যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে নতুন করে সামরিক হামলার আশঙ্কায় মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে। সম্ভাব্য হামলা ও ইরানের পাল্টা আক্রমণের জন্য আঞ্চলিক মিত্রদের প্রস্তুত থাকতে বলেছে ওয়াশিংটন। বিশেষ করে জ্বালানি স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় হামলার ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে সম্ভাব্য সংঘাতের অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত প্রভাব মোকাবেলায় প্রস্তুতি নিচ্ছে এশিয়ার বিভিন্ন দেশ। থাইল্যান্ড জরুরি নিরাপত্তা পরিকল্পনা পর্যালোচনার উদ্যোগ নিয়েছে। অন্যদিকে ফিলিপাইন, জাপানসহ কয়েকটি দেশ জ্বালানি মজুদ ও সরবরাহ নিরাপত্তা জোরদারে কাজ করছে। হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু করেছে দক্ষিণ কোরিয়াও।

জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে বড় ধরনের সংঘাত শুরু হলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল ও এলএনজির মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি সরবরাহ ও পরিবহন ব্যবস্থা আরো বড় আকারে ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। আমদানিনির্ভর দেশ হিসেবে বাংলাদেশেরও এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় কৌশলগত প্রস্তুতি নেয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে জ্বালানির বিকল্প উৎস আরো বাড়ানো, জ্বালানি সংগ্রহ, জরুরি মজুদ ব্যবস্থাপনা ও সম্ভাব্য মূল্যবৃদ্ধির আর্থিক চাপ মোকাবেলায় এখন থেকেই সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তারা।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন আজ। বার্তা সংস্থা এপি এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ ও আঞ্চলিক মিত্রকে জানিয়েছেন, আগামী নির্বাচনের পর ইরানের বিরুদ্ধে নতুন সামরিক অভিযান শুরু হতে পারে। একই সঙ্গে ইরান ও তার মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সম্ভাব্য পাল্টা হামলার জন্য সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।

মার্কিন কর্মকর্তারা আঞ্চলিক মিত্রদের জানিয়েছেন, নতুন অভিযান কয়েক দিন স্থায়ী হতে পারে। যদিও ইরান ও তার সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর পাল্টা আক্রমণের কারণে সংঘাত আরো দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি উৎপাদন ও সরবরাহ স্থাপনা, বিমানবন্দর এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হামলার লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি জোরদার করেছে। এপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, অক্টোবরের শেষদিকে বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস থিওডোর রুজভেল্ট, মেরিন সেনাসহ একাধিক উভচর যুদ্ধজাহাজ পারস্য উপসাগর অভিমুখে পাঠানো হয়েছে। এসব জাহাজে প্রায় নয় হাজার সেনাসদস্য রয়েছেন। এ মোতায়েনের ফলে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নৌ ও মেরিন সদস্যের সংখ্যা ২০ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে।

সম্ভাব্য এ সংঘাতের প্রভাব মোকাবেলায় থাইল্যান্ডের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ (এনএসসি) জরুরি প্রস্তুতি নিচ্ছে। দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের মহাসচিব জেনারেল চাইয়াপ্রুয়েক দুয়াংপ্রাফাত জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন সংঘাত শুরু হলে জ্বালানি সরবরাহ, অর্থনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তায় কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে, তা পর্যালোচনা করছে সরকার। সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবেলায় সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা ও বিশেষজ্ঞদের নিয়ে বৈঠকের পরিকল্পনা রয়েছে। আগামীকাল এ বৈঠক হতে পারে।

থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী অনুতিন চার্নভিরাকুল জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদকে আগাম প্রস্তুতির প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করার নির্দেশ দিয়েছেন। সম্ভাব্য সংকটের মাত্রা অনুযায়ী সরকারি সংস্থাগুলোর করণীয় নির্ধারণ করা হচ্ছে। থাইল্যান্ডের প্রস্তুতিতে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে জ্বালানি নিরাপত্তা। এর আগে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের সময় তৈরি করা জরুরি জ্বালানি মজুদ ও সরবরাহ পরিকল্পনা নতুন পরিস্থিতির আলোকে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত থাই নাগরিকদের নিরাপদে দেশে ফেরানোর প্রস্তুতি রাখা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট দূতাবাসগুলোকে পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। প্রয়োজনে সামরিক বাহিনীর সহায়তায় নাগরিকদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়া হবে। জ্বালানি ও নাগরিক নিরাপত্তার পাশাপাশি সাইবার হামলার আশঙ্কাও বিবেচনায় নিয়েছে থাইল্যান্ড। দেশটির ডিজিটাল ইকোনমি অ্যান্ড সোসাইটি মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল অবকাঠামো সুরক্ষায় প্রস্তুতি নিচ্ছে।

নতুন করে আবার সংঘাত আরো বেশি ছড়ালে বাংলাদেশেও এমন ব্যবস্থা নেয়া উচিত বলে মনে করেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা; বিশেষ করে সংকট আরো বেড়ে গেলে বিকল্প অপশনগুলো কীভাবে এবং কত দ্রুত চালু করা যায় সেই পরিস্থিতি তৈরি করা।

এ বিষয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক বদরুল ইমাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে আবারো বড় কোনো সংঘাত শুরু হলে কৌশলগত মজুদ কাঠামো গড়ে তোলার সুযোগ রাখা যেতে পারে; বিশেষ করে জ্বালানি পণ্য আমদানির বহুমুখী উৎস তৈরি করা। যাতে কোনো একটা জায়গায় সরবরাহ সংকট দেখা দিলে বকল্প অপশনগুলো সঙ্গে সঙ্গে চালু করা যেতে পারে। আমাদের আবার মজুদ অবকাঠামোও ওই অর্থে নেই। এ কারণে খুব বেশি সুযোগ আমরা নিতে পারব এটাও বলা যাবে না। তবে সংকট মোকাবেলায় প্রস্তুতি থাকতে হবে।’

এরই মধ্যে আমদানির বিকল্প উৎস নিশ্চিত করা ও দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো উন্নয়নে জোর দিচ্ছে বাংলাদেশ। নভেম্বরের জন্য প্রয়োজনীয় নয়টি এলএনজি কার্গোর ব্যবস্থা করার কথা জানিয়েছে পেট্রোবাংলা। এর মধ্যে ছয়টি দীর্ঘমেয়াদি ও তিনটি স্বল্পমেয়াদি চুক্তির আওতায় আসার কথা। তবে সংঘাত নতুন করে তীব্র হলে পরবর্তী মাসগুলোয় এলএনজি ও জ্বালানি তেলের আমদানি ব্যয় এবং সরবরাহে চাপ তৈরি হতে পারে বলে মনে করেন তারা।

lead-inside.jpg

জ্বালানি আমদানির উৎস বহুমুখী করতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগও বাড়িয়েছে সরকার। গত ২৮ জুলাই মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ সময় বাংলাদেশের গ্যাস সংকট মোকাবেলায় দেশটির রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান পেট্রোনাসের মাধ্যমে এলএনজি সরবরাহের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়। অন্যদিকে গত ২০ অক্টোবর আলজেরিয়া সফরে দেশটির প্রধানমন্ত্রী সিফি ঘরিয়েবের সঙ্গে বৈঠক করেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। সফরে এলএনজি, এলপিজি, অন্যান্য পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানিসহ জ্বালানি খাতে সহযোগিতার সমঝোতা বিষয়ে একটি স্মারক সই হয়।

কাতারের সঙ্গেও নতুন দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি সরবরাহ চুক্তির বিষয়ে আলোচনা চালাচ্ছে বাংলাদেশ। গত ১১ অক্টোবর সৌদি আরবে কাতারএনার্জির প্রধান নির্বাহী সাদ বিন শেরিদা আল-কাবির সঙ্গে বৈঠক করেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। বৈঠকে নতুন সরবরাহ চুক্তি ও বিকল্প উৎস থেকে এলএনজি সংগ্রহের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়।

দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অবকাঠামো সম্প্রসারণ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। গত ২৭ অক্টোবর জাপান সফরে দেশটির প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে বৈঠকে জ্বালানি সহযোগিতার বিষয়টি আলোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সফরে তিনি জাপানের জেরা কোম্পানির স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল পরিদর্শন করেন।

মাতারবাড়ীতে দৈনিক ১০০ কোটি ঘনফুট সক্ষমতার স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে জেরার। পাশাপাশি বাংলাদেশে দীর্ঘ ও স্বল্পমেয়াদে এলএনজি সরবরাহ বাড়ানোর ক্ষেত্রে আগ্রহী জাপানি প্রতিষ্ঠানটি।

এরই মধ্যে সরকার বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে জ্বালানি আমদানি কমাতে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতে জোর দিয়েছে। আগামী গ্রীষ্মে যাতে দেশের মানুষের কষ্ট না হয় সেজন্য তিন-চার হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়েছে সরকার। পাশাপাশি দেশের সৌরবিদ্যুতের ব্যাপক হারে ব্যবহার বাড়াতে আজ রাজধানীতে সোলার এক্সপো ২০২৬ উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে বড় কোনো সংঘাত আবার শুরু হলে পুরো বিশ্ব জ্বালানি ঝুঁকিতে পড়বে। তখন সবাই জ্বালানি কিনতে তীব্র প্রতিযোগিতা শুরু করবে। জ্বালানি কেনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য একই পরিস্থিতি তৈরি হবে। সেক্ষেত্রে কৌশলগত পদক্ষেপ নিতে হবে বলে মনে করেন জ্বালানি বিশ্লেষকরা।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস (আইইইএফএ) বাংলাদেশের প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে পরিস্থিতি যদি হঠাৎ আরো খারাপ হয়, তাহলে বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য প্রতিযোগিতা করে জ্বালানি কেনার মতো সক্ষমতা কমে যাবে। খারাপ পরিস্থিতি হলে আমরা হয়তো কিনতে পারব, কিন্তু আমাদের যে আর্থিক সক্ষমতা সেটি হয়তো আরো কমে যাবে। অন্যদিকে জ্বালানি কিনে মজুদ করার মতো পরিস্থিতিও আমাদের নেই। তবে কিছুটা স্বস্তির জায়গা হলো আসন্ন শীত মৌসুম বিদ্যুতের চাহিদা অনেকটাই কমে যাবে, সেক্ষেত্রে জ্বালানি চাহিদাও কম হবে। বর্ধিত মূল্যে জ্বালানি আমদানির কিছুটা লাগাম টানা যাবে, তবে সংকট দীর্ঘায়িত হলে আগামী গ্রীষ্মে তার প্রভাব পড়বে। এক্ষেত্রে নবায়নযোগ্য জ্বালানি কিছুটা সহায়তা করতে পারে, যদি সরকার তার লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী কাজ এগিয়ে নিতে পারে।’

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে আবারো বৈশ্বিক সংকট তৈরি হতে পারে। বাংলাদেশের মতো অর্থনীতির জন্য এর অভিঘাত সামাল দেয়া অত্যন্ত কঠিন বলে মনে করেন বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘যেকোনো সংকট মোকাবেলায় সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন জাতীয় ঐক্য ও সমন্বিত প্রস্তুতি। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও সমন্বয় থাকতে হবে, যাতে সবাই সংকট মোকাবেলায় মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকতে পারে। তবে সরকার এসব বিষয় কতটা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছে, তা নিয়ে আমি সন্দিহান।’

তিনি আরো বলেন, ‘অর্থনীতির ভারসাম্য ধরে রাখতে এ মুহূর্তে সবচেয়ে সংবেদনশীল পণ্য হচ্ছে জ্বালানি তেল। তেলসহ প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানিতে বিপুল পরিমাণ ডলারের প্রয়োজন হয়। আর বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম উৎস বস্ত্র ও তৈরি পোশাক খাত। অথচ এ খাতগুলোও এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। এমন পরিস্থিতি সামাল দেয়ার মতো পর্যাপ্ত প্রস্তুতি আমাদের নেই। নতুন করে বৈশ্বিক সংকট তৈরি হলে সরকার কীভাবে তা মোকাবেলা করবে, সেটি এখনই ভাবতে হবে। দেশে এমনিতেই মূল্যস্ফীতি বেশি, বেকারত্ব বাড়ছে এবং নতুন বিনিয়োগ আসছে না। এ অবস্থায় বিদ্যমান শিল্প ও বিনিয়োগ কীভাবে সচল রাখা যায় এবং সেগুলোকে সম্ভাব্য সংকটের ক্ষতি থেকে সুরক্ষা দেয়া যায়, সেদিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। এজন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের উদ্যোগ সরকারকে নিতে হবে। ভবিষ্যতের বড় ধরনের অর্থনৈতিক ঝুঁকি মোকাবেলায় এখন থেকেই প্রস্তুতি জোরদার করা জরুরি।’

এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের কারণে জ্বালানি সরবরাহে দীর্ঘমেয়াদি বিঘ্নের আশঙ্কায় তেল মজুদ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে ফিলিপাইনও। দেশটির জ্বালানিমন্ত্রী শ্যারন গারিনের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, সৌদি আরব, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, অস্ট্রেলিয়াসহ কয়েকটি দেশের সঙ্গে জ্বালানি তেল সংরক্ষণ ও সরবরাহ নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা চলছে।

দেশটির জ্বালানিমন্ত্রীর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ৫৫ দিনের চাহিদার সমপরিমাণ জ্বালানি মজুদ রয়েছে। এ সক্ষমতা আরো উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি বাতান এলাকায় সরকারি জ্বালানি তেল সংরক্ষণাগার স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।

জাপানও এশিয়ার জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়াচ্ছে। অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নয়টি দেশ জরুরি জ্বালানি তেল মজুদ এবং সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী করার বিষয়ে যৌথ উদ্যোগ নিয়েছে টোকিও। এর আওতায় জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে জ্বালানি তেল সংরক্ষণের সক্ষমতা বৃদ্ধি, জরুরি পরিস্থিতিতে পারস্পরিক সহযোগিতা এবং জ্বালানির বিকল্প উৎস সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও কম্বোডিয়াও জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় সরবরাহ ব্যবস্থাপনা ও সাশ্রয়মূলক পদক্ষেপ নিয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি তেল ও গ্যাস আমদানির ওপর নির্ভরশীল অর্থনীতিগুলোর জন্য সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে—এমন আশঙ্কায় আসিয়ানভুক্ত দেশগুলো জরুরি জ্বালানি সরবরাহ, মজুদ ব্যবস্থাপনা ও আঞ্চলিক বিদ্যুৎ সংযোগের মতো বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিচ্ছে। গত মাসে ফিলিপাইনের ম্যানিলায় অনুষ্ঠিত আসিয়ানের জ্বালানিমন্ত্রীদের বৈঠকে জ্বালানি সংকটে সদস্যদেশগুলোর পারস্পরিক সহায়তার জন্য আসিয়ান পেট্রোলিয়াম সিকিউরিটি এগ্রিমেন্ট (এপিএসএ) কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়। এ চুক্তির আওতায় কোনো সদস্যদেশে তেলের সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিলে অন্য দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে জরুরি সহায়তা দেয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। গত ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত ১১ সদস্যের মধ্যে ছয়টি দেশ চুক্তিটি অনুমোদন করেছে। চলতি মাসে আসিয়ান সম্মেলনের আগেই বাকি দেশগুলোর অনুমোদন সম্পন্ন করার লক্ষ্য রয়েছে।

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি। পারস্য উপসাগরের জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আন্তর্জাতিক বাজারে পরিবহনের ক্ষেত্রে এ পথের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। বিশেষ করে এশিয়ার দেশগুলো জ্বালানি পরিবহনে এ পথের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক অনলাইন আর্থিক লেনদেন ও ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান কেসিএম ট্রেডের প্রধান বাজার বিশ্লেষক টিম ওয়াটারারের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানকে ঘিরে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আবার বাড়তে পারে। বিশেষ করে সংঘাতের আশঙ্কা তীব্র হলে ব্রেন্টের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলারের বেশি উঠতে পারে।