বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে গত পাঁচ দশকে বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এক বহুমাত্রিক পথ পাড়ি দিয়েছে। বর্তমানে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শক্তি ও জ্বালানি, যোগাযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সংস্কৃতির মতো নানা ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক বিস্তৃত হয়েছে। বলা হচ্ছে, গত দেড় দশকে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক ‘অনন্য উচ্চতায়’ পৌঁছেছে। এ সময়ে দুই দেশের মধ্যকার লেনদেনের প্রধান অংশজুড়ে রয়েছে কানেক্টিভিটির নামে একের পর এক ভারতকে ট্রানজিট ও করিডোর সুবিধা দেয়া। দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বহুল আলোচিত সুসম্পর্কের পরিপ্রেক্ষিতে ট্রানজিট-করিডোর দেয়ার রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ও কৌশলগত ঝুঁকি সত্ত্বেও সবকিছুই একতরফাভাবে করা হয়েছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বার্থকে খুব কমই গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এছাড়া ভারতের কাছ থেকে বাংলাদেশের স্বার্থ আদায়ে বারবার ব্যর্থ হয়েছে সরকার। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ১০টি নথি ও সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বর্তমানে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের গেদে থেকে ভুটান সীমান্তবর্তী ডালগাঁও পর্যন্ত পণ্যবাহী ট্রেন চালুর বিষয়টি। অর্থাৎ দর্শনা দিয়ে ঢুকে ঈশ্বরদী-আব্দুলপুর-পার্বতীপুর হয়ে চিলাহাটি পর্যন্ত বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে ভারতীয় ট্রেনটি আবার ভারতে প্রবেশ করবে। এক্ষেত্রে সময় ও দূরত্ব কমাতে ব্যবহার করতে চায় বাংলাদেশের রেলপথ। ভারতকে রেল ট্রানজিটে সুবিধার বিনিময়ে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসারে বাংলাদেশের ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ বাংলাদেশের রেলের অবকাঠামো দেশের জনগণের অর্থে নির্মিত হয়েছে। সব ক্ষেত্রে দেশ ও জনগণের স্বার্থ গুরুত্ব পাচ্ছে কিনা তা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। বাংলাদেশের স্বার্থ সংরক্ষণ করেই ভারতের সঙ্গে সহযোগিতামূলক সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে।  

বিশ্লেষকরা বলছেন, এর আগে ট্রানজিট শুরুর পর দেখা গেল, নামমাত্র মাশুলে ভারতকে ট্রানজিট সুবিধা দেয়া হয়েছে। কলকাতা থেকে আগরতলায় পণ্য পৌঁছাতে ১ হাজার ৬৫০ কিলোমিটার দুর্গম পথ পাড়ি দিতে সময় লাগে কমপক্ষে ৩৬ ঘণ্টা। বাংলাদেশের সঙ্গে ট্রান্সশিপমেন্ট চুক্তি বাস্তবায়নের পর ২০১৬ সালে প্রথম কলকাতা থেকে আসা পণ্য আশুগঞ্জ নৌবন্দরে খালাসের পর তা স্থলপথে আগরতলায় পণ্য পরিবহনের দূরত্ব দাঁড়ায় ৩৫০ কিলোমিটার। তিন ভাগের এক ভাগ সময় এবং খরচ কমিয়ে যে সুবিধা ভারতকে দেয়া হয়েছে, তার বিনিময়ে প্রতি টনে মাত্র ১৯২ টাকা রাজস্ব আদায় করা হচ্ছে। টাকায় পরিশোধের ফলে আমাদের ডলারের রিজার্ভে কোনো প্রভাব রাখছে না।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক সুসংহত করার পাশাপাশি বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা জোরদারে ১০টি এমওইউর মধ্যে নতুন রয়েছে সাতটি এবং নবায়ন হয়েছে তিনটির। সমুদ্র অর্থনীতি ও সামুদ্রিক সম্পদ, রেলওয়ে কানেক্টিভিটি, ডিজিটাল অংশীদারত্ব, স্বাস্থ্য ও ওষুধ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, মৎস্য খাত ইত্যাদিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এমওইউগুলো সই হয়।

বর্তমানে পাঁচটি রুটে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ট্রেন চলে। তিনটি যাত্রীবাহী ইন্টারচেঞ্জ, বাকি দুটি পণ্যবাহী। বর্তমান নিয়মানুযায়ী, ভারতীয় ট্রেন সীমান্তে আসার পর বাংলাদেশী ইঞ্জিনে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে আসে। বাংলাদেশী লোকোমাস্টার (চালক) তা চালিয়ে আনেন। ফিরে যাওয়ার সময়ও একই নিয়ম অনুসরণ করা হয়। এখন ভারত পশ্চিমবঙ্গের গেদে থেকে ভুটান সীমান্তবর্তী ডালগাঁও পর্যন্ত পণ্যবাহী ট্রেন চালু করতে চায়। অর্থাৎ দর্শনা দিয়ে ঢুকে ঈশ্বরদী-আব্দুলপুর-পার্বতীপুর হয়ে চিলাহাটি পর্যন্ত বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে ভারতীয় ট্রেনটি আবার ভারতে প্রবেশ করবে। এক্ষেত্রে সময় ও দূরত্ব কমাতে ব্যবহার করতে চায় বাংলাদেশের রেলপথ। 

এ বিষয়ে আগে ভারতের পক্ষ থেকে প্রস্তাব দেয়া হলেও নয়াদিল্লির হায়দরাবাদ হাউজে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মধ্যে আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়েছে। সেখানে আগামী মাসে কোনো এক সময়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের পথ ব্যবহার করে একটি পণ্যবাহী ট্রেনের ট্রায়াল চালানোর ব্যাপারে একমত হয়েছেন। 

বস্তুত দেশের জনগণের অর্থেই রেলের উন্নয়ন হয়েছে। করের অর্থ দিয়ে রেলে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়। প্রতিবেশী কোনো দেশ যদি এসব রেলপথ ব্যবহার করতে চায়, তাহলে তাদের অবশ্যই এজন্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসারে উপযুক্ত মূল্য পরিশোধ করা উচিত। আর বাংলাদেশকে উপযুক্ত মূল্য আদায়ে তৎপর হতে হবে। এর মাধ্যমে ভারতের দূরত্ব অনেক কমে যাবে, সময় ও খরচ বাঁচবে। ভারতের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন হবে। বাংলাদেশের কতটুকু লাভ হবে তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের নিজস্ব স্বার্থ সুরক্ষার ওপর সর্বোচ্চ জোর দিতে হবে। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনায় ইউএন-এসকাপ (এশিয়া ও প্যাসিফিকের জন্য জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কমিশন) থেকে ট্রানজিট বা ট্রান্সশিপমেন্টের একটা প্রাক্কলন করে রাখা আছে। অর্থাৎ ট্রানজিটের বিনিময়ে বাংলাদেশ কী পাবে, তা প্রাক্কলন করে দেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশকে এ মানদণ্ড মেনেই চুক্তিতে যাওয়া উচিত। 

এর আগে দেখা গেছে, ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে বিদ্যমান নৌ ট্রানজিটের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মুনাফার ভাগ কম। বন্দর ব্যবহারের ক্ষেত্রেও ন্যায্য হিস্যা পাচ্ছে না বাংলাদেশ। যেহেতু বাংলাদেশ-ভারত উভয়ই স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র, ভারতকে বাংলাদেশের রেলপথ ব্যবহারের সুযোগ দেয়ার ক্ষেত্রে দেশ ও জনগণের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক আইন মেনেই তা হওয়া উচিত। 

উল্লেখ্য, সাধারণত প্রথম দেশ দ্বিতীয় দেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে যখন তৃতীয় দেশের জন্য পণ্য বহন করে নিয়ে যায়, তখন তা প্রথম দেশটির জন্য দ্বিতীয় দেশ থেকে পাওয়া ট্রানজিট সুবিধা হিসেবে বিবেচিত হয়। বাংলাদেশী ট্রাক ভারত হয়ে নেপালে গেলে তা হবে বাংলাদেশকে দেয়া ভারতের ট্রানজিট সুবিধা। এ বিবেচনায় ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে বাংলাদেশ হয়ে ভারতের ত্রিপুরায় সরাসরি সড়কপথে কিংবা ভারতের মেঘালয়ে নৌপথে পণ্য পরিবহনকেও এক ধরনের ট্রানজিট সুবিধা হিসেবে ধরা যায়। যদিও এ নিয়ে দ্বিমত আছে।৷ বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) বিধি অনুসারে, তৃতীয় দেশে পণ্য নিতে প্রথম দেশকে দ্বিতীয় দেশ ট্রানজিট সুবিধা দিতে বাধ্য হলেও একই দেশের এক স্থান থেকে আরেক স্থানের জন্য এ সুবিধা দেয়ার ক্ষেত্রে এ বাধ্যবাধকতা প্রযোজ্য নয়।৷ তবে দেশ দুটি পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে এই ট্রানজিট চালু করলে তাতে কোনো বাধা নেই।৷

গত কয়েক দশক একের পর এক ট্রানজিট করিডোরের সুবিধা ভারতের জন্য খুলে দেয়া হলেও বাংলাদেশ তেমন কোনো রাজস্ব সুবিধা পাচ্ছে না। উপরন্তু ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোয় বাংলাদেশী পণ্যের বিদ্যমান বাজার হারিয়েছে দেশের রফতানিকারকরা। হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দর, নৌবন্দর, স্থলবন্দর, সড়ক ও রেলপথের সুবিধা নিয়ে ১ হাজার ১৫০ কিলোমিটার রাস্তা কমিয়ে ৩৬ ঘণ্টার পথ ১০ ঘণ্টায় পাড়ি দিয়ে ভারত যে সুযোগ পাচ্ছে, তার বিনিময়ে নেপাল-ভুটানের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে অবাধ বাণিজ্যিক কানেক্টিভিটিতে ভারতের প্রতিবন্ধকতা এবং ট্রানজিটের মাশুল আদায়ের ক্ষেত্রে ন্যায্য মানদণ্ড নিরূপণ ও বাস্তবায়ন করতে না পারা অনেক বড় ব্যর্থতা।

এদিকে গঙ্গা-তিস্তাসহ অভিন্ন নদ-নদীর পানি বণ্টনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে ভারত বাংলাদেশের ন্যায্য দাবিকে আমলে নিচ্ছে না। অন্যদিকে ভারত সব পন্থায় বাংলাদেশের ভূমি ও অবকাঠামো ব্যবহার করে ট্রানজিট সুবিধা আদায় করে নিয়েছে। বাংলাদেশের সমুদ্র, নৌ ও স্থল ট্রানজিটের পর এবার বাংলাদেশের ভূমি ও রেলপথ ব্যবহার করে আরো ব্যাপক পরিসরে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোয় পণ্য পরিবহনে নতুন রেলপথে পরীক্ষামূলকভাবে পণ্যবাহী ট্রেন চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। 

এর মধ্য দিয়ে ভারত বাংলাদেশে মাল্টিমোডাল যোগাযোগ ও বাণিজ্যিক ট্রানজিট সুবিধা পেয়ে গেছে। এটি নিতান্তই একপক্ষীয় সুবিধা। অথচ এসব অবকাঠামো উন্নয়নে বাংলাদেশ জনগণের রাজস্ব থেকে শত শত কোটি টাকা ব্যয় করেছে। ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোয় শিল্পায়নের লক্ষ্যে ভারী শিল্পের মূলধনি যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল ও খাদ্যপণ্য পরিবহনে বাংলাদেশের অবকাঠামোর ওপর যে চাপ ও ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে, তা সংস্কারের খরচও বাংলাদেশের জনগণের করের টাকা থেকেই ব্যয় হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণে কান্ট্রি টু কান্ট্রি ট্রানজিট-ট্রান্সশিপমেন্টের জন্য প্রযোজ্য রাজস্ব আদায় করা গেলে বাংলাদেশ কিছুটা হলেও লাভবান হতে পারে।