অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার জন্য একটি কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের ক্ষেত্রে এর বিভিন্ন উপাদানের পারস্পরিক সমন্বয় ও সুফলের ওপর ভিত্তি করে এগোতে হবে। এসব উপাদানের মধ্যে রয়েছে দরিদ্রবান্ধব অব্যাহত প্রবৃদ্ধি; সম্পদ, সামাজিক সেবা ও আয়ের ক্ষেত্রে ন্যায্যতা এবং উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান। এ ধরনের কর্মপরিকল্পনা হতে হবে সুনির্দিষ্ট, বাস্তবভিত্তিক ও কার্যকর। পাশাপাশি, এ কর্মপরিকল্পনায় নীতিমালা ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনা—উভয় বিষয়কেই অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
অব্যাহত প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে প্রথমেই প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। এজন্য এমন একটি সামষ্টিক অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে, যা সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রতি সংবেদনশীল হওয়ার পাশাপাশি টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জনে সহায়ক হবে। রাজস্বনীতির আওতায় অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবকাঠামো খাতে সরকারি বিনিয়োগ কর্মসূচি উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারণ করা যেতে পারে, যাতে আরো প্রবৃদ্ধি উদ্দীপিত হয়। রাজস্ব আহরণের জন্য বিদ্যমান আর্থিক সক্ষমতার পরিসর অনুসন্ধান করতে হবে, মৌলিক মানবিক চাহিদাকে অগ্রাধিকার দিয়ে ব্যয় পুনর্বণ্টন করতে হবে এবং সম্পদ ব্যবহারে দক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে। অর্থনীতির বহুমুখীকরণের জন্য উৎপাদনশীলতা বেশি—এমন খাত, যেমন উৎপাদন শিল্প, রফতানি ও কৃষিভিত্তিক শিল্পে ঋণ সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৃতপক্ষে এ ধরনের নীতি সরবরাহ-পক্ষীয় সীমাবদ্ধতা কমানোর পাশাপাশি সামগ্রিক চাহিদা বৃদ্ধিতে সহায়তা করা।
দ্বিতীয়ত, বিনিময় হার ও পুঁজিপ্রবাহ ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। একটি পরিচালিত বিনিময় হার ব্যবস্থা বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক সম্পদপ্রবাহ গ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করার পাশাপাশি রফতানি বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। পুঁজির অন্তঃপ্রবাহ ও বহিঃপ্রবাহ যথাযথভাবে পরিচালনা করলে বৈদেশিক মুদ্রা এমন সব মূলধনি পণ্য আমদানিতে ব্যবহার করা সম্ভব হবে, যা উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধিতে প্রয়োজনীয়। এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারের সংকেত কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে স্থানীয় সক্ষমতার ক্ষতি না করে উন্মুক্ত বাণিজ্যনীতি অনুসরণ করতে হবে। নীতিমালার মধ্যে সামঞ্জস্য রক্ষা করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আঞ্চলিক বাজার প্রতিষ্ঠার চলমান প্রচেষ্টাকে অগ্রাধিকার দেয়া দরকার। দক্ষিণ-দক্ষিণ বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক একীকরণে অতিরিক্ত সহায়তা প্রদান করা উচিত।
তৃতীয়ত, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়ার সক্ষমতা বাড়াতে হবে এবং স্বল্প কার্বনভিত্তিক উন্নয়নকে উৎসাহিত করতে হবে। অব্যাহত প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করার জন্য জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে একটি বৈশ্বিক মতৈক্য থাকা প্রয়োজন, যাতে স্বল্প সম্পদসম্পন্ন জনগোষ্ঠী জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় খাপ খাইয়ে নিতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে অভিযোজনের অর্থায়নের জন্য যে সম্পদ বরাদ্দ করা হবে, তা বিদ্যমান ও ভবিষ্যতে প্রত্যাশিত সরকারি উন্নয়ন সহায়তার অতিরিক্ত হতে হবে। প্রাকৃতিক সম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনা টেকসই প্রবৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
প্রবৃদ্ধি টেকসই হওয়ার পর একে দরিদ্রবান্ধব করে তুলতে হবে। এজন্য দরিদ্রবান্ধব প্রবৃদ্ধির কৌশল অনুসরণ করা প্রয়োজন। প্রথমত, সার, ঋণ, ভর্তুকি ও সেচের মতো কৃষি উপকরণ সরবরাহের মাধ্যমে কৃষিকে সহায়তা করতে হবে। প্রবৃদ্ধিকে অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে হলে প্রকৃত মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি উৎপাদনের উপকরণগুলোকে কম উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ড থেকে অধিক উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ডে নিট স্থানান্তর করতে হবে। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অধিকাংশই ক্ষুদ্র কৃষিকাজের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে। তাই ক্ষুদ্র কৃষিতে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এ কৌশলের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নিম্নোক্ত প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করার মাধ্যমে কৃষির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করা সম্ভব: বৃষ্টিনির্ভর কৃষির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমানো, আধুনিক কৃষি পদ্ধতি ও প্রযুক্তির সীমিত ব্যবহার বৃদ্ধি করা, জমি ও ভূমির মালিকানা-সংক্রান্ত অধিকার লাভের সীমাবদ্ধতা দূর করা, টেকসই সার, কীটনাশক ও উন্নত বীজের ব্যবহার বাড়ানো, দ্রুত ও ব্যাপকভাবে ঘটে চলা মাটির ক্ষয় রোধ করা, সড়কের মতো গ্রামীণ অবকাঠামোর অভাব দূর করা, কৃষিপণ্য বিপণনের সীমিত সুযোগ সম্প্রসারণ করা, পোকামাকড় ও রোগবালাইয়ের কারণে ক্ষয়ক্ষতির ক্রমবর্ধমান হার ও তীব্রতা মোকাবেলা করা এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং আকস্মিক বিপর্যয় মোকাবেলায় সক্ষমতা বাড়ানো।
দ্বিতীয়ত, একটি সমন্বিত গ্রামীণ উন্নয়ননীতি গ্রহণের মাধ্যমে গ্রামীণ অকৃষি অর্থনীতির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে এবং বহুমুখী অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে উৎসাহিত করতে হবে। এ ধরনের নীতির গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলোর মধ্যে রয়েছে—অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবকাঠামোতে বিনিয়োগ, শ্রমঘন ক্ষুদ্র শিল্পের বিকাশ, কৃষি খাতের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন, মানবিক সক্ষমতার উন্নয়ন, বাজারের সম্ভাবনা অনুসন্ধান এবং আধুনিক যোগাযোগপ্রযুক্তি ব্যবহার করে নতুন সুযোগ কাজে লাগানো। উৎপাদন শিল্পের সঙ্গে গ্রামীণ অর্থনীতির পশ্চাৎমুখী ও অগ্রমুখী সংযোগ প্রতিষ্ঠা করা দরকার। একই সঙ্গে নগরভিত্তিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও কার্যকর সংযোগ গড়ে তুলতে হবে।
তৃতীয়ত, নারী ও মেয়েশিশুদের জন্য সুযোগ সম্প্রসারণে বিনিয়োগ করতে হবে এবং তাদের অর্থনৈতিক, আইনগত ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন এগিয়ে নিতে হবে। মেয়েশিশুরা যাতে অবাধে স্বাস্থ্যসেবা এবং প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে, তা নিশ্চিত করা হলে উন্নয়নের সব ক্ষেত্রেই অগ্রগতি ত্বরান্বিত হয়। যেসব মায়ের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই, তাদের সন্তানদের অপুষ্টিতে ভোগার অথবা পাঁচ বছর বয়স পূর্ণ হওয়ার আগেই মারা যাওয়ার আশঙ্কা, স্কুলশিক্ষা সম্পন্ন করা মায়েদের সন্তানদের তুলনায় বেশি।
সাংবিধানিক ও আইনগত সংস্কার নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ সরাসরি বাড়াতে পারে। বিকল্প জ্বালানির উৎস, পানি ও বিদ্যুতের মতো অবকাঠামোগত সুবিধা পরিবারে পৌঁছে দিলে নারীর গৃহস্থালির কাজের বোঝা কমে। এর ফলে মেয়েশিশুরা বিদ্যালয়ে যাওয়ার সুযোগ পায় এবং নারীরা স্বনিয়োজিত কাজে যুক্ত হতে কিংবা শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ করতে পারেন। জমি ও ঋণের মতো উৎপাদনশীল সম্পদে নারীর প্রবেশাধিকার তাদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের জন্য অপরিহার্য। ভূমির অধিকার ও আয়ের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের বৈষম্য দূর করতে সংবেদনশীল একটি সরকারি অর্থ ব্যবস্থা একটি কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে কাজ করতে পারে।
সম্পদ বণ্টন, মৌলিক সামাজিক সেবায় প্রবেশাধিকার এবং আয় বণ্টনে ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে বহুমুখী নীতি গ্রহণ করতে হবে। প্রথমত, ভূমির ন্যায্য বণ্টনের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। প্রধান উৎপাদনশীল সম্পদগুলোর অন্যতম ভূমির সুষম বণ্টন নিশ্চিত করার জন্য ভূমির মালিকানা ব্যবস্থার সংস্কার অপরিহার্য। ভূমি সংস্কারের পাশাপাশি কৃষি সম্প্রসারণ সেবা ও বিপণন সুবিধার মতো পর্যাপ্ত গ্রামীণ সহায়তা নিশ্চিত করা হলে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি পায়—এটি প্রমাণিত। বিভিন্ন দেশের ওপর পরিচালিত তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ভূমির মালিকানার অসম বণ্টনের সঙ্গে পরবর্তী সময়ে নিম্ন প্রবৃদ্ধির সম্পর্ক রয়েছে। একইভাবে পারিবারিক পর্যায়েও সম্পদের মালিকানা ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সাফল্যের ওপর সুস্পষ্ট প্রভাব ফেলে। সম্পদের মালিকানা-সংক্রান্ত অধিকার আরো সুদৃঢ় করার জন্য ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। ভূমিহীন দরিদ্র কৃষকদের আইনগত ক্ষমতায়ন তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ চাবিকাঠি।
দ্বিতীয়ত, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও অনানুষ্ঠানিক খাতের উৎপাদকদের মধ্যে পরিকল্পিতভাবে ঋণ বরাদ্দের জন্য দরিদ্রবান্ধব আর্থিক খাতনীতি অনুসরণ করতে হবে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও অনানুষ্ঠানিক খাতের উৎপাদকদের অধিকার এবং মালিকানা স্বীকৃতির জন্য প্রয়োজনীয় আইনগত কাঠামো নিয়ে কাজ করতে হবে। আইনগতভাবে স্বীকৃত ব্যবসায়িক মালিকানার দলিল থাকলে ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানগুলো জামানত প্রদানের মাধ্যমে ব্যাংক ঋণ পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করতে পারে। ঋণপ্রাপ্তির সুযোগ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সম্প্রসারিত হতে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে এবং পণ্য ও সেবার ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণ করতে সহায়তা করে। যেসব দেশে দারিদ্র্যের প্রকোপ বেশি, সেসব দেশে ক্ষুদ্র ঋণের মাধ্যমে গ্রামীণ নারীপ্রধান পরিবারগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা দারিদ্র্য ও বৈষম্য হ্রাসের একটি কার্যকর কৌশল হতে পারে।
তৃতীয়ত, পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে পর্যাপ্ত, নির্ভরযোগ্য ও ন্যায়সংগত প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। আধুনিক জ্বালানি সেবায় প্রবেশাধিকারের অভাব দারিদ্র্য ও মানব উন্নয়নের পশ্চাৎপদতার একটি অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। ভোগ ও উৎপাদন—উভয় ক্ষেত্রেই এর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। দরিদ্র পরিবারগুলোর কাছে আধুনিক জ্বালানি সহজলভ্য করা এবং ক্ষুদ্র উৎপাদকদের সহায়তা করার মাধ্যমে আধুনিক জ্বালানি সেবায় ন্যায়সংগত প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা গেলে প্রবৃদ্ধিকে অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তোলা সম্ভব হবে। জ্বালানিতে পর্যাপ্ত, নির্ভরযোগ্য ও ন্যায়সংগত প্রবেশাধিকার কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতিও ত্বরান্বিত করে। জ্বালানির সুযোগ পেলে পরিবারগুলো কর্মসংস্থান গ্রহণ, স্বনিয়োজিত কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ এবং ক্ষুদ্র ব্যবসার মালিকানা অর্জনের মাধ্যমে প্রবৃদ্ধির প্রক্রিয়ায় যুক্ত হতে পারে।
আধুনিক গ্রিড-বহির্ভূত বা বিদ্যুৎ গ্রিডের বাইরে পরিচালিত জ্বালানি সেবার মাধ্যমে পর্যাপ্ত ও নির্ভরযোগ্য আধুনিক জ্বালানি সেবায় প্রবেশাধিকারের সুযোগ সম্প্রসারণ করা সম্ভব। স্বল্প থেকে মধ্যমেয়াদে শুধু গ্রিডভিত্তিক জ্বালানি সরবরাহ সম্প্রসারণের মাধ্যমে পর্যাপ্ত ও নির্ভরযোগ্য আধুনিক জ্বালানি সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হওয়ার সম্ভাবনা কম। তাই বিকেন্দ্রীভূত নতুন অফ-গ্রিড জ্বালানি সেবার উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। এর একটি উদাহরণ হলো পশ্চিম আফ্রিকায় কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতের জন্য ব্যবহৃত ‘বহুমুখী কার্যকর প্লাটফর্ম’।
চতুর্থত, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য মৌলিক সামাজিক সেবায় প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য প্রথমেই স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নিরাপদ পানি এবং মৌলিক পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার মতো ক্ষেত্রে সামাজিক সেবার সম্প্রসারণে সরকারি বিনিয়োগ করতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে সরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে মৌলিক অবকাঠামো প্রতিষ্ঠিত হলে বেসরকারি বিনিয়োগকারীরাও সেবা প্রদানে এগিয়ে আসতে পারেন। সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বও গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি এমন একটি ব্যবহারকারী ব্যয় কাঠামো গড়ে তুলতে হবে, যাতে দরিদ্র জনগোষ্ঠী এসব সেবার ব্যয় বহন করতে পারে।
সাশ্রয়ী মূল্যে মৌলিক সামাজিক সেবা নিশ্চিত করা হলে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে এবং তারা উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানে নিয়োজিত হতে পারবে। বর্ধিত সক্ষমতা তাদের নিজেদের জীবনকে প্রভাবিত করে—এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের সুযোগও সৃষ্টি করবে। একই সঙ্গে সেবার গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে জনগণের কাছে সেবাগুলোর সাংস্কৃতিক গ্রহণযোগ্যতার বিষয়টিও যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।
অব্যাহত প্রবৃদ্ধিকে দরিদ্রবান্ধব করে তোলার জন্য পুনর্বণ্টনমূলক নীতি অনুসরণ করা অপরিহার্য। প্রবৃদ্ধির সুফল ন্যায়সংগতভাবে বণ্টন এবং প্রবৃদ্ধির প্রক্রিয়ার বাইরে থাকা মানুষের চাহিদা পূরণের জন্য আয়ের পুনর্বণ্টন করতে হবে। আয়ের পুনর্বণ্টনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর কর ও ব্যয়নীতি হলো মজুরি এবং করপোরেট মুনাফার ওপর প্রগতিশীল আয়কর আরোপ করা। যেসব দেশে খনিজ ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণভিত্তিক শিল্পের অবদান বেশি, সেসব দেশে সরকারি খাতের প্রশাসনিক সক্ষমতা সীমিত হলেও রাজস্ব ব্যবস্থার মাধ্যমে পুনর্বণ্টন সম্ভব। যেসব দেশে অনানুষ্ঠানিক খাতের ব্যাপক বিস্তার রয়েছে এবং শ্রমশক্তির অধিকাংশ গ্রামীণ খাতে নিয়োজিত, সেসব দেশে দুটি বিকল্প অনুসরণ করা যেতে পারে। প্রথমত, দারিদ্র্য হ্রাসের কর্মসূচি ও প্রকল্পগুলো এমনভাবে প্রণয়ন করা যেতে পারে, যাতে সরাসরি দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়। দ্বিতীয়ত, প্রবৃদ্ধির সুফল কার্যকরভাবে বণ্টনের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে মৌলিক শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, বাজারে প্রবেশাধিকারের জন্য অবকাঠামো এবং অন্যান্য সামাজিক সেবায় সরকারি বিনিয়োগ। এগুলো পুনর্বণ্টনমূলক নীতির কার্যকর উদাহরণ হিসেবে প্রমাণ হয়েছে।
এ ভিন্ন, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ব্যয়ের ক্ষেত্রে যেসব পণ্যের অংশ উল্লেখযোগ্য, সেসব নির্বাচিত পণ্যে ভর্তুকি প্রদান করতে হবে। দরিদ্র জনগোষ্ঠী তুলনামূলকভাবে বেশি ব্যবহার করে—এমন পণ্যে ভর্তুকি দিলে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ও আমদানির ক্ষেত্রে নেতিবাচক বিকৃতি সৃষ্টির প্রভাব সাধারণত সীমিত থাকে। বৈদেশিক সহায়তার মাধ্যমে রাজস্ব ভারসাম্যের ওপর ভর্তুকির চাপ কমানো যেতে পারে। পাশাপাশি উচ্চ প্রবৃদ্ধি নতুন সম্পদের সংস্থানও করে।
নগর দারিদ্র্য মোকাবেলায় এ ধরনের ভর্তুকি সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলতে পারে। আবাসন ও জ্বালানিতে ভর্তুকি পরিবারের ব্যয়ের বোঝা উল্লেখযোগ্যভাবে কমায়। বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের খাবার সরবরাহের মতো পণ্যভিত্তিক ভর্তুকিও আরেকটি কার্যকর পদ্ধতি, যার মাধ্যমে বিদ্যালয়ে ভর্তি ও উপস্থিতির হার বৃদ্ধি পায় বলে প্রমাণ হয়েছে। তবে সঠিকভাবে উপকারভোগী নির্বাচন করা একটি চ্যালেঞ্জ হতে পারে। তাই ভর্তুকি কর্মসূচির সতর্ক পরিকল্পনা ও কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে হবে। এসব কর্মসূচি দারিদ্র্য ও বৈষম্য হ্রাসে অবদান রাখে, পরিবারগুলোকে ঝুঁকি মোকাবেলায় সহায়তা করে, আকস্মিক বিপর্যয়ের সংঘটন ও প্রভাব কমায় এবং মানবসম্পদের উন্নয়ন ঘটায়। সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করে যে কেউ যেন কল্যাণের ন্যূনতম স্তরের নিচে নেমে না যায়। সামাজিক সুরক্ষার সম্ভাব্য ব্যবস্থাগুলোর মধ্যে রয়েছে: সামাজিক বীমা বা ন্যূনতম আয় অনুদানের মতো সরাসরি অর্থ প্রদান, মানব উন্নয়নকে উৎসাহিত করার জন্য নগদ অর্থ হস্তান্তর, ন্যূনতম মজুরি-সংক্রান্ত নীতি, কর্মরত ব্যক্তিদের জন্য শ্রমবাজার নিয়ন্ত্রণবিধি।
এছাড়া পুনর্বণ্টনমূলক কৌশল কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের জন্য একটি বিস্তৃত রাজনৈতিক জোট গড়ে তুলতে হবে। পুনর্বণ্টনের পক্ষে রাজনৈতিক জোটের উদ্ভব ও গঠন প্রতিটি দেশের নিজস্ব পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল। তবে কর ও সরকারি ব্যয়নীতি, ভর্তুকি এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির মাধ্যমে আয়ের পুনর্বণ্টন করা সম্ভব।
সেলিম জাহান: অর্থনীতিবিদ ও ভূতপূর্ব পরিচালক, মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন দপ্তর এবং দারিদ্র্য দূরীকরণ বিভাগ, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি, নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র










