চলতি বছরের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে, যার মধ্যে ছেলেদের হার বেশি। তথ্য বলছে, পরীক্ষায় অংশ নেয়া মোট শিক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছেন কেবল ৪৭ দশমিক ১৪ শতাংশ। অর্থাৎ অর্ধেকের বেশি ছেলে পাস করেননি। তবে এ চিত্র কেবল এবারের ফলাফলের নয়। গত বছরও ছেলেদের পাসের হার ছিল ৫৪ দশমিক ৬০ শতাংশ। এ পরিস্থিতি মূলত শিক্ষাজীবন থেকে কিশোর-তরুণদের মনোযোগ বিচ্যুতিরই একটি চিত্র। এটি উদ্বেগজনক সামাজিক বাস্তবতাও বটে। তবে এ মনোযোগহীনতার দায় কারো ওপর এককভাবে চাপানো যায় না।
শিশুর জন্ম থেকে বেড়ে ওঠার বিভিন্ন পর্যায়ে, ধাপে ধাপে বহু প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি এর সঙ্গে যোগ হয়। পরিবার থেকে শুরু করে সাধারণ বা ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সহপাঠী, খেলার সাথী, বন্ধু-বান্ধব, পারিপার্শ্বিক পরিবেশ সবই শিশুর বেড়ে ওঠা এবং চরিত্র গঠনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে, যাকে বলে সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়া। তাই কোনো এক ক্ষেত্রে যদি সুষ্ঠু সামাজিকীকরণে ঘাটতি তৈরি হয় তাহলে তার প্রভাব পড়ে মনোজগতে, বাহ্যিক আচরণেও। মূল্যবোধ, দায়িত্ববোধ ও সামাজিক আচরণে একধরনের বিচ্যুতি ঘটতে পারে। ফলে কিশোরদের যখন বড় একটি অংশ পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয় তখন উদ্বেগ কেবল ‘পরীক্ষায় খারাপ ফলাফল করেছে’-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। কিশোরদের মানসিক ও সামাজিক পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বিগ্ন হতে হয়। এক্ষেত্রে সামাজিকীকরণের প্রতিষ্ঠান, বিশেষত পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক পরিবেশের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
করোনাকালে দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকা, অনলাইন শিক্ষার ওপর নির্ভরতা, সংক্ষিপ্ত সিলেবাস ও অটোপাসের সংস্কৃতি শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পড়াশোনার অভ্যাসে ব্যাঘাত ঘটিয়েছে। সৃজনশীল পদ্ধতিতে অতিরিক্ত নম্বর দেয়া বা ওভারমার্কিংয়ের কারণে না পড়েও ভালো ফল করার প্রবণতা তৈরি হয়েছিল বলেও শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের পর্যবেক্ষণ। এর সঙ্গে শ্রেণীকক্ষে নিয়মিত পাঠদান না হওয়া, কোচিং-নির্ভরতা এবং শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম শিক্ষার মানকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে জ্ঞান অর্জনের পরিবর্তে পরীক্ষায় পাস করার প্রবণতা জোরালো হয়েছে। কিন্তু সেই প্রবণতাও যে তাদের পড়ালেখায় আগ্রহী করে তুলছে না, তার প্রমাণ হলো পরীক্ষার ফলাফল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কিশোররা শিক্ষাকে অগুরুত্বপূর্ণ মনে করছে এবং পড়ালেখার সময়টাকে অন্যভাবে অতিবাহিত করছে। তারা মাদকাসক্তি, কিশোর গ্যাং, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অনিয়ন্ত্রিত সম্পৃক্ততা এবং মুঠোফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহারে জড়িয়ে পড়ছে বলে ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে। এসব প্রবণতা তাদের পড়াশোনার প্রতি মনোযোগ কমানোর পাশাপাশি সুস্থ সামাজিক সম্পর্ক ও দায়িত্ববোধ গঠনের পথেও বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক চর্চা ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের সুযোগ না থাকাও পরিস্থিতিকে জটিল করছে। সব মিলিয়ে কিশোরদের মধ্যে শৃঙ্খলা, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও পড়াশোনার প্রতি দায়িত্ববোধ দুর্বল হয়ে পড়ছে। ফলে তাদের পড়ালেখায় আগ্রহ ফিরিয়ে আনতে হলে সুষ্ঠু সামাজিকীকরণ নিশ্চিত করতে হবে। পরিবার থেকে শুরু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ ও রাষ্ট্রকে একত্রে তাদের জন্য ইতিবাচক সামাজিক পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
কিশোর-তরুণদের একটি অংশ তুলনামূলক অনিয়ন্ত্রিত পারিবারিক ও শিক্ষাজীবন অতিবাহিত করছে। এটা সত্য যে কাউকে সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখা সম্ভব নয়। তবে ইতিবাচক আচরণের জন্য যে মূল্যবোধ প্রয়োজন সেটি নিশ্চিত করতে হলে প্রয়োজনীয় তদারকি অবশ্যই থাকতে হবে। যেমন প্রতি বছর উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে বিপুল পরিমাণ শিক্ষার্থী অনুপস্থিত থাকার কথা জানা যায়। প্রশ্ন হলো সে সময় তারা কী করে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পরিবার কেন তাদের শ্রেণীকক্ষে উপস্থিতি নিশ্চিত করতে পারছে না? এজন্য পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি কে করবে, সেটিও একটি বড় প্রশ্ন। সুতরাং সামগ্রিকভাবে কীভাবে কিশোর-তরুণদের শিক্ষার প্রতি আগ্রহ বাড়ানো যায় তা নিয়ে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
এক্ষেত্রে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় গড়ে তোলা দরকার। শিক্ষার্থীদের নিয়মিত শ্রেণীকক্ষে উপস্থিতি, মানসম্মত পাঠদান এবং শিক্ষকদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। কোচিং-নির্ভরতা কমিয়ে শ্রেণীকক্ষেই শেখন ঘাটতি পূরণের ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি কিশোরদের খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও সামাজিক উদ্যোগে অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়াতে হবে। মাদক ও কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার রোধে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা আবশ্যক। পাশাপাশি পরিবার ও স্থানীয় সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোকেও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে। এছাড়া মুঠোফোন ব্যবহারেও বয়সোপযোগী নিয়ন্ত্রণ ও সচেতনতা প্রয়োজন। তবে তা যেন কিশোরদের সঙ্গে অভিভাবকদের যোগাযোগ ও আস্থার সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত না করে।
শিক্ষার্থীদের শিক্ষায় আগ্রহ ফিরিয়ে আনা শুধু পরীক্ষার ফল উন্নয়নের বিষয় নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জ্ঞান, দক্ষতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধ গঠনের প্রশ্ন। শিক্ষার পরিবেশ উন্নয়নের পাশাপাশি তাদের সুষ্ঠুভাবে বেড়ে ওঠার সামাজিক পরিসর তৈরি করতে হবে। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকার ও সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগেই তা সম্ভব। অর্থাৎ সব পক্ষকে সুষ্ঠু সামাজিকীকরণে জোর দিতে হবে, যা শিশু-কিশোরদের মধ্যে প্রয়োজনীয় বোধ তৈরিতে সহায়ক হতে পারে।










