ভাত আমাদের প্রধান খাদ্য। যে কারণে চাল নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্য হিসেবে গণ্য হয়। এক্ষেত্রে মানুষের চাহিদাকে পুঁজি করে যেকোনো সময় বাজার অস্থিতিশীলের চেষ্টাও লক্ষ করা যায়। এরই মধ্যে চালের দাম আগের তুলনায় কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। যা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব বলে খুচরা বাজারের ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে বলা হলেও পাইকারি বাজারে বেশি দাম থাকার কারণে হচ্ছে না। মূলত চাল ব্যবসায়ীদের দিকে সিন্ডিকেটের অভিযোগ তোলা হচ্ছে। পাশাপাশি সারা দেশে চাল সরবরাহের হাব নওগাঁয় অবৈধভাবে চাল মজুদ করা হচ্ছে এমন তথ্যও উঠে এসেছে।
বণিক বার্তায় প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, বাংলাদেশে প্রধান খাদ্যশস্য চালের বৃহত্তম সরবরাহ হাব উত্তরবঙ্গের জেলা নওগাঁ। স্থানীয় উৎপাদনের পাশাপাশি অন্যান্য জেলা থেকেও সেখানে প্রচুর পরিমাণে চাল সরবরাহ হয়। প্রতিবেশী ভারত থেকেও বৈধ-অবৈধ পথে অনেক চাল প্রবেশ করে। সারা দেশের বিভিন্ন স্থানে চালের সবচেয়ে বড় সরবরাহ এ জেলা থেকেই যায়। খাদ্যশস্যটির বাজার নিয়ন্ত্রণেও তাই নওগাঁর ব্যবসায়ীদের প্রভাবই সবচেয়ে বেশি।
সর্বশেষ বোরো মৌসুমে নওগাঁসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি চাল উৎপাদন হয়েছে। উৎপাদনের প্রধান মৌসুমে ধানের ভালো ফলনের কারণে বাজারে চালের সরবরাহ সংকট দেখা দেয়ার মতো পরিস্থিতি নেই বলে বাজারসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এদিকে রাশিয়া ও ইউক্রেনের উৎপাদন ও সরবরাহ নিয়ে দানাদার খাদ্যশস্যের আন্তর্জাতিক বাজার শঙ্কার মধ্যে রয়েছে। এ পরিস্থিতির সুযোগ নিতে নওগাঁর চালকল মালিকদের অনেকেই এখন নির্ধারিত সীমার অতিরিক্ত চাল মজুদ করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। খোদ নওগাঁর ব্যবসায়ীরাই বলছেন, জেলার প্রভাবশালী মিলারদের অনেকেই তাদের গুদামে চাল মজুদ করছেন। আর সেটা করতে গিয়ে সরকারের মজুদ নীতিমালাও লঙ্ঘন করা হচ্ছে।
জাতীয় সংসদে ৫ জুলাই খাদ্যদ্রব্য উৎপাদন, মজুদ, স্থানান্তর, পরিবহন, সরবরাহ, বিতরণ ও বিপণন (ক্ষতিকর কার্যক্রম প্রতিরোধ) আইন-২০২২ পাস হয়েছে। এতে অবৈধ মজুদদারদের জন্য যাবজ্জীবন সাজার বিধান রাখা হয়। এছাড়া এ ধরনের বিভিন্ন মাত্রার অনুমোদন-বহির্ভূত কার্যক্রমের জন্য রাখা হয়েছে বিভিন্ন মেয়াদি সাজা। এ নিয়ে নওগাঁর স্থানীয় চালকল মালিক ও ব্যবসায়ীরা আপত্তি তোলেন। ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারাও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেন।
এদিকে খাদ্য বিভাগের ফুড গ্রেইন লাইসেন্সের শর্ত অনুযায়ী, একজন মিলার অনুমোদিত সক্ষমতার সর্বোচ্চ দ্বিগুণ পরিমাণ চাল দুই মাস পর্যন্ত মজুদ রাখতে পারবেন। ধানের ক্ষেত্রে মজুদ করতে পারবেন অনুমোদিত সক্ষমতার তিন গুণ। সেটিও সর্বোচ্চ তিন মাস পর্যন্ত। যদিও এ নিয়মের লঙ্ঘন করেই দীর্ঘদিনের পুরনো হাজার হাজার টন চাল ও ধান মিলের গোডাউনে সংরক্ষণ করে যাচ্ছেন নওগাঁর প্রভাবশালী চালকল মালিকরা। এমনকি সরজমিনে কোথাও কোথাও গত বছর উৎপাদিত ধান-চালও এখন পর্যন্ত সংরক্ষণ করতে দেখা গেছে। মিলের গোডাউনের বাইরে অন্য স্থানেও ধান-চাল মজুদের অভিযোগ রয়েছে।
নওগাঁ শহরের খুচরা চাল ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বড় মিলাররা গুদামে হাজার হাজার টন পুরনো চাল ও ধান মজুদ করে রেখেছেন। দীর্ঘ সময় ধরে গুদামে সংরক্ষণ করায় অনেক বস্তার ধানে চারা গজিয়েছে। তাদের সিন্ডিকেটের কারণেই চালের বাজারে অস্থিরতা কাটছে না। মিল গেট থেকে বেশি দামে সরবরাহের কারণে ভোক্তা পর্যায়েও চালের দাম বেশি পড়ছে। এসব মিলারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেই চিকন চালের দাম ৫০ টাকা কেজিতে নেমে আসবে।
জানা গেছে, নওগাঁয় এ বছর বোরো, আউশ ও আমন মৌসুমে ১৬ লাখ টনের বেশি চাল উৎপাদন হয়েছে। এর মধ্যে স্থানীয় চাহিদা রয়েছে মাত্র ছয় লাখ টন। বাকি ১০ লাখ টন উদ্বৃত্ত রয়েছে। পাশাপাশি নওগাঁর বাজারে উত্তরের প্রতিবেশী অন্যান্য জেলা ও ভারত থেকেও প্রচুর চাল প্রবেশ করেছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, নওগাঁয় উৎপাদিত চালের পাশাপাশি দিনাজপুর, সিরাজগঞ্জ, রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, নেত্রকোনা ও সুনামগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে নওগাঁর চালকলগুলো ধান সংগ্রহ করে। শুধু সরকারি গুদামের জন্যই ব্যবসায়ীরা বছরে প্রায় দুই লাখ টন মোটা ধান বিভিন্ন জেলা থেকে সংগ্রহ করে। এরপর সেগুলো থেকে চাল উৎপাদন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটসহ (ব্রি) দেশী-বিদেশী কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের যৌথ গবেষণায়ও এ তথ্য উঠে এসেছে।
বোরো মৌসুমে ফলন ভালো হলে বিগত বছরগুলোয় নওগাঁর চালের বাজারে দাম কমতে দেখা গেছে। কিন্তু এবার ব্যতিক্রম দেখা যাচ্ছে। ভালো ফলন সত্ত্বেও টানা এক মাস জেলার খুচরা ও পাইকারি বাজার এবং মিল গেটে চালের দাম অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। এজন্য বড় মিলারদের সক্রিয় একটি সিন্ডিকেটকে দায়ী করে স্থানীয় খুচরা চাল ব্যবসায়ীরা অভিযোগ তুলছেন। যেহেতু নওগাঁ থেকে সারা দেশে চালের সবচেয়ে বড় সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়, সে হিসেবে জেলাটিতে চালের বাজার অস্থিতিশীল হলে সারা দেশেই এর প্রভাব পড়তে পারে। তাই মিলগুলোয় অবৈধভাবে চালের মজুদ করা হচ্ছে কিনা সেজন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা দরকার।










