মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলনের চতুর্থ দিনেও রাজধানীসহ বিভিন্ন শিল্প অধ্যুষিত অঞ্চলে হামলা, ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাঁদানে গ্যাসের শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। মিরপুর, গাজীপুর, সাভার ও নারায়ণগঞ্জে গতকাল শ্রমিকদের বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধে ব্যাহত হয়েছে যান চলাচল ও কারখানার উৎপাদন কার্যক্রম। ছুটি ঘোষণা করা হয় অন্তত ৪৬৯টি পোশাক কারখানায়।

চলমান শ্রম পরিস্থিতি নিয়ে গতকাল শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়সহ সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা করেছেন তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর নেতারা। এর ধারাবাহিকতায় রাতে রাজধানীর একটি হোটেলে কয়েকটি জাতীয় দৈনিকের সম্পাদকের সঙ্গেও মতবিনিময় করেন সংগঠনটির সভাপতি মাহমুদ হাসান খান। এ সময় বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী পারভেজ ও রুবানা হক, হা-মীম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে আজাদ, সংগঠনটির প্রথম সহসভাপতি সেলিম রহমান, রেজওয়ান সেলিমসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।

মতবিনিময়ে বিজিএমইএ সভাপতি জানান, সচিবালয়ে গতকাল সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তৈরি পোশাক শিল্পের চলমান বিক্ষোভ, ভাংচুর ও সংঘর্ষের বিষয়টি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছেন তারা। সরকারপ্রধানকে জানান, কারখানার উৎপাদন নিরবচ্ছিন্নভাবে চালাতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা এখনো পর্যাপ্ত বলে মনে করছেন না পোশাক মালিকরা। সে জন্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা আরো বাড়ানো দরকার, যাতে করে শ্রমিক-মালিকের নিরাপত্তার পাশাপাশি কারখানার উৎপাদন সচল থাকে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এসব আলোচনা ও পরামর্শের পরও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রেখেছেন বিজিএমইএর নেতারা। উৎপাদন কার্যক্রম স্বাভাবিক না হলে শ্রম আইনের ১৩(১) ধারা প্রয়োগ করে কারখানা বন্ধের সিদ্ধান্ত বিবেচনায় নেয়া হতে পারে। তাই বিরাজমান শ্রমিক অসন্তোষ ও কারখানার উৎপাদন পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে মজুরি বোর্ডের কার্যক্রম দ্রুত শুরুর তাগিদ দিয়েছেন তৈরি পোশাক শিল্প মালিকরা। এ লক্ষ্যে আজকের মধ্যেই তারা মজুরি বোর্ডের প্রথম বৈঠক আয়োজনের আহ্বান জানিয়েছেন।

পোশাক শিল্প মালিকরা মনে করছেন, মজুরি বোর্ডের কার্যক্রম দ্রুত শুরু হলে প্রকৃত মজুরির দাবিকে কেন্দ্র করে শ্রমিকদের মধ্যে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা প্রশমিত হবে। তবে শ্রমিক অসন্তোষের সঙ্গে অন্য কোনো পক্ষের সম্পৃক্ততা বা ভিন্ন উদ্দেশ্যে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা থাকলে তা আলাদাভাবে বিবেচনা করা উচিত বলে মনে করেন বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান।

বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘আমরা এখনো ধৈর্য ধরার পক্ষে। এ কারণেই বলছি, মজুরি বোর্ড যেন আগামীকালের (আজ) মধ্যেই প্রথম বৈঠক ডাকে। নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যেই নতুন মজুরি ঘোষণা করা হবে, এমন একটি বার্তা দেয়া প্রয়োজন। এতে যারা প্রকৃতপক্ষে মজুরির দাবিতে আন্দোলন করছেন, তারা আশ্বস্ত হবেন। এর বাইরে অন্য কোনো বিষয় যুক্ত হলে সেটি আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অংশ এবং ভিন্ন বিষয়।’

মজুরি বোর্ডের কার্যক্রম দ্রুত শুরুর বিষয়ে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনার কথাও জানান মাহমুদ হাসান খান। তিনি বলেন, ‘শ্রম মন্ত্রণালয়ের সঙ্গেও আলোচনা করেছি প্রথম বৈঠকটা যেন দ্রুত অনুষ্ঠিত হয়।’

inside.jpg

বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, শ্রমিক অসন্তোষের কারণে গতকাল বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ৪৬৯টি কারখানা বন্ধ ছিল। এর মধ্যে মিরপুরের ৫৯টি, আশুলিয়ার ১৯১টি, গাজীপুরের ১৯৯টি ও নারায়ণগঞ্জের ২০টি কারখানা রয়েছে। এদিন কাজ না করে কারখানা থেকে বেরিয়ে যান ৭ লাখ ৫৫ হাজার ৫৩৯ শ্রমিক।

চলমান অস্থিরতার মধ্যে বন্ধ কারখানাগুলো শিগগিরই খুলে দেয়ার আশ্বাস দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। সচিবালয়ে গতকাল সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, কিছু দুষ্কৃতকারী কারখানায় হামলার চেষ্টা করতে পারে। উৎপাদন ব্যাহত করতে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কোনো কোনো মহল উসকানি দিচ্ছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড কঠোর হাতে দমনের পাশাপাশি উসকানিমূলক তৎপরতায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার কথা জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

গার্মেন্টস ও নিট খাতের শ্রমিক সংগঠনগুলোর নেতাদের পাশাপাশি মালিক পক্ষের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে বলে জানান সালাহউদ্দিন আহমদ। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট সবাই এতে সন্তুষ্ট হয়েছেন। ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের জন্য গঠিত বোর্ডের কার্যক্রমও শুরু হয়েছে। সেখানে শ্রমিকরা দরকষাকষি করতে পারবেন।’

রাজধানীর মিরপুর-১১ ও এর আশপাশের এলাকায় গতকাল সকাল থেকেই শ্রমিক ও পুলিশের মধ্যে দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ পরিস্থিতিতে মিরপুরজুড়ে তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শ্রমিকরা গতকাল সকাল সাড়ে ১০টার দিকে মিরপুর-১১ নম্বর মেট্রো স্টেশনের নিচে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে মিরপুর-১০, মিরপুর-১২ ও নান্নু মার্কেট এলাকার বিভিন্ন গলি থেকে শ্রমিকরা এসে তাতে যোগ দেন। পুলিশ তাদের সরিয়ে দিতে চাইলে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে। সংঘর্ষের একপর্যায়ে কালশী সড়কে পল্লবী থানার কনস্টেবল সায়মন দলছুট অবস্থায় আক্রান্ত হন। কয়েকজন শ্রমিক তাকে ঘিরে ধরে মারধর করেন এবং তার অস্ত্র রাস্তায় ফেলে দেয়া হয়।

পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জালাল উদ্দিন জানান, আহত কনস্টেবল সায়মনকে উদ্ধার করে রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এছাড়া মিরপুর-১১ নম্বরে শ্রমিকদের ছোড়া ইটপাটকেলের আঘাতে আরো চার পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। এ ঘটনায় ঘটনাস্থল থেকে পাঁচজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

গাজীপুরের বিভিন্ন স্থানেও গতকাল শ্রমিকরা বিক্ষোভ করেন। ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক ও ঢাকা বাইপাস এক্সপ্রেসওয়ে অবরোধ করলে যান চলাচল বন্ধ হয়ে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। পরে পুলিশ ও বিজিবির সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে শ্রমিকদের সরিয়ে দিলে সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়। তবে শ্রমিকদের বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে সারাদিনই শিল্পাঞ্চলে উত্তেজনা বিরাজ করে।

গাজীপুর মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দাবি-দাওয়া নিয়ে শ্রমিকদের আন্দোলন করার অধিকার রয়েছে। তবে এবারের আন্দোলনের ধরন কিছুটা ভিন্ন। আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর হঠাৎ ঢিল ছোড়ার ঘটনা ঘটেছে। কেউ কেউ এটিকে কেন্দ্র করে নতুন ইস্যু তৈরি করতে চাইছে বলে মনে হচ্ছে।’

সাভারের হেমায়েতপুরেও গতকাল মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখান শ্রমিকরা। বেলা ৩টার দিকে কয়েকটি কারখানার শ্রমিকরা প্রথমে সিংগাইর রোডের পদ্মার মোড় এলাকায় অবস্থান নেন। পুলিশ এসে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। এরপর তারা সবাই হেমায়েতপুরে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের উভয় পাশে অবরোধ করেন। এতে দীর্ঘক্ষণ যান চলাচল বন্ধ থাকে। পুলিশ ও শ্রমিকদের মধ্যে আলোচনার পর সন্ধ্যা পৌনে ৬টার দিকে শ্রমিকরা মহাসড়ক ছেড়ে দেন। এরপর যান চলাচল স্বাভাবিক হতে শুরু করে।

ঢাকা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম) জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘শ্রমিকরা মহাসড়ক অবরোধ করার পর থেকেই তাদের শান্তিপূর্ণভাবে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত কোনো ধরনের সহিংসতা ছাড়াই তাদের মহাসড়ক থেকে সরানো সম্ভব হয়েছে। যদিও এতে কিছুটা সময় লেগেছে।’

ধারাবাহিক আন্দোলনের মধ্যে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায়ও তৈরি পোশাক শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। গতকাল সকাল থেকে পরিস্থিতি শান্ত থাকলেও বিকালে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। বেলা পৌনে ৩টার দিকে সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন শ্রমিকরা। এতে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। একপর্যায়ে শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া শুরু হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে পুলিশ। শ্রমিকদের সড়ক থেকে সরিয়ে নারায়ণগঞ্জের দিকে ঠেলে দেয়া হয়।