প্রবাসীদের প্রেরিত অর্থ বা রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের অতি বড় একটা অংশ আসে প্রবাসীদের প্রেরিত অর্থ থেকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২২ সালের তথ্যানুসারে, প্রবাসীদের প্রেরিত বৈদেশিক মুদ্রার পরিমাণ দেশের মোট রফতানি আয়ের প্রায় অর্ধেকের সমান এবং আর্থিক মূল্যে তা মোট দেশজ উৎপাদনের ৫ শতাংশের কাছাকাছি। তাই জনশক্তি রফতানি সরকারের একটি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাত বলে গণ্য।
জনশক্তি রফতানি জোরদারের লক্ষ্যে সরকার জনশক্তি রফতানিকারক কোম্পানি হিসেবে বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (বোয়েসেল) প্রতিষ্ঠা করে সেই ১৯৮৪ সালে। কিন্তু আক্ষেপের বিষয় যে জনশক্তি রফতানিতে এখন পর্যন্ত আশানুরূপ সাফল্য দেখাতে পারেনি বোয়েসেল।
বণিক বার্তায় গতকাল প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, প্রতিষ্ঠার পর গত চার দশকে দেশের মোট রফতানীকৃত জনশক্তির মাত্র শূন্য দশমিক ৯৫ শতাংশ প্রেরণ করতে সক্ষম হয়েছে বোয়েসেল। ১৯৮৪ সাল থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ১ কোটি ৫১ লাখ ১০ হাজার ৬৫২ জন কর্মী বিদেশ পাঠিয়েছে সরকার। এ সময়কালে বোয়েসেলের অধীনে জনশক্তি রফতানি হয়েছে মাত্র ১ লাখ ৪৪ হাজার ৩১২ জন, শতকরা হিসাবে যার পরিমাণ ১ শতাংশেরও কম। বাংলাদেশ জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) এবং বোয়েসেলের তথ্য বিশ্লেষণ করে এ চিত্র দেখা যায়।
সাফল্যহীনতার এ পরিসংখ্যান প্রতিষ্ঠানটির সক্ষমতা প্রশ্নবিদ্ধ করে নিঃসন্দেহে। অথচ বোয়েসেলের প্রতিষ্ঠাকালীন লক্ষ্যই ছিল জনশক্তি রফতানি বৃদ্ধি তথা সে উদ্দেশ্যে বাংলাদেশী প্রবাসীদের জন্য বহির্বিশ্বে শ্রমবাজার বিস্তার ও তাদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। বোয়েসেলের অন্যতম আরেকটি লক্ষ্য ছিল দক্ষ জনশক্তি রফতানিতে বেসরকারি এজেন্সিগুলোর মধ্যে সুস্থ প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ পরিচর্যা করা। সেক্ষেত্রেও সফল হতে পারেনি বোয়েসেল, বলছে বিশেষজ্ঞদের বরাতে বণিক বার্তার প্রতিবেদন।
তাই প্রতিষ্ঠানটির সাংগঠনিক কাঠামোর পুনর্বিন্যাস তথা কর্মতৎপরতার পরিধি বৃদ্ধির প্রস্তাব উঠেছে। তার জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দ বৃদ্ধির পরামর্শও দিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। বোয়েসেলের দুই কর্মকর্তার বরাতে বণিক বার্তা বলছে, বোয়েসেল সবসময়ই দক্ষ ও যোগ্য কর্মী প্রেরণে অগ্রাধিকার দেয় এবং পর্যাপ্ত দক্ষ কর্মীর অভাবে প্রতিষ্ঠানটির জনবল রফতানি তুলনামূলকভাবে অন্যান্য এজেন্সির চেয়ে কম।
তাদের আরো দাবি যে বোয়েসেলের নিজস্ব জনবল সংকটের কারণেও জনশক্তি রফতানি বৃদ্ধি সহজসাধ্য নয়। জেলায় জেলায় বোয়েসেলের শাখা অফিস খোলার কথা থাকলেও সরকার এত বছরেও তা খোলেনি কেন তা বোধগম্য নয়। বলা হচ্ছে, কর্মসংস্থান ও নতুন বাজার খোঁজার জন্য একটি টিমকে বিদেশে রাখা উচিত, কিন্তু সেটি করতে না পারার কারণে কোম্পানিটি আশানুরূপ সফল হতে পারছে না। এ অবস্থায় প্রশ্ন জাগে, যে প্রতিষ্ঠানের কাজই জনশক্তি রফতানি, শ্রমবাজারের বিস্তারের লক্ষ্যে সে প্রতিষ্ঠানটির কোনো প্রতিনিধিত্বকারী দল কেন বহির্বিশ্বে সদাতৎপর নেই? অথচ প্রায়ই সংবাদপত্রের পাতা এ ধরনের খবরে সয়লাব হয় যে সরকারের নানা বিভাগ তথা স্বায়ত্তশাসিত ও আধা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান থেকে অহরহ প্রতিনিধি দল প্রায় বিনা কারণে বিদেশ ভ্রমণে যায়।
এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে প্রদান করা বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজের (বায়রা) সভাপতি মোহাম্মদ আবুল বাশারের মন্তব্যটি প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন, ‘বোয়েসেল কর্মী প্রেরণে ভালো করবে কীভাবে? কর্মী প্রেরণের জন্য বাজার খুঁজতে হয়, বিদেশ যেতে হয়। সরকারি প্রতিষ্ঠান হওয়ায় তারা তা করতে পারে না। তারা শুধু সরকারিভাবে বা বিভিন্ন দূতাবাসের মাধ্যমে যেসব নতুন চাকরি আসে সেখানেই রিক্রুট করে।’
তিনি আরো বলেছেন, ‘বোয়েসেল একটি কোম্পানি। প্রতিষ্ঠানটিকে ব্যবসা করতে হবে। ব্যবসা করতে গেলে প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, মার্কেটিং করতে হয়। তারা কোনো প্রতিযোগিতায় নেই, মার্কেটিংয়ে নেই। বিভিন্ন দূতাবাস, সরকারিভাবে যেসব নিয়োগ হয়, আর কিছু কোম্পানি আছে যারা বোয়েসেলকে পছন্দ করে, তাদের মাধ্যমে এ প্রতিষ্ঠান কাজ করে। এটি না হলে চার দশকে ৫০ হাজারও বিদেশে নিতে পারত কিনা সন্দেহ আছে।’
আমরা আশা করি, বোয়েসেল একটি কোম্পানি হিসেবে অন্যান্য বেসরকারি এজেন্সির সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক সংহতি বজায় রেখে দক্ষ ও অদক্ষ জনশক্তি রফতানি আরো জোরদার করবে।
রফতানিকারক এ কোম্পানির পিছিয়ে পড়ার অন্যান্য কারণের মধ্যে মন্ত্রণালয় এবং বিএমইটির পর্যাপ্ত পৃষ্ঠপোষকতার অভাবকেও দায়ী করেছেন রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) চেয়ারপারসন তাসনিম সিদ্দিকী। বলা হচ্ছে, বাইরে গিয়ে ভিসা খোঁজা, ভালো ভিসা আনার জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ পায় না বোয়েসেল। এসব সীমাবদ্ধতার কারণে প্রতিষ্ঠানটি এখন বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কেবল ‘গভর্নমেন্ট টু গভর্নমেন্ট’ (জিটুজি) পদ্ধতিতে শ্রমিক রফতানি করছে।
বোয়েসেলের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে তাই কার্যপরিধি বাড়ানোর জন্য অবকাঠামোগত সক্ষমতা তথা লোকবল বৃদ্ধি জরুরি। তবে সব সত্ত্বেও জনশক্তি রফতানিতে বোয়েসেলের সুনামও আছে যে বোয়েসেলের মাধ্যমে প্রেরিত কর্মীরা হয়রানি বা হেনস্তার শিকার কম হয়। ইউরোপের শ্রমবাজারসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্র কিছুটা হলেও বোয়েসেল প্রসারিত করেছে এবং গুণগত অভিবাসন নিশ্চিত করছে।
যেহেতু জনশক্তি রফতানিকারক অন্যান্য এজেন্সির সঙ্গে বোয়েসেলের পার্থক্য হচ্ছে—এটি সরকারি মালিকানাধীন একটি প্রতিষ্ঠান, সেহেতু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে সরকারের সব নিয়ম বা বিধি পালন করে কর্মী পাঠানোর সংখ্যা বাড়ালে দেশের অর্থনীতি উপকৃত হবে। তাই আমরা চাই, বোয়েসেল এগিয়ে যাক। সে লক্ষ্যে সক্ষমতা বাড়াতে এর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ঢেলে সাজানো হোক, কর্মদক্ষতাসম্পন্ন জনবল নিয়োগপূর্বক বরাদ্দ বাড়ানো হোক।










