সড়কে দুর্ঘটনা বাংলাদেশে নিত্যদিনের চিত্র। সড়কে বছরে এত প্রাণ যায়—যুদ্ধরত অনেক দেশেও এতজনের প্রাণহানি হয় না। বিভিন্ন খাতে আমরা অভূতপূর্ব উন্নয়ন করতে পারলেও স্বাধীনতার পর থেকেই অব্যবস্থাপনা ও সড়কে মৃত্যু যেন আমাদের যোগাযোগ ব্যবস্থার নিত্যসঙ্গী। গত কয়েক বছরে সড়কে প্রাণহানির পরিমাণ আরো বেড়েছে। প্রধান উপার্জনকারীর বিদায়ে অনেক পরিবারকে পথে নামতে হচ্ছে। আবার পঙ্গুত্ব বরণ করা ব্যক্তিরাও পরিবার ও সমাজের জন্য বোঝা হিসেবে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। সড়কে প্রাণহানি আমাদের মোট জাতীয় উৎপাদন বা জিডিপিতেও বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব রাখছে। দিনের পর দিন সড়কে প্রাণহানির মচ্ছব চলছে অথচ মনে হয় তার দায়িত্ব নেয়ার কেউ নেই। 

গতকাল বণিক বার্তার এক প্রতিবেদনে বলা হয় ‘‌যাত্রীবাহী বাস পুকুরে পড়ে নিহত ১৭’। প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, বেপরোয়া গতিতে বাঁক ঘুরতে গিয়ে নিয়ন্ত্রণ হারায় বাসটি। নিহতদের মধ্যে রয়েছে তিন শিশু ও আট নারী। আহত এক যাত্রীর বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়, ৪০ আসনের বাসটি সকাল পৌনে ৯টার দিকে ভাণ্ডারিয়া থেকে বরিশালের উদ্দেশে যাত্রা করে। পথিমধ্যে বিভিন্ন স্থান থেকে ওঠানোর ফলে যাত্রী সংখ্যা হয় প্রায় ৭০। বাসটির ছাদেও বেশ কয়েকজন যাত্রী ছিল। দ্রুতগতিতে ছত্রকান্দা ধানসিঁড়ি ইউনিয়ন পরিষদ অতিক্রমকালে চালক মোহন সুপারভাইজারের সঙ্গে কথা বলছিলেন। এ সময় বাঁক ঘুরতে গিয়ে হঠাৎ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বাসটি সড়কের বাম দিকের পুকুরে পড়ে যায়। 

সড়কে নিয়মতান্ত্রিক বিশৃঙ্খলার ক্ল্যাসিক উদাহরণ এ সড়ক দুর্ঘটনা। চালকের পরিপূর্ণ প্রশিক্ষণ ছিল কিনা, তার লাইসেন্স ছিল কিনা তা দেখা দরকার। সুপারভাইজারের সঙ্গে কথা বলে বলে গাড়ি চালানো, যাত্রীদের সঙ্গে বচসায় জড়ানো, অন্য বাসকে টেক্কা দিতে মহাসড়কে রেস লাগানো—এ যেন বাসযাত্রার নিত্যচিত্র। বাস চালনার মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে সঠিক লোক বাছাইয়ের যথাযথ প্রক্রিয়া আছে কিনা কিংবা থাকলে তা মান্য করা হয় কিনা তা স্পষ্ট নয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুর্ঘটনা একেবারে বন্ধ করতে না পারলেও সড়কে অহেতুক মৃত্যু অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব। কিন্তু সেদিকে যথাযথ কর্তৃপক্ষের সুনজর আছে বলে মনে হয় না। তা না হলে প্রতি বছর সড়কে মৃত্যুর মিছিল বেড়েই চলত না। 

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির বরাতে জানা গেছে, এবার কোরবানির ঈদের ছুটিতে সারা দেশে ২৭৭টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৯৯ জন মারা গেছে। এসব দুর্ঘটনায় আহত হয়েছে ৫৪৪ জন। প্রতি বছর ছুটির মৌসুমে সড়কে চাপ পড়ে এটা জানা কথা। কিন্তু এখন পর্যন্ত আমরা নিরাপদ ব্যবস্থা উপহার দিতে পারিনি। এটা জাতি হিসেবে বেশ লজ্জাকর ঘটনাই বটে। আরো হতাশার চিত্র উপহার দেয় ২০২২ সালের দুর্ঘটনায় হতাহতের উপাত্ত। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি বলছে, গত আট বছরের মধ্যে ২০২২ সালে সবচেয়ে বেশি সড়ক দুর্ঘটনা ও হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। ওই বছরে ৬ হাজার ৭৪৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৯ হাজার ৯৫১ জন নিহত ও ১২ হাজার ৩৫৬ জন আহত হয়েছে। 

সড়ক দুর্ঘটনার আরেকটা মারাত্মক দিক হচ্ছে, এতে মৃত্যু বেশি শিক্ষার্থীদের। সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে কাজ করা সংগঠন রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর সড়কে ১ হাজার ২৩৭ জন শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে। দিনে অন্তত তিনজন শিক্ষার্থীর প্রাণ গেছে সড়কে। আমরা যদি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থা তৈরি করতে না পারি তাহলে আমাদের কাঙ্ক্ষিত টেকসই উন্নয়ন সম্ভবপর হবে কি?

সড়ক দুর্ঘটনায় আর্থসামাজিক ক্ষতির হিসাব তৈরি করেছে বুয়েটের সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউট (এআরআই)। সেখানে দেখা গেছে, ২০১৮ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত তিন বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকা। আর রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, গত বছর সড়ক দুর্ঘটনায় মানবসম্পদের যে ক্ষতি হয়েছে, তার আর্থিক মূল্য ১৮ হাজার কোটি টাকার বেশি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সড়ক পরিবহন আইন প্রয়োগ কাগজ-কলমে সীমাবদ্ধ থাকলে দুর্ঘটনা কমবে না। মালিকদের প্রভাবে চলছে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। তারা একপেশে ও একচেটিয়া সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। আইন প্রয়োগে প্রভাবশালীদের ছাড় দেয়া হচ্ছে। প্রভাবশালী ও সবলদের ওপর আইন প্রয়োগ করছে না পুলিশ। দুর্বলের ওপর আইন প্রয়োগ করা হচ্ছে। এছাড়া সড়কে চাঁদাবাজি, ছোট যানবাহনের আধিক্যের কারণে সড়ক পরিবহন নেটওয়ার্ক ভেঙে পড়ছে। উন্নত দেশে গণপরিবহনকে প্রাধান্য দেয়া হয়, আর আমাদের দেশে ছোট যানবাহনকে প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে।

সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে—সড়কে দুই ও তিন চাকার গাড়ির সংখ্যা বাড়তে থাকা, বেপরোয়া গতি, বিপজ্জনক ওভারটেকিং, রাস্তা নির্মাণে ত্রুটি, ফিটনেসবিহীন যানবাহনের অবাধে চলাচল, যাত্রী ও পথচারীদের অসতর্কতা, চালকের অদক্ষতা ও বেপরোয়া মনোভাব, চলন্ত অবস্থায় মোবাইল বা হেডফোন ব্যবহার এবং মাদক সেবন করে যানবাহন চালানো। 

সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে যে ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে— (১) সড়ক নিরাপত্তায় বাজেটে বরাদ্দ বাড়িয়ে মন্ত্রণালয়ে আলাদা সড়ক নিরাপত্তা ইউনিট গঠন করা। (২) দেশের সড়ক-মহাসড়কে প্রয়োজনীয় রোড সাইন (ট্রাফিক চিহ্ন) স্থাপন ও জেব্রা ক্রসিং অংকন। (৩) গাড়িচালকদের দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণের পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করা। (৪) পরিবহন খাতে বিদ্যমান অনিয়ম-দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি বন্ধ করা। (৫) গাড়ির ফিটনেস ও চালকদের লাইসেন্স প্রদানের পদ্ধতি উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আধুনিকায়ন করা। (৬) সড়ক দুর্ঘটনায় আর্থিক সহায়তা তহবিল গঠনপূর্বক হতাহতদের দ্রুত উন্নত চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা। (৭) দেশব্যাপী চাহিদানুযায়ী পর্যাপ্ত মানসম্মত নতুন গণপরিবহন নামানোর উদ্যোগ নেয়া। (৮) ট্রাফিক পুলিশের কর্মকর্তা ও সদস্যদের প্রশিক্ষণের জন্য ট্রেনিং একাডেমি গড়ে তোলা। 

সড়কে মৃত্যুর যে মিছিল চলছে প্রতিদিন তা নিয়ন্ত্রণে অবিলম্বে পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। সড়ক দুর্ঘটনা পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে আসে। সুপ্রশিক্ষিত চালক, সড়কে সুব্যবস্থাপনা এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যথাযথ নীতি প্রণয়ন ও কার্যকর ছাড়া এ জাতীয় ক্ষয় এড়াতে পারব না। জাতিগত শক্তির নিদারুণ অপচয় রোধে সরকার যথাযথ পদক্ষেপ নেবে—এ কামনা করছি।