সুস্থ জীবনযাপনের জন্য নিরাপদ খাদ্য গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু বিষয়টি কেবল ভোক্তার ওপর নির্ভর করে না। উৎপাদন থেকে শুরু করে বাজারজাত পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে খাদ্যপণ্যের গুণগত মান রক্ষা না হলে ভোক্তা নিরাপদ খাবার পাবে না। অনেক ক্ষেত্রে তাদের পক্ষে জানাও সম্ভব হবে না ক্রয়কৃত কোন খাদ্যপণ্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ শরীরের জন্য। এক্ষেত্রে অবশ্যই গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে এবং গবেষণা হয়ও বটে। কিন্তু উদ্বেগজনক বিষয় হলো নানা সময়ে দেশের বাজারে বিক্রীকৃত বহু খাদ্যপণ্যের ওপর পরিচালিত গবেষণার ফলাফল যখনই সামনে এসেছে, তখনই নিরাপদ খাদ্য নিয়ে আতঙ্কিত হতে হয়েছে। তারই একটি উদাহরণ হলো সম্প্রতি রাজধানীর খোলাবাজার ও সুপারশপে বিক্রি হওয়া চাল ও চিড়ার ওপর পরিচালিত গবেষণার ফলাফল।
বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের পরিচালিত গবেষণায় চালের ২৭ দশমিক ৬৩ শতাংশ এবং চিড়ার ৫৫ শতাংশ নমুনায় লিভার ক্যান্সারের ঝুঁকি সৃষ্টিকারী আফলাটক্সিনের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। যদিও নমুনাগুলোতে আফলাটক্সিনের মাত্রা ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্ধারিত সর্বোচ্চ অনুমোদিত সীমার নিচে ছিল, তবু দীর্ঘমেয়াদি গ্রহণের ফলে এর স্বাস্থ্যঝুঁকি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই বলে গবেষকদের মতামত। বিশেষত চাল ও চিড়া দেশের মানুষের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়ায় বিষয়টি জনস্বাস্থ্যের জন্য বিশেষ সতর্ক বার্তা দিচ্ছে।
এদিকে গত আগস্টে ‘ডুয়াল বারডেন অব কেমিক্যাল অ্যান্ড মাইক্রোবিয়াল হ্যাজার্ডস ইন ডেইরি প্রডাক্টস ফ্রম ঢাকা, বাংলাদেশ: আ কমপ্রিহেনসিভ ফুড সেফটি অ্যাসেসমেন্ট অ্যাক্রস মার্কেট সিস্টেম’ শীর্ষক এক গবেষণার ফলাফল প্রকাশ পেয়েছিল। এ গবেষণায় ঢাকা ও ঢাকার আশপাশের বাজারগুলোতে পাওয়া যায় এমন দুধে ভারী ধাতু জীবাণুর উপস্থিতি পরীক্ষা করে দেখেছেন গবেষকরা। ২০২১ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্ধারিত এলাকার বাজার থেকে তারা দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করে বিপজ্জনক মাত্রায় ভারী ধাতুর উপস্থিতিসহ মলের জীবাণু পেয়েছেন। দীর্ঘমেয়াদে এগুলো গ্রহণ করতে থাকলে মানবদেহে ক্যান্সার বাসা বাঁধা ও অঙ্গহানির আশঙ্কা রয়েছে। এটা আরেকটি উদাহরণ মাত্র। খোদ বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (বিএফএসএ) বহু গবেষণায় খাদ্যে ভেজাল ও বিষাক্ত উপাদানের উপস্থিতি পাওয়া গেছে—কোথাও শাকসবজিতে ক্ষতিকারক সিসা ও ক্যাডমিয়ামের মতো ভারী ধাতু, কোথাও পানিতে মলজাত জীবাণু, আবার কোথাও শিশুখাদ্যে নিরাপদ সীমার কয়েক গুণ বেশি টক্সিন। আবার রান্নার তেলে অতিরিক্ত ট্রান্সফ্যাট, মুড়িতে ইউরিয়া, গুড়ে নিষিদ্ধ রাসায়নিক এবং বিস্কুট ও স্ট্রিট ফুডে প্রিজারভেটিভের উপস্থিতিও পাওয়া গেছে।
দেশে সময়ের সঙ্গে খাদ্য উৎপাদন বেড়েছে। তবে একই সঙ্গে বেড়েছে অনিরাপদ খাদ্যের সরবরাহ। নির্বিচারে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহারে খাদ্যের গুণগত মান ও নিরাপত্তা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শস্য উৎপাদন থেকে শুরু করে পরিবহন, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতের বিভিন্ন পর্যায়ে ক্ষতিকর রাসায়নিক মেশানো হচ্ছে। মাছের খামারে পোলট্রি বর্জ্যসহ নানা দূষিত উপাদান ব্যবহার, মুরগি ও গরুর দ্রুত বৃদ্ধিতে হরমোন ও অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ এবং দুধ উৎপাদন বাড়াতে কৃত্রিম পদ্ধতির আশ্রয় নেয়া হচ্ছে। পাশাপাশি জুস, চকোলেট, চানাচুর, বেকারি ও শিশুখাদ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিক, মসলায় ইটের গুঁড়া এবং হলুদে লেড ক্রোমেট মেশানোর প্রমাণ ও অভিযোগ আছে। অসাধু উৎপাদক ও ব্যবসায়ীদের এসব কর্মকাণ্ড খাদ্যদূষণ বাড়িয়ে জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে। অথচ নিরাপদ খাদ্যপ্রাপ্তি নাগরিকের অধিকার এবং সংবিধান অনুযায়ী নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতের দায়দায়িত্ব রাষ্ট্রের। এর কোনোটিই হচ্ছে না; নাগরিকের উদ্বেগ কেবল বেড়ে চলেছে, স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে।
দেশে অনিরাপদ খাবারের কারণে বছরে মারা যাচ্ছে প্রায় ৩৫ হাজার মানুষ। আবার অনিরাপদ খাবার গ্রহণের কারণে প্রতিদিন ৫ শতাংশ মানুষ ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে। অনিরাপদ খাবার গ্রহণের ফলে শিশু, গর্ভবতী মায়েদের মধ্যে তৈরি হয় পুষ্টিহীনতা। এছাড়া খাদ্যপণ্যে ভেজালের কারণে দেশে বিভিন্ন রকমের ক্যান্সার, লিভার সিরোসিস, কিডনি ফেইলিউর, হৃদযন্ত্রের অসুখ, হাঁপানিসহ আরো জটিল রোগাক্রান্ত মানুষের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। এগুলো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
খাবার নিরাপদ কিনা তা কেবল গবেষণার মাধ্যমে বের করলে হবে না। বাজারজাত হওয়ার আগে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে হবে। কিছুদিন পর পরই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ভেজালবিরোধী অভিযান পরিচালনা করে এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে শাস্তিস্বরূপ আর্থিক জরিমানা করে। কিন্তু এগুলো কোনো কার্যকর সমাধানের উপায় না। কেননা জরিমানা দিয়ে আবার একই ধরনের অপকর্মে লিপ্ত হওয়ার নজির কম নয়। কাজেই অনিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, বিপণন ও বিক্রি বন্ধে সরকারকে কঠোর ভূমিকায় যেতে হবে।
নিরাপদ খাদ্যের কার্যক্রমটি বর্তমানে একাধিক মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত হওয়ায় সমন্বয়ের অভাব প্রকট। এক্ষেত্রে বিএফএসএকে আরো শক্তিশালী করা প্রয়োজন। পাশাপাশি মান নিয়ন্ত্রক হিসেবে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) গবেষণা ও তদারকি আরো বাড়াতে হবে। দেশে খাদ্যপণ্যের বাজার সম্প্রসারণের বিপরীতে নজরদারির প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এখনো অপ্রতুল। সুতরাং কীভাবে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা আরো বাড়ানো যাবে তা সরকারকে ভাবতে হবে। খাদ্য উৎপাদন থেকে বিপণনের প্রতিটি পর্যায়ে খাদ্য নিরাপদ রাখার কৌশল সরকারকে বের করতে হবে। নইলে নিরাপদ খাদ্যপ্রাপ্তি নিয়ে উদ্বেগ বাড়বে বৈ কমবে না।










