়ার ঘটনা দেখা যায়।

সব ক্ষেত্রে চুল পড়ার নির্দিষ্ট কারণ শনাক্ত করা সম্ভব হয় না। অ্যালোপেসিয়ার কিছু ধরন শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে চুল পড়ার ধরন, আক্রান্ত স্থানের বিস্তৃতি এবং রোগীর শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে কারণ নির্ধারণ করা জরুরি।

চিকিৎসা

অ্যালোপেসিয়ার চিকিৎসা নির্ভর করে চুল পড়ার কারণ ও রোগের ধরনের ওপর। প্রথমেই চুল পড়ার পেছনে কোনো শারীরিক সমস্যা বা পুষ্টির ঘাটতি রয়েছে কিনা, তা শনাক্ত করতে হয়। কারণ অনুযায়ী চিকিৎসা নিলে অনেক ক্ষেত্রে চুল পড়া কমানো সম্ভব হয়। কিছু ক্ষেত্রে পুনরায় চুলও গজাতে পারে।

তবে সব ধরনের অ্যালোপেসিয়ার চিকিৎসা এক নয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে চুল স্বাভাবিকভাবেই আবার গজাতে পারে, আবার কিছু ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। বিশেষ করে চুলের গোড়া স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে পুনরায় চুল গজানো কঠিন হতে পারে। তাই নিজ থেকে ওষুধ বা চুল গজানোর পণ্য ব্যবহার না করে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেয়া উচিত।

মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলে

চুল পড়ার সমস্যা শুধু শারীরিক চেহারায় পরিবর্তন আনে না, অনেকের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও এর প্রভাব পড়ে। চুল পাতলা হয়ে যাওয়া কিংবা মাথায় দৃশ্যমান টাক তৈরি হওয়ায় কেউ কেউ আত্মবিশ্বাসের সংকটে ভোগেন। সামাজিক উপহাস, নেতিবাচক মন্তব্য ও বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কাও মানসিক চাপ বাড়াতে পারে।

বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে চুল পড়ার সমস্যা আত্মপরিচয় ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে উঠতে পারে। তাই অ্যালোপেসিয়ার চিকিৎসায় শারীরিক সমস্যার পাশাপাশি মানসিক সুস্থতার বিষয়টিও গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন।

প্রতিদিন কিছু চুল পড়া স্বাভাবিক। কিন্তু হঠাৎ অতিরিক্ত চুল ঝরে পড়া, মাথার নির্দিষ্ট স্থানে ফাঁকা হয়ে যাওয়া কিংবা ভ্রু ও চোখের পাপড়ির চুল পড়তে শুরু করলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া উচিত। সঠিক সময়ে কারণ শনাক্ত করা গেলে উপযুক্ত চিকিৎসা বেছে নেয়া সহজ হয়।