বিজ্ঞান অনুষদ কর্তৃক আয়োজিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় র‍্যাংকিং বিষয়ক কর্মশালা ২০২৬-এ সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের পক্ষ থেকে উপস্থিত হতে পেরে আমি অত্যন্ত আনন্দিত ও সম্মানিত বোধ করছি। এ সময়োপযোগী ও প্রাতিষ্ঠানিক আয়োজনের জন্য আয়োজকদের সাধুবাদ জানাই।

আমরা এমন একটি সময়ে এখানে সমবেত হয়েছি যখন বৈশ্বিক উচ্চ শিক্ষার মানচিত্র দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। আজ আমরা কেবল একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক উন্নয়ন বা কয়েকটা পরিসংখ্যানমূলক ডেটাবেজ নিয়ে কথা বলতে আসিনি; বরং আমরা এসেছি একটি শতাব্দীর ঐতিহ্যবাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ভবিষ্যৎ, তার জ্ঞানের পরিচিতি এবং বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে তার অবস্থানকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করতে।

এক. দর্শনের মুখোমুখি বিশ্ববিদ্যালয়: অন্টলজিক্যাল ও এপিস্টেমলজিক্যাল প্রশ্ন

সম্মানিত সুধী, বিশ্ব র‍্যাংকিং নিয়ে আলোচনার আগে আমাদের নিজেদের কাছে দুটি মৌলিক দার্শনিক প্রশ্ন উত্থাপন করতে হবে, যা ছাড়া যেকোনো র‍্যাংকিং-কেন্দ্রিক প্রচেষ্টা হবে নিছক যান্ত্রিক ও বাহ্যিক।

প্রথমটি হলো অন্টলজিক্যাল বা সত্তাগত প্রশ্ন: বিশ্ববিদ্যালয়ের মৌলিক ‘সত্তা’ বা ‘বিয়িং’ কী? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্টলজিক্যাল পরিচয় কী? আমরা কি কেবল একটি প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো, যা স্কোপাস বা ওয়েব অব সায়েন্সে নিবন্ধিত কতিপয় ইনডেক্স দ্বারা সংজ্ঞায়িত হবে? নাকি আমাদের সত্তা প্রোথিত রয়েছে ১৯২১ সাল থেকে শুরু করে এ ভূখণ্ডের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তির ইতিহাসের গভীরে?

গ্লোবাল সাউথের একটি শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে আমাদের মনে রাখতে হবে—পশ্চিমা বা বাজারভিত্তিক যেসব মেট্রিকস নির্ধারিত হয়, তা প্রায়ই একটি নির্দিষ্ট বৈশ্বিক পুঁজি ও বাণিজ্যিক শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতিফলন। তাই আমাদের অন্টলজিক্যাল চ্যালেঞ্জ হলো আমরা কীভাবে আমাদের ঐতিহাসিক ও সামাজিক দায়িত্ববোধ অক্ষুণ্ন রেখে একটি বৈশ্বিক সমাদৃত উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হতে পারি।

দ্বিতীয়টি হলো এপিস্টেমলজিক্যাল বা জ্ঞানতাত্ত্বিক প্রশ্ন: আমরা ঠিক কেমন জ্ঞান উৎপাদন করছি এবং এ জ্ঞান কার কল্যাণে ব্যবহৃত হচ্ছে? আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিং এজেন্সিগুলো মূলত ‘সাইটেশন ইকোনমি’ বা উদ্ধৃতিভিত্তিক জ্ঞান উৎপাদনকে প্রাধান্য দেয়। কিন্তু জ্ঞান কি কেবল সাইটেশনের সংখ্যায় সীমাবদ্ধ? সামাজিক বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, গবেষণার সবচেয়ে বড় মানদণ্ড হলো তার ‘সামাজিক প্রাসঙ্গিকতা’ এবং ‘রূপান্তরকারী ক্ষমতা’।

যদি আমাদের উৎপাদিত জ্ঞান দেশের চরম দারিদ্র্য, বৈষম্য, জলবায়ু পরিবর্তন বা জলবায়ু-শরণার্থীদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন করতে না পারে, তবে হাজার সাইটেশন থাকলেও সেই জ্ঞানের এপিস্টেমলজিক্যাল মূল্য কতটুকু? আবার অন্যদিকে আমরা যদি বিশ্বমানের একাডেমিক মানদণ্ড মেনে আন্তর্জাতিক জার্নালে নিজেদের কাজ প্রকাশ না করি, তবে আমাদের সামাজিক বাস্তবতার কথা বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে পৌঁছবে কীভাবে?

সুতরাং আমাদের কৌশল হবে এমন এক জ্ঞানতত্ত্ব চর্চা করা, যা একই সঙ্গে বিশ্বমানের একাডেমিক নিখুঁততা বজায় রাখবে এবং স্থানীয় সমস্যার কার্যকরী সমাধান প্রদান করবে।

দুই. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের র‍্যাংকিং সংকট: বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ

আজকের মূল প্রবন্ধ উপস্থাপকের আলোচনায় উঠে আসবে কীভাবে মেট্রিকসগুলোর কারণে আমরা আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিংয়ে কাঙ্ক্ষিত জায়গায় পৌঁছতে পারছি না। যদি আমরা ঠাণ্ডা মাথায় আমাদের সীমাবদ্ধতাগুলো বস্তুনিষ্ঠভাবে মূল্যায়ন করি, তবে কয়েকটি প্রধান সমস্যা দৃশ্যমান হয়:

তথ্য অবিন্যস্ততা ও ডিজিটাল ফুটপ্রিন্টের অভাব: আমাদের শিক্ষকরা নিয়মিত উচ্চ মানের গবেষণা করছেন। কিন্তু সেগুলোর সিংহভাগ আন্তর্জাতিক ডেটাবেজে সঠিকভাবে সুবিন্যস্ত নয়। অনেক সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক নাম (ইনস্টিটিউশনাল অ্যাফিলিয়েশন) সঠিকভাবে না লেখার কারণে স্কোপাস বা ওয়েব অব সায়েন্সে আমাদের ক্রেডিট হাতছাড়া হয়ে যায়।

আন্তর্জাতিকায়ন ও বৈচিত্র্যের ঘাটতি: বৈশ্বিক র‍্যাংকিংয়ে আন্তর্জাতিক শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর অনুপাত একটি বড় সূচক। আমাদের ক্যাম্পাসে বৈশ্বিক বৈচিত্র্য আশানুরূপ নয়, যা আমাদের সার্বিক স্কোর কমিয়ে দেয়।

শিল্প ও প্রাতিষ্ঠানিক সংযোগ: উচ্চ শিক্ষার গবেষণা কেবল ল্যাবরেটরি বা সেমিনার কক্ষে আবদ্ধ থাকলে চলবে না। ইন্ডাস্ট্রি এবং নীতিনির্ধারণী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আমাদের যৌথ গবেষণার হার এখনো অপ্রতুল।

অনুষদভিত্তিক বৈষম্যমূলক সূচক ব্যবস্থা: সাধারণত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির গবেষণার ক্ষেত্রে সাইটেশন দ্রুত বাড়ে। কিন্তু সামাজিক বিজ্ঞান ও মানবিক বিদ্যার গবেষণাগুলো দীর্ঘমেয়াদি এবং বই বা মনোগ্রাফ আকারে প্রকাশিত হয়, যা প্রচলিত র‍্যাংকিং সূচকে সঠিক মূল্যায়ন পায় না।

তিন. উত্তরণের পথ: শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য রূপরেখা

সম্মানিত সহকর্মীরা, এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের দায়িত্ব কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের একার নয়; এটি শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর একটি যৌথ যাত্রা।

শিক্ষকমণ্ডলীর প্রতি আহ্বান ও করণীয়: ১. গবেষণার মান ও সাইটেশন বৃদ্ধি: আমাদের কেবল ‘প্রকাশনার সংখ্যা’ বাড়ানোর প্রবণতা থেকে বেরিয়ে এসে ‘উচ্চ মানের ও ইমপ্যাক্ট-ফ্যাক্টর সমৃদ্ধ’ গবেষণায় নজর দিতে হবে ২. ডিজিটাল প্রাতিষ্ঠানিকতা: প্রতি শিক্ষককে নিশ্চিত করতে হবে যে তার গুগল স্কলার, রিসার্চগেট, ওপেন রিসার্চার অ্যান্ড কন্ট্রিবিউটর আইডি (অরসিড) এবং স্কোপাস প্রোফাইল সঠিকভাবে হালনাগাদ করা আছে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডোমেইনের সঙ্গে সংযুক্ত রয়েছে ৩. ইন্টারডিসিপ্লিনারি ও গ্লোবাল নেটওয়ার্কিং: বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের যৌথ গবেষণায় এগিয়ে আসতে হবে। যেমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) বা জলবায়ু পরিবর্তনের মতো প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের ইস্যুগুলোর সঙ্গে এর সামাজিক, নৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব স্টাডি করার জন্য আন্তঃঅনুষদীয় গবেষণা প্রকল্প গড়ে তোলা সময়ের দাবি।

শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ ও মানসিকতার পরিবর্তন: ১. গবেষণামুখী উচ্চ শিক্ষা: আমাদের মাস্টার্স ও পিএইচডি পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের কেবল পরীক্ষা ও চাকরির জন্য তৈরি না করে প্রথম দিন থেকেই আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা নিবন্ধ লেখার প্রশিক্ষণ দিতে হবে ২. গবেষণা সহকারী কাঠামোর প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ: মেধাবী শিক্ষার্থীদের শিক্ষক-গবেষকদের প্রকল্পে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত করতে হবে, যাতে তারা আন্তর্জাতিক প্রকাশনার সহ-লেখক (কো-অথর) হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে ৩. গবেষণার প্রাতিষ্ঠানিক ডিজিটাল ডেটাবেজ: শিক্ষার্থীদের সেরা থিসিস ও ডেটাসেট প্রাতিষ্ঠানিক আর্কাইভে উন্মুক্ত ও ডিজিটাল ফ্রন্ট-এন্ডে রাখতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয় হলো একটি জাতির বাতিঘর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কোনো আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিং এজেন্সির ব্যবসার হাতিয়ার বা মেট্রিকসের দাস হতে পারে না; আবার একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে রাখার সুযোগও নেই।

আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত স্পষ্ট হতে হবে: Local Grounding with Global Excellence—অর্থাৎ, শেকড় থাকবে আমাদের মাটিতে, আর আমাদের জ্ঞানের প্রসার ও মান হবে বৈশ্বিক।

আসুন, এ কর্মশালাকে আমরা কেবল কিছু ডেটা ফরম পূরণের কৌশল হিসেবে না দেখে, একটি সামগ্রিক প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্জাগরণের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে গ্রহণ করি। আমরা যেন আমাদের পাঠদান, প্রকাশনা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতিকে এমন এক উচ্চতায় উন্নীত করি, যাতে বৈশ্বিক র‍্যাংকিং স্বয়ং আমাদের অনুসরণ করে—আমাদের যেন র‍্যাংকিংয়ের পেছনে অন্ধভাবে দৌড়াতে না হয়।

বিজ্ঞান অনুষদের ডিন মহোদয়কে এ সুন্দর ও সময়োপযোগী আয়োজনের জন্য আবারো ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান: ডিন, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

[ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিজ্ঞান অনুষদ কর্তৃক আয়োজিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় র‍্যাংকিং বিষয়ক কর্মশালায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য]