বৈশ্বিক আকাশ পরিবহন খাতে বড় ধরনের পরিচালন, আর্থিক ও নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি করছে সামরিক সংঘাত, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, কূটনৈতিক বিরোধ ও আকাশসীমায় বিধিনিষেধ। সংঘাতপূর্ণ আকাশসীমা এড়িয়ে দীর্ঘ পথে উড়তে হচ্ছে; বাতিল ও পুনর্নির্ধারণ করতে হচ্ছে ফ্লাইট। একই সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা ও মূল্যবৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক সংযোগে বিঘ্ন এবং যাত্রী চাহিদার পরিবর্তন এয়ারলাইনসগুলোর মুনাফায় চাপ তৈরি করছে। জিপিএস জ্যামিং ও স্পুফিং, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকিও বেসামরিক উড়োজাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা পরিবেশকে আরো জটিল করে তুলেছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতা এসব ঝুঁকিকে আরো তীব্র করেছে। এর অভিঘাত ছড়িয়ে পড়ছে ইউরোপ, এশিয়া ও উত্তর আমেরিকার আকাশ পরিবহন বাজারেও। এ পরিস্থিতির বাইরে নেই বাংলাদেশও। দেশের আন্তর্জাতিক উড়োজাহাজ যোগাযোগের বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর হওয়ায় অঞ্চলটিতে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা ফ্লাইট পরিচালনা, যাত্রী পরিবহন, কার্গো কার্যক্রম ও এয়ারলাইনসগুলোর আয়ে বড় ধরনের চাপ তৈরি করতে পারে।
আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন সংস্থা (আইএটিএ) ও ইউরোপীয় বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রণ সংস্থা ইউরোকন্ট্রোলের তথ্যেও উঠে এসেছে সংকটের ব্যাপকতা। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে একদিকে এ অঞ্চলের বিমানবন্দরগুলোয় কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে নিরাপত্তার বিবেচনায় আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনসগুলোকে দীর্ঘ ও বিকল্প উড্ডয়নপথ ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে জ্বালানি খরচ বাড়ার পাশাপাশি উড়োজাহাজের ব্যবহারসূচি, ক্রু ব্যবস্থাপনা ও সংযোগ ফ্লাইটের সময়সূচি জটিল হয়ে উঠছে।
ইউরোকন্ট্রোলের তথ্য অনুযায়ী, সংঘাতের পর প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ১৫০টি ফ্লাইটকে বিকল্প পথে পাড়ি দিতে হয়েছে। এসব উড়োজাহাজকে প্রতিদিন সম্মিলিতভাবে প্রায় ২ লাখ ৬ হাজার কিলোমিটার অতিরিক্ত পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে। এতে উড্ডয়ন সময় বেড়েছে প্রায় ২৮ হাজার মিনিট। বিকল্প পথে চলাচলের কারণে প্রতিদিন প্রায় ৬০২ টন অতিরিক্ত জ্বালানি পুড়ছে এবং প্রায় ১ হাজার ৯০০ টন বাড়তি কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ হচ্ছে।
সংঘাতের প্রভাব পড়ছে জ্বালানি ব্যয়েও। আইএটিএর হিসাবে, ২০২৬ সালে বৈশ্বিক এয়ারলাইনসগুলোর জ্বালানি ব্যয় প্রায় ৩৫ হাজার কোটি ডলারে পৌঁছতে পারে, যা ২০২৫ সালের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি। সংস্থাটির মহাপরিচালক উইলি ওয়ালশ জানিয়েছেন, গড় জেট ফুয়েলের দাম বছরে প্রায় ৭০ শতাংশ বাড়তে পারে। এতে এয়ারলাইনসগুলোর সম্মিলিত জ্বালানি বিল প্রায় ১০ হাজার কোটি ডলার বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ ব্যয় সামাল দিতে বিভিন্ন এয়ারলাইনস টিকিটের মূল্য বাড়াচ্ছে, কম লাভজনক রুটে ফ্লাইট কমাচ্ছে এবং নতুন রুট চালুর পরিকল্পনা পিছিয়ে দিচ্ছে।
ভূরাজনৈতিক সংঘাতের কারণে বেসামরিক বিমান চলাচলে আরেকটি বড় ঝুঁকি হয়ে উঠেছে জিপিএস বা জিএনএসএস জ্যামিং ও স্পুফিং। জ্যামিংয়ের মাধ্যমে স্যাটেলাইট নেভিগেশন সিগন্যাল দুর্বল বা অকার্যকর করা হয়, আর স্পুফিংয়ের ক্ষেত্রে উড়োজাহাজকে ভুয়া অবস্থান বা সময়ের তথ্য দেয়া হতে পারে। এতে পাইলট ও এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয় এবং প্রয়োজন হলে বিকল্প নেভিগেশন ব্যবস্থা ব্যবহার, রুট পরিবর্তন বা ফ্লাইট ডাইভার্ট করতে হতে পারে। ইউরোপীয় বিমান নিরাপত্তা সংস্থা ইএএসএ জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্য, কৃষ্ণ সাগর ও পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে এ ধরনের হস্তক্ষেপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৫ সালে জ্যামিংয়ের রিপোর্ট ২০২৩ সালের তুলনায় ৬৭ শতাংশ এবং জিপিএস স্পুফিংয়ের ঘটনা ১৯৩ শতাংশ বেড়েছিল। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত তীব্র হওয়ার পর অঞ্চলটির আশপাশে এ ধরনের হস্তক্ষেপ আরো ঘন ঘন ঘটছে।
এদিকে ইউরোপের আকাশপথেও নতুন করে নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গতকাল ইউরোপের অন্তত সাতটি ফ্লাইটে বোমা হামলার হুমকি আসায় বিভিন্ন বিমানবন্দরে উড়োজাহাজের জরুরি অবতরণ, নিরাপত্তা তল্লাশি ও ফ্লাইট পরিচালনায় বিঘ্ন ঘটে। ক্ষতিগ্রস্ত এয়ারলাইনসগুলোর মধ্যে রয়েছে পোল্যান্ডের লট পোলিশ এয়ারলাইনস, স্ক্যান্ডিনেভিয়ান এয়ারলাইনস (এসএএস), রায়ানএয়ার ও উইজ এয়ার। লন্ডন থেকে ওয়ারশগামী লট পোলিশ এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইট হুমকির পর মডলিন বিমানবন্দরে অবতরণ করে। ডাবলিন থেকে রোমগামী রায়ানএয়ারের একটি উড়োজাহাজ ইতালির যুদ্ধবিমানের পাহারায় অবতরণ করে। এর আগের দিন লন্ডন লুটন থেকে সোফিয়াগামী উইজ এয়ারের একটি ফ্লাইট বোমা হামলার হুমকিতে বুদাপেস্টে ঘুরিয়ে নেয়া হয়। এসব ঘটনায় কয়েকটি বিমানবন্দরের কার্যক্রম সাময়িকভাবে ব্যাহত হলেও তল্লাশিতে কোনো বিস্ফোরক পাওয়া যায়নি।
নিরাপত্তাঝুঁকি ও আকাশসীমায় বিধিনিষেধের কারণে বৈশ্বিক এভিয়েশন খাতে পরিচালন সংকটও বাড়ছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন এয়ারলাইনস ফ্লাইট বাতিল, স্থগিত ও সূচি পরিবর্তন করছে। সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনস সম্প্রতি জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির কারণে সিঙ্গাপুর-দুবাই রুটের এসকিউ৪৯৪ ও এসকিউ৪৯৫ ফ্লাইট আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৭ পর্যন্ত বাতিল করা হয়েছে। ব্রিটিশ এয়ারওয়েজও মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত ও আকাশসীমার বিধিনিষেধের কারণে আবুধাবি, আম্মান, বাহরাইন, দোহা, দুবাই, তেল আবিব ও রিয়াদে ফ্লাইটসূচি সীমিত করেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতার কারণে ইউরোপ ও এশিয়ার অন্যান্য এয়ারলাইনসও একই ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে। এয়ার ফ্রান্স-কেএলএম রিয়াদে ফ্লাইট স্থগিতের মেয়াদ ৭ নভেম্বর পর্যন্ত বাড়িয়েছে। লুফথানসা গ্রুপের এয়ারলাইনসগুলো রিয়াদে সব ফ্লাইট ১৮ নভেম্বর পর্যন্ত বাতিল করেছে। ফিলিপাইন এয়ারলাইনস রিয়াদ রুটে ফ্লাইট স্থগিতের মেয়াদ ২৯ নভেম্বর পর্যন্ত বাড়িয়েছে। হংকংভিত্তিক ক্যাথে প্যাসিফিক হংকং-রিয়াদ ও হংকং-দুবাই রুট পুনরায় চালুর পরিকল্পনা পিছিয়ে ২০২৭ সালের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ডেল্টা এয়ারলাইনসও আটলান্টা-রিয়াদ নতুন রুট চালুর পরিকল্পনা মার্চ ২০২৭ পর্যন্ত পিছিয়েছে।
উপসাগরীয় অঞ্চলের এয়ারলাইনসগুলোর কার্যক্রমেও সরাসরি প্রভাব পড়েছে। কাতার এয়ারওয়েজ রিয়াদ, দাম্মাম, আবহা ও তাইফে ফ্লাইট সাময়িকভাবে স্থগিত রেখেছে। ইতিহাদ এয়ারওয়েজ আবুধাবি-রিয়াদ ও আবুধাবি-দাম্মাম রুটের ফ্লাইট বাতিল করেছে। ভারতীয় এয়ারলাইনসগুলোর মধ্যে এয়ার ইন্ডিয়া রিয়াদ, দাম্মাম ও জেদ্দায় ফ্লাইট স্থগিতের মেয়াদ বাড়িয়েছে। ইন্ডিগো রিয়াদ, জেদ্দা, দাম্মাম ও মদিনায় ফ্লাইট বাতিল করেছিল। গত ২ নভেম্বরও ইন্ডিগো জানিয়েছে, সৌদি আরবের পরিস্থিতির কারণে তারা প্রতিদিন প্রায় ৩০টি ফ্লাইট কম পরিচালনা করছে।
সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোয় বিঘ্নের ব্যাপকতা তুলে ধরেছে রয়টার্সের ২৮ অক্টোবর প্রকাশিত বিশ্লেষণ। এতে বলা হয়, ৮ থেকে ২৫ অক্টোবরের মধ্যে রিয়াদের বিমানবন্দরে নির্ধারিত ফ্লাইটের প্রায় ৮৬ শতাংশ বাতিল হয়েছিল।
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতায় বাংলাদেশের আকাশ পরিবহন খাতও বাড়তি ঝুঁকিতে পড়েছে বলে মনে করেন এয়ারএশিয়া ও কুয়েত এয়ারলাইনসের জেনারেল সেলস এজেন্ট প্রতিষ্ঠান টোটাল এয়ার সার্ভিসেস লিমিটেডের (টাস গ্রুপ) চেয়ারম্যান কেএম মজিবুল হক। তিনি বণিক বার্তা বলেন, ‘বিভিন্ন এয়ারলাইনস ফ্লাইট কমাচ্ছে, অনেকে নতুন ফ্লাইট চালুর সূচিও পিছিয়ে দিচ্ছে। গত কয়েক দিনে ওমরাহ যাত্রীবাহী বেশকিছু ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। ছয় তারিখের একটি ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় যাত্রীদের ১৫ দিন পিছিয়ে দেয়া হয়েছে। অনেকের হাতে টাকা নেই, খাওয়ার খরচও নেই। আবার রিয়াদ ও আশপাশে কর্মরত অনেকের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছে।’
দেশের এয়ারলাইনসগুলোর মধ্যপ্রাচ্যনির্ভরতার চিত্র তাদের আন্তর্জাতিক গন্তব্যের তালিকাতেই স্পষ্ট। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ২৪টি আন্তর্জাতিক গন্তব্যের মধ্যে ১০টিই মধ্যপ্রাচ্যে। এর মধ্যে সৌদি আরবের দাম্মাম, জেদ্দা, রিয়াদ ও মদিনা; সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবি, দুবাই ও শারজাহ ছাড়াও রয়েছে কুয়েত, দোহা ও মাস্কাট। অর্থাৎ বিমানের আন্তর্জাতিক গন্তব্যের প্রায় ৪২ শতাংশ এ অঞ্চলে। বেসরকারি ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের ১৪টি আন্তর্জাতিক গন্তব্যের সাতটিই মধ্যপ্রাচ্যে। মাস্কাট, দোহা, দুবাই, শারজাহ, আবুধাবি, জেদ্দা ও রিয়াদে ফ্লাইট পরিচালনা করে সংস্থাটি।
এ নির্ভরতার প্রভাব এরই মধ্যে দেশের আকাশপথে যাত্রী পরিবহন কার্যক্রমে পড়তে শুরু করেছে। সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোয় সাম্প্রতিক হামলার পরিপ্রেক্ষিতে যাত্রীদের নিরাপত্তা ও সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস সৌদি আরবের বিভিন্ন গন্তব্যে ফ্লাইট পরিচালনার সময়সূচিতে প্রয়োজনীয় সমন্বয় করেছে। এর অংশ হিসেবে আগামী ৭ নভেম্বর থেকে ঢাকা-দাম্মাম-ঢাকা রুটে নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনা পুনরায় শুরু হবে। তবে যাত্রীদের নিরাপত্তা ও সার্বিক সুরক্ষার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে পরবর্তী নির্দেশনা না দেয়া পর্যন্ত প্রতিদিন দিনের বেলায় এ রুটে ফ্লাইট পরিচালিত হবে। অন্যদিকে ঢাকা-রিয়াদ-ঢাকা রুটের ফ্লাইট পরবর্তী নির্দেশনা না দেয়া পর্যন্ত স্থগিত থাকবে।
গতকাল বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) নিয়মিত হালনাগাদে জানানো হয়, সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোয় সীমিত কার্যক্রমের কারণে বাংলাদেশ-সৌদি রুটে সরাসরি ও ট্রানজিট মিলিয়ে এ পর্যন্ত ১৭১টি ফ্লাইট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ২৩ হাজার ৭৭ জন যাত্রী সরাসরি প্রভাবিত হয়েছেন। এর মধ্যে সরাসরি ফ্লাইট ৯৪টি এবং ট্রানজিট ফ্লাইট ৭৭টি। সরাসরি ফ্লাইটের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। সংস্থাটির ৪৫টি ফ্লাইট প্রভাবিত হয়েছে, যা মোট ক্ষতিগ্রস্ত সরাসরি ফ্লাইটের প্রায় ৪৮ শতাংশ। এছাড়া সৌদি এয়ারলাইনসের ২১টি, রিয়াদ এয়ারওয়েজের ১৮টি এবং ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের ১০টি সরাসরি ফ্লাইট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বিমান জানিয়েছে, জরুরি প্রয়োজনে যাত্রীরা জেদ্দা ও মদিনা বিমানবন্দর ব্যবহার করতে পারবেন। ১৬ অক্টোবর থেকে ঢাকা-জেদ্দা রুটে প্রতিদিন দুটি ফ্লাইট পরিচালনা করছে সংস্থাটি। ঢাকা-মদিনা রুটেও নিয়মিত ফ্লাইট চলাচল করছে। অন্যদিকে গত ১০ অক্টোবর থেকে ঢাকা-রিয়াদ-ঢাকা রুটে ফ্লাইট পরিচালনা স্থগিত রেখেছে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস। সংস্থাটির কর্মকর্তারা বলছেন, রিয়াদ বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ বিমানবন্দরটিকে নিরাপদ ঘোষণা করলেই কেবল সেখানে ফ্লাইট চলাচল পুনরায় শুরু হবে।
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতায় বাংলাদেশের এয়ারলাইনসগুলোর ক্ষতির আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) কামরুল ইসলাম। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার প্রভাব শুধু বিমান পরিবহন খাতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। দীর্ঘ সময় ধরে এ পরিস্থিতি চললে দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহেও প্রভাব পড়বে। পুরো অর্থনীতিই এর আওতায় আসবে। ইরান ও উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হলে এবং সৌদি আরবের সংকট দীর্ঘায়িত হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন প্রবাসী শ্রমিকরা।’
মধ্যপ্রাচ্যের ট্রানজিট হাবগুলোর কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় বাংলাদেশের যাত্রীদের ভ্রমণেও অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে। ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রগামী উল্লেখযোগ্যসংখ্যক যাত্রী দুবাই, দোহা বা আবুধাবির মাধ্যমে যাতায়াত করেন। এসব বিমানবন্দরে কার্যক্রম ব্যাহত হলে ফ্লাইটের সংযোগ পরিবর্তন, যাত্রা বিলম্ব ও টিকিটের মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি হয়। আইএটিএর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে মধ্যপ্রাচ্যের যাত্রী পরিবহন ১১ দশমিক ৪ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে। এ অঞ্চলে ট্রান্সফার বা সংযোগকারী যাত্রী হারানোই এ পতনের অন্যতম প্রধান কারণ। বৈশ্বিক কার্গো সক্ষমতার প্রায় ১৩ শতাংশ মধ্যপ্রাচ্যের এয়ারলাইনসগুলোর হাতে থাকায় এ অঞ্চলের বিঘ্ন আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহনে চাপ তৈরি করছে।
সংকট মোকাবেলায় বিকল্প বিমানবন্দর ব্যবহার ও ফ্লাইট বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন টাস গ্রুপের চেয়ারম্যান কেএম মজিবুল হক। তিনি বলেন, ‘বিমান যেখানে একটি ফ্লাইট চালায়, সেখানে চারটি চালানোর জন্য সৌদি কর্তৃপক্ষকে বিশেষ অনুরোধ করা যেতে পারে। তায়েফ ও মদিনার মতো বিমানবন্দরে ফ্রিকোয়েন্সি বাড়ালে কর্মীরা সেখান থেকে সড়কপথে কর্মস্থলে যাতায়াত করতে পারবেন। সরকার-সরকার পর্যায়ে বসে এখনই এ সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব।’ বিকল্প ব্যবস্থার নজির হিসেবে কুয়েতের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ‘যুদ্ধ তুঙ্গে থাকার সময় কুয়েতে সরাসরি না গিয়ে সৌদি আরবের দাম্মাম থেকে ফ্লাইট পরিচালনা করা হতো, বাকি পথ যাত্রীরা সড়কপথে যেতেন।’ তার মতে, আকাশ ও সড়কপথ মিলিয়ে একাধিক বিকল্প আগে থেকে ঠিক করে রাখা জরুরি।
মধ্যপ্রাচ্য বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান শ্রমবাজার হওয়ায় সংকটের প্রভাব আকাশপথে যাত্রী পরিবহন ছাড়িয়ে অর্থনীতিতেও পড়তে পারে। এ অঞ্চলে লাখ লাখ বাংলাদেশী কর্মরত। তাদের কর্মস্থলে যাতায়াত, ছুটি শেষে দেশে ফেরা ও নতুন কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে আকাশপথে যাতায়াত গুরুত্বপূর্ণ। সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোয় বিঘ্নের কারণে যাত্রীদের বিকল্প বিমানবন্দর ব্যবহার করতে হচ্ছে, ভ্রমণ পরিকল্পনা পরিবর্তন করতে হচ্ছে। এতে যাত্রার সময় ও ব্যয় বাড়ছে। একই সঙ্গে ভিসার মেয়াদ, কর্মস্থলে যোগদান এবং ওমরাহ যাত্রার মতো বিষয়গুলোও অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছে।
এ বিষয়ে একাধিকবার যোগাযোগ করেও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কাইজার সোহেল আহমেদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। বক্তব্য চেয়ে যোগাযোগ করলে সংস্থাটির মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) শাহনূর আহমেদ লিখিত প্রশ্ন পাঠাতে বলেন। গত ৩১ অক্টোবর ও ১ নভেম্বর দুই দফা প্রশ্ন পাঠানো হলেও কোনো উত্তর মেলেনি। এ বিষয়ে গতকাল যোগাযোগ করা হলে তিনি ‘আগামীকাল’ (আজ) বিমান কর্তৃপক্ষের বক্তব্য দিতে পারবেন বলে জানান।










