দখল, দূষণ ও পলি জমে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বন্ধ হওয়ায় ধুঁকছে খুলনার সরকারি তালিকাভুক্ত ৫৭২টি খাল। এতে বছরজুড়ে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। অন্যদিকে খরা মৌসুমে পানি সংকটে চাষাবাদ ব্যাহত হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কৃষক। গতি হারাচ্ছে স্থানীয় কৃষি অর্থনীতিও।
কৃষিসংশ্লিষ্টরা বলছেন, একসময় খুলনায় জালের মতো ছড়িয়ে ছিল ছোট-বড় অসংখ্য খাল। নদ-নদীর সঙ্গে যুক্ত এসব খাল কৃষিজমিতে পানি সরবরাহ ও নিষ্কাশনে ভূমিকা রাখত। কিন্তু পলি জমে, দখল, অপরিকল্পিত স্থাপনা ও মানবসৃষ্ট নানা কারণে অধিকাংশ খাল সংকুচিত হয়ে পড়েছে। কোনো কোনো খাল ও নদী পুরোপুরি ভরাট হয়ে গেছে।
নদ-নদী বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের (আরডিআরসি) গবেষণায় বলা হয়েছে, খুলনা বিভাগে অন্তত ২৫টি নদ-নদী পুরোপুরি শুকিয়ে গেছে অথবা চরম সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছে। গভীর নলকূপ থেকে পানি সংগ্রহ করে কৃষকদের চাষাবাদ করতে হয়। পানি সংকটে খরিপ ও রবি মৌসুমে ধান, পাট ও সবজির উৎপাদন ২০-২৫ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ।
একসময় খাল দিয়ে বিলের পানি নদীতে নামত। এখন নদী খনন করা হলেও অনেক খালের মুখ বন্ধ থাকায় পানি নিষ্কাশন ব্যাহত হচ্ছে। ফলে বর্ষায় কৃষিজমি পানিতে ডুবে থাকে। মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, উজানের মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়া, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তন ও নদীর নাব্যতা হ্রাসের কারণে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততা বাড়ছে। লবণাক্ততা ও জলাবদ্ধতায় দাকোপ, কয়রা ও পাইকগাছার অনেক এলাকায় সবজি চাষ ব্যাহত হচ্ছে। অন্যদিকে মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চিংড়ি, পাবদা, গজাল ও বোয়ালি বা বেলে জাতীয় মাছের প্রাপ্যতা আগের তুলনায় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে।
এর বড় উদাহরণ বিল ডাকাতিয়া। খুলনার ডুমুরিয়া ও ফুলতলা, নগরের খানজাহান আলী ও আড়ংঘাটা এবং যশোরের অভয়নগর, কেশবপুর ও মণিরামপুরের বিস্তীর্ণ এলাকায় অবস্থিত এ বিল একসময় কৃষি ও মৎস্য উৎপাদনের জন্য পরিচিত ছিল। কিন্তু জলাবদ্ধতা ও পানি নিষ্কাশন সমস্যায় এখন দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, তিন যুগ ধরে জলাবদ্ধতায় এ অঞ্চলের কৃষিজীবী মানুষ অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ১৯৯০ সালের পর থেকে জলাবদ্ধতা নিরসন ও কৃষি-মৎস্য উৎপাদন বাড়াতে বিভিন্ন সংস্থা কোটি কোটি টাকার প্রকল্প নিলেও স্থায়ী সমাধান হয়নি।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা যায়, ১৯৯২-৯৩ সালে ২২৯ কোটি টাকা ব্যয়ে খুলনা-যশোর পানি নিষ্কাশন পুনর্বাসন প্রকল্প (কেজেডিআরপি) বাস্তবায়ন করা হয়। এ সময় ডুমুরিয়ার শলুয়া স্লুইসগেট থেকে কৈয়ার শোলমারী পর্যন্ত নদী খনন এবং শলুয়া থেকে বিল ডাকাতিয়ার মাঝখান দিয়ে ফুলতলার জামিরা পর্যন্ত ৮০ ফুট চওড়া খাল খনন করা হয়। এতে পানি নিষ্কাশন কিছুটা স্বাভাবিক হয়। কয়েক বছর জলাবদ্ধতাও ছিল না। তবে সাম্প্রতিক সময়ে শোলমারী ও ভদ্রা নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় বিলের পানি নামতে পারছে না।
বিলের কৃষ্ণনগর এলাকার বাসিন্দা বিনয় মণ্ডল বলেন, ‘একসময় বিল ডাকাতিয়ার ৫৫ শতাংশ পরিবার ছিল কৃষিজীবী। এ বিলই ছিল মানুষের উপার্জনের আধার। প্রচুর ধান, সবজি ও মাছ উৎপাদন হতো। এখন জলাবদ্ধতা ও পানি নিষ্কাশন সমস্যায় বিলটি দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কৃষি ও প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষায় দখলদার উচ্ছেদ, খালের শ্রেণী পরিবর্তন বন্ধ, বৈজ্ঞানিকভাবে ড্রেজিং, পুরনো পোল্ডার প্রকল্প পুনর্মূল্যায়ন এবং জোয়ার-ভাটার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পানি ব্যবস্থাপনা জরুরি।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের খুলনা দপ্তরের কৃষি প্রকৌশলী দীপঙ্কর চন্দ্র বালা বলেন, ‘নদী-খালের অবাধ পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করা জরুরি। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন ও লবণাক্ততা বড় বিপর্যয় ডেকে আনছে। খালগুলো খনন করা হলে কৃষি, মৎস্য ও পরিবেশে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব পড়বে।’
২০২৪ সালের জুলাইয়ে খুলনা অঞ্চলের কৃষকদের সেচ সুবিধা নিশ্চিত ও ফসলি জমির সমস্যা চিহ্নিত করতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) বিশেষ জরিপ চালায়। খুলনা কৃষি অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক মোহন কুমার ঘোষের নেতৃত্বে একটি দল জরিপ ও অনুসন্ধানের মাধ্যমে তালিকাটি প্রস্তুত করে। জরিপ অনুযায়ী, খুলনা জেলায় সরকারি তালিকাভুক্ত খালের সংখ্যা ৫৭২। এর মধ্যে ৪৪টি খাল ইজারা থাকায় কৃষিজমিতে সেচ বিঘ্নিত হচ্ছে। সব মিলিয়ে জেলার ৫২২টি খাল ভরাট হয়ে গেছে। এসব খালের মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ২ হাজার ২০০ কিলোমিটার।
এছাড়া কয়রায় ২০ একরের নিচে ৯৯টি জলমহাল রয়েছে। এর মধ্যে চারটি খাল সম্পূর্ণ ভরাট হয়ে গেছে। ১৭টির নাব্যতা না থাকায় ইজারা না দিয়ে খাস আদায় করা হচ্ছে। মামলার কারণে ১২টির ইজারা বন্ধ এবং তিনটি খালের ইজারা স্থগিত রয়েছে।
দীপঙ্কর চন্দ্র বালা বলেন, ‘বিগত সময়ে খুলনার ৬০টির মতো খাল খনন করা হয়েছে। আগামী শুকনো মৌসুমে ১৬টি খাল খননের জন্য প্রস্তাব পাঠিয়েছে ত্রাণ ও পুনর্বাসন অধিদপ্তর। এজন্য যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়াও শুরু করেছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো।’
খুলনা জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. আব্দুল করিম বলেন, ‘এরই মধ্যে খুলনায় ১৬টি খালের সম্ভাব্য তালিকা করা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ফুলতলার সায়েলের খাল ও দফাদার খাল, দাকোপের আনন্দনগর খাল, রূপসার শিয়ালী আঠারোবেঁকী নদী থেকে চাঁদপুর পর্যন্ত খাল, বটিয়াঘাটার কাটিয়ানাংলা, কয়রার বামিয়া মাথাভাঙা ও আগরগারিয়া, দিঘলিয়ার মাথাভাঙা এবং ডুমুরিয়ার রূপরামপুর মাড়ুয়া-আমভিটা পর্যন্ত খাল ও ক্ষুদের খাল।’










