জ্বালানি তেল আমদানির পরিমাণ অনুযায়ী দেশে পৌঁছানোর কথা থাকলেও খালাসের সময় মিলছে না পুরো চালান। বিল অব লেডিংয়ের (বিএল) পরিমাণের তুলনায় চট্টগ্রাম বন্দরে ৫৬টি জাহাজ থেকে বিপুল জ্বালানি তেল কম পেয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আসা এসব জাহাজ থেকে জ্বালানিপণ্য খালাসের সময় মোট ২ হাজার ৪৪৯ টন কম পাওয়া যায়।

বিভিন্ন ধরনের জ্বালানির লিটার রূপান্তর হিসাব অনুযায়ী এ ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ২৯ লাখ ৬৫ হাজার লিটারে। বর্তমান বাজারদরে যার আর্থিক মূল্য প্রায় ৪৫ কোটি টাকা। বিপিসির শীর্ষ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এ বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও বিস্তারিত পর্যালোচনা শেষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

বিপিসির নথিপত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চট্টগ্রাম বন্দরে গত অর্থবছরে আসা ৫৬টি জাহাজের বিএল অনুযায়ী জ্বালানির পরিমাণ ছিল ১৭ লাখ ৫১ হাজার ৯২৮ দশমিক ৮৪২ টন। বিপরীতে খালাস হয় ১৭ লাখ ৪৯ হাজার ৪৭৯ দশমিক ৩৫৭ টন জ্বালানি। অর্থাৎ আমদানির নথিতে উল্লেখিত পরিমাণের তুলনায় ২ হাজার ৪৪৯ দশমিক ৪৮৫ টন কম পণ্য পেয়েছে বিপিসি। এসব জাহাজের খালাস কার্যক্রম পরিচালনা করেছে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান মেঘনা পেট্রোলিয়াম কোম্পানি লিমিটেড (এমপিএল)।

জ্বালানির ধরন অনুযায়ী, ঘাটতির বড় অংশই হাই স্পিড ডিজেল (এইচএসডি)। পণ্যটি ২ হাজার ২৬ দশমিক ৪৫৮ টন বা প্রায় ২৪ লাখ ৩ হাজার ৩৭৯ লিটার কম পাওয়া গেছে। বিপিসির নির্ধারিত রূপান্তর হার অনুযায়ী, প্রতি টন ডিজেলের সমপরিমাণ ১ হাজার ১৮৬ লিটার। অন্যদিকে পেট্রল ও অকটেনে ঘাটতি পাওয়া গেছে ২৮১ দশমিক ৭৮৯ টন বা প্রায় ৩ লাখ ৮৫ হাজার ৪৮৭ লিটার। এ দুই ধরনের জ্বালানির ক্ষেত্রে ১ হাজার ৩৬৮ লিটারে এক টন হিসাব করা হয়। এছাড়া জেট এ-১ জ্বালানিতে ১৪১ দশমিক ২৩৮ টন বা প্রায় ১ লাখ ৭৫ হাজার ৭০০ লিটার (১ হাজার ২৪৪ লিটারে এক টন) ঘাটতি পাওয়া যায়।

জাহাজভিত্তিক হিসাবেও কয়েকটি চালানে বড় ধরনের ঘাটতির চিত্র উঠে এসেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘাটতি পাওয়া গেছে এমটি টর্ম অ্যাগনেসে। চলতি বছরের ২৭ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম বন্দরে আসা জাহাজটির বিএল অনুযায়ী হাই স্পিড ডিজেলের পরিমাণ ছিল ৩৪ হাজার ৯৮৮ দশমিক ৮২৩ টন। কিন্তু খালাসের সময় পাওয়া গেছে ৩৪ হাজার ৭২৫ দশমিক ৩৬০ টন। অর্থাৎ এক জাহাজ থেকেই ২৬৩ দশমিক ৪৬৩ টন ডিজেল কম পেয়েছে বিপিসি।

দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ঘাটতি পাওয়া গেছে এমটি টর্ম লুইস জাহাজে। গত বছরের ২০ আগস্ট আসা এ জাহাজের বিএল অনুযায়ী ডিজেলের পরিমাণ ছিল ৩৩ হাজার ৪৩১ টন। বিপরীতে খালাস হয়েছে ৩৩ হাজার ২১০ টন। এতে ঘাটতি দাঁড়ায় ২২১ টন জ্বালানি। একইভাবে গত ১৭ এপ্রিল চট্টগ্রাম বন্দরে আসা এমটি লিয়ান সং হু জাহাজ থেকে ২১৪ টন ডিজেল কম পাওয়া গেছে। জাহাজটির বিএল অনুযায়ী জ্বালানির পরিমাণ ছিল ৪১ হাজার ৯০৭ টন। খালাসের পরিমাণ ছিল ৪১ হাজার ৬৯৩ টনের কিছু বেশি। এছাড়া গত বছরের ৪ জুলাই চট্টগ্রাম বন্দরে আসা পিভিটি সোলানা জাহাজে ২০৬ টন মোটর অয়েল ঘাটতি পাওয়া যায়। বিএল অনুযায়ী জাহাজটিতে ২৪ হাজার ২ টন মোটর অয়েল থাকার কথা থাকলেও খালাস হয়েছে ২৩ হাজার ৭৯৬ টন। এ চার জাহাজেই মোট ঘাটতি প্রায় হাজার টন।

জানতে চাইলে খালাসের সময় দায়িত্বে থাকা মেঘনা পেট্রোলিয়ামের উপমহাব্যবস্থাপক (অপারেশন) মুজিবুর রহমান চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘খালাসের সময় কিছু জাহাজে বিএল পরিমাণের তুলনায় কম জ্বালানি পাওয়া গেছে, এটি সত্য। তবে ঘাটতির পরিমাণ বিপিসির নির্ধারিত সহনীয় সীমা দশমিক ৩ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। ফলে এ ঘাটতির কারণে জ্বালানি খালাসে কোনো অনিয়ম হয়নি।’ তবে নির্দিষ্ট চারটি জাহাজে অস্বাভাবিক ঘাটতির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

বিপিসি-সংশ্লিষ্টদের মতে, কয়েকটি জাহাজে অস্বাভাবিক ঘাটতি সামগ্রিক হিসাবের আড়ালে থেকে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে সবচেয়ে বেশি ঘাটতি থাকা চারটি জাহাজে বিএল পরিমাণের তুলনায় আমদানির প্রায় দশমিক ৭ শতাংশ জ্বালানি কম পাওয়া গেছে। ফলে নির্ধারিত সহনীয় সীমার যুক্তি দিয়ে এ ঘাটতির আর্থিক প্রভাব উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

জানা গেছে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে জ্বালানি তেল আমদানি-রফতানির ক্ষেত্রে বিএল পরিমাণ এবং প্রকৃত খালাসের পরিমাণে কিছু পার্থক্য থাকা অস্বাভাবিক নয়। জাহাজের ট্যাংকে জ্বালানির পরিমাপ, তাপমাত্রা ও ঘনত্বের পরিবর্তন, পরিমাপ পদ্ধতির ভিন্নতা এবং জাহাজ ও তীরে ব্যবহৃত পরিমাপযন্ত্রের পার্থক্যের কারণে এ ধরনের ঘাটতি তৈরি হতে পারে। তবে গত অর্থবছরে ৫৬টি জাহাজের মধ্যে কয়েকটিতে রেকর্ড পরিমাণ ঘাটতি এবং সাতটি জাহাজে বিএল পরিমাণের চেয়ে বেশি জ্বালানি পাওয়ার ঘটনা পুরো খালাস প্রক্রিয়ার পরিমাপ ও তদারকি ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।

বিপিসি দীর্ঘদিন ধরে জ্বালানি খালাসের ক্ষেত্রে মেইন পয়েন্ট ইনস্টলেশন (এমআই) অটোমেশনের পরিকল্পনা করলেও তা এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিমাপ ও হিসাব সংরক্ষণে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা চালু না থাকায় জ্বালানি খালাসের প্রতিটি পর্যায়ে ঘাটতির প্রকৃত কারণ শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। আমদানির পরিমাণ থেকে খালাস, মজুদ ও সরবরাহ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে নির্ভুল হিসাব নিশ্চিত করা না গেলে এ ধরনের আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকি থেকেই যাবে।

এ বিষয়ে বিপিসির পরিচালক (অপারেশন) একে মোহাম্মদ সামছুল আহসান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এক বছরের জ্বালানি আমদানিতে খালাসকালীন ঘাটতির বিষয়টি নিয়ে বিপিসি এখন অনেক বেশি সজাগ। দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পনা থাকলেও বর্তমানে এমআই খালাস প্রক্রিয়ায় অটোমেশন চালুর বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। সরবরাহ চেইনের কিছু ক্ষেত্রে অটোমেশন বাস্তবায়নের ভালো ফলও পাওয়া গেছে।’ পুরো কার্যক্রম স্বয়ংক্রিয় করা সম্ভব হলে এ ধরনের ঘাটতি কিংবা অনিয়ম দূর করা যাবে বলে আশা করছেন তারা।

জ্বালানি বিপণন ও সরবরাহ খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আমদানির পর খালাস, মজুদ, পরিবহন ও বিতরণ—প্রতিটি পর্যায়েই জ্বালানির পরিমাণ কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। ডিপোতে সরবরাহ ও সেখান থেকে বিতরণের সময় চুরি এবং বিভিন্ন ধরনের অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে দীর্ঘদিনের। ফলে আমদানি করা জ্বালানির পুরোটা শেষ পর্যন্ত বাজারজাত করা সম্ভব হয় না। জাহাজ থেকে খালাস এবং পরবর্তী সময়ে ডিপোতে সরবরাহের সময় ঘাটতি বিপিসির প্রকৃত মুনাফা কমিয়ে দিচ্ছে বলেও অভিযোগ তাদের।