দেশে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে সর্বোচ্চ জোর দিয়েছে সরকার। আগামী ২০৩০ সালে দেশে বিদ্যুৎ চাহিদার ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ পেতে চায় সরকার। এ লক্ষ্যমাত্রার অংশ হিসেবে আগামী গ্রীষ্মে সৌরবিদ্যুৎ থেকে তিন-চার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়ার প্রত্যাশা করছে সরকার।

গতকাল রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে দুই দিনব্যাপী বাংলাদেশ সোলার এক্সপো-২০২৬-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, ‘সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন ও সম্প্রসারণ সহজ করতে সরকার এরই মধ্যে বিশেষ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন অধ্যাদেশ-২০২৬ প্রণয়ন করেছে। এ খাতে বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে বিভিন্ন নীতিসহায়তা, কর ও শুল্ক সুবিধা এবং আর্থিক প্রণোদনার ব্যবস্থা নিয়েছে। সবকিছু পরিকল্পনামাফিক এগোলে গ্রীষ্ম মৌসুম শুরুর আগেই সরকার জাতীয় গ্রিডে তিন-চার হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত করতে সক্ষম হবে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সরকারের প্রত্যাশা, সরকারি-বেসরকারি অফিস, স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল, শিল্প-কারখানা, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এবং বাসাবাড়ির অব্যবহৃত ছাদগুলো সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে ব্যবহৃত হবে।’

তিনি বলেন, ‘নেট মিটারিং ব্যবস্থার আওতায় স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎ সিস্টেম থেকে নিজস্ব ব্যবহারের পর যারা বাড়তি সৌরবিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করতে সক্ষম হবেন ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে প্রণোদনাসহ সরকার প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা হারে ক্রয় করবে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ইতোমধ্যেই অনেক সরকারি প্রতিষ্ঠানে ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের কাজ এগিয়ে চলেছে। আমি নিজেও আমার বাসায় সোলার প্যানেল স্থাপন করেছি। ইতোমধ্যেই আমার বাসায় ব্যবহারের পর বিদ্যুতের কিছু অতিরিক্ত ইউনিট জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করতেও সক্ষম হয়েছি।’

তিনি বলেন, ‘সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণে সরকারি ও বেসরকারি খাতকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়নের পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ যন্ত্রপাতির দাম কমানো হচ্ছে। জনগণের ব্যবহারের জন্য বিদ্যুতের খরচ কমানোও সরকারের অগ্রাধিকার।’

সৌরবিদ্যুৎ খাতে সম্পৃক্ত সার্ভিস প্রোভাইডারদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘একটি সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের পর সেটি ঠিকমতো কাজ করছে কিনা, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ হচ্ছে কিনা এবং গ্রাহক প্রয়োজনীয় সেবা পাচ্ছেন কিনা, অনুগ্রহপূর্বক সেদিকে লক্ষ্য রাখবেন। বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আহ্বান থাকবে, দয়া করে আপনারা উদ্যোক্তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখুন। তাদের সমস্যা ও সম্ভাবনার প্রতি আন্তরিক থাকুন।’

বিদ্যুৎ বিভাগ, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (ইডকল) যৌথভাবে প্রথমবারের মতো এ সোলার এক্সপোর আয়োজন করে। এতে সভাপতিত্ব করেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ।

অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দেশের জ্বালানি এবং বিদ্যুৎ পরিস্থিতিতে জনগণের ভোগান্তি সম্পর্কে সরকার সচেতন। ফলে চলমান জ্বালানি এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ স্থিতিশীল রাখা, বিদ্যুৎ খাতের ব্যয় ও চুক্তি পর্যালোচনা করা, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো, জ্বালানির উৎসে বৈচিত্র্য আনা এবং দ্রুত সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণ বিষয়গুলো নিয়ে সরকার একযোগে কাজ করছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানিতে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সর্বাত্মক পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘এরই অংশ হিসেবে সরকার ইতোমধ্যে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের বিদ্যুৎ চাহিদার ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। সরকারের এ উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে দেশের প্রতিটি মানুষের সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।’

উদ্যোক্তাদের উদ্দেশে তারেক রহমান বলেন, ‘আপনারাই এ উদ্যোগের মূল চালিকাশক্তি। সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণে অর্থায়ন সহজ করতে সরকার প্রাথমিকভাবে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার তহবিল বরাদ্দ করেছে। পর্যায়ক্রমে প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করা হবে।’

তিনি বলেন, ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীরা যেন শুধু অর্থের অভাবে পিছিয়ে না পড়েন সরকার সেটি নিশ্চিত করতে চায়। বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখন আর শুধু একটি সম্ভাবনাময় খাতই নয় বরং এক অনিবার্য বাস্তবতা।’

দেশের জ্ঞানের প্রতিযোগিতা চলমান রাখার প্রত্যাশা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আজকে নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ কয়েকটি বিষয়ে কয়েকজন তাদের ইনোভেটিভ আইডিয়া উপস্থাপন করে পুরস্কৃত হলেন। আগামীর বাংলাদেশে এভাবে জ্ঞানের প্রতিযোগিতা চলুক। চলুক নিত্যনতুন উদ্ভাবনী আইডিয়ার প্রতিযোগিতা। একটি ইনোভেটিভ আইডিয়া বাংলাদেশের জন্য হতে পারে গেম চেঞ্জিং।’

তিনি বলেন, ‘অর্থের অভাবে যাতে তারুণ্যের কোনো উদ্ভাবনী আইডিয়া হারিয়ে না যায় সেটি নিশ্চিত করতে বর্তমান চলতি বাজেটে স্টার্টআপের জন্য বছরে ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।’

তারেক রহমান বলেন, ‘আপনারা জানেন, দেশটাকে সম্পূর্ণ আমদানিনির্ভর রাষ্ট্রে পরিণত করে ফেলা হয়েছিল। ফলে বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আমদানি প্রক্রিয়ায় মারাত্মক বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ার কারণে জ্বালানি এবং বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে সংকট মোকাবেলা করতে হচ্ছে। দেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতি যথাসম্ভব স্বাভাবিক রাখতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকার বিদ্যুৎ খাতে ৪৩ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘চলতি অর্থবছরেও বিদ্যুতের প্রায় সমপরিমাণ চাহিদা রয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকার ডিজেলের মজুদ বাড়িয়েছে। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর জন্য কয়লার সরবরাহ ও মজুদ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বিকল্প সরবরাহকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। জ্বালানি তেল সংগ্রহ করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ইতোমধ্যেই ৬০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।’

জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিগত সরকারগুলোর ব্যর্থতা কিংবা ভূমিকা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা করে সময়ক্ষেপণের পরিবর্তে আগামী দিনগুলোতে কীভাবে বিদ্যুৎ চাহিদা মেটানো যায়, বাসাবাড়ি এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়, বর্তমান সরকারের কাছে সেটিই প্রধান অগ্রাধিকার বলে উল্লেখ করেন সরকারপ্রধান।

অনুষ্ঠানে সৌরবিদ্যুতের আইন নিয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, ‘আজকে আমরা গর্বের সঙ্গে বলতে পারি সৌরবিদ্যুতের জন্য যে আইনের প্রয়োজন তা আমরা কয়েক মাসের মধ্যে তৈরি করেছি। আগামী সংসদ অধিবেশনে পাস করার জন্য উপস্থাপন করা হবে। আমরা বিশ্বাস করি প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে এক বছরের মধ্যে পাঁচ হাজার মেগাওয়াট (সৌরবিদ্যুৎ) দিতে পারব।’

অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী ‘স্ফুরণ: টেকসই জ্বালানি উদ্ভাবনের খোঁজে ২০২৬’ প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করেন। পুরস্কার বিতরণ শেষে বিজয়ীদের সঙ্গে ফটোসেশনে অংশ নেন তিনি। এর আগে সোলার সিস্টেম নিয়ে একটি ভিডিওচিত্র উপস্থাপন করা হয়।

এ সময়ে মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, অর্থ সচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মিরানা মাহরুখ। এছাড়া অনুষ্ঠানে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্য, সচিবসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। গতকাল উদ্বোধনের পর মেলার দ্বিতীয় পর্বে সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। আর দুই দিনব্যাপী সোলার এক্সপো এ আয়োজন আজ শেষ হবে।

দেশে বর্তমানে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা সাড়ে ২৯ হাজার মেগাওয়াট। এর মধ্যে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের সক্ষমতা ১ হাজার ১২৯ মেগাওয়াট। আর নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (স্রেডা) তথ্য বলছে, দেশে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের মোট সক্ষমতা ২ হাজার ১৭ মেগাওয়াট। যেখানে সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন সক্ষমতা ১ হাজার ৭২৪ মেগাওয়াট। যার মধ্যে সরাসরি গ্রিডের সঙ্গে যুক্ত ১ হাজার ৩৪৬ মেগাওয়াট।