খাদ্য আমাদের মৌলিক অধিকার। জনসাধারণের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের সাংবিধানিক দায়িত্ব। খাদ্য উৎপাদন, সংরক্ষণ থেকে শুরু করে বাজার ব্যবস্থাপনা পুরো বিষয়টিই শৃঙ্খলার দাবি রাখে। এক্ষেত্রে ব্যত্যয় ঘটলে দেশের মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়। ফলে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকে না। তৈরি হয় সামাজিক অস্থিরতা এবং সাধারণ মানুষের অসন্তোষ। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) ও ওপেন মার্কেট সেলসের (ওএমএস) ট্রাকের সামনে ভিড় বাড়ে নিম্ন আয়ের মানুষের। খাদ্যপণ্যের বাজারে সরবরাহ যেন স্বাভাবিক থাকে, সেজন্য নিয়মিত প্রশাসনিক তৎপরতা বজায় রাখতে হয়। কেননা এক শ্রেণীর ব্যবসায়ী অতিমুনাফার লোভে নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে বেশি পণ্য মজুদ করে রাখে। এতে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয় এবং পণ্যের বাজার অস্থির হয়ে পড়ে। 

বণিক বার্তায় প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, নির্ধারিত পরিমাণের বেশি খাদ্যদ্রব্য মজুদ করলে যাবজ্জীবন বা সর্বোচ্চ ১৪ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডের বিধান রেখে ‘খাদ্যদ্রব্য উৎপাদন, মজুদ, স্থানান্তর, পরিবহন, সরবরাহ, বিতরণ ও বিপণন (ক্ষতিকর কার্যক্রম প্রতিরোধ) বিল ২০২৩’ জাতীয় সংসদে তোলা হয়েছে। নতুন এ আইনের খসড়া আইনে পরিণত হলে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত হবে এবং অবৈধভাবে খাদ্যদ্রব্য মজুদের সুযোগ থাকবে না বলে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আশা প্রকাশ করা হয়।

১৯৫৬ সালের ফুড (স্পেশাল কোর্ট) অ্যাক্ট এবং ১৯৭৯ সালের ফুডগ্রেইনস সাপ্লাই (প্রিভেনশন অব প্রিজুডিশিয়াল অ্যাক্টিভিটি) অর্ডিন্যান্স বাতিল করে নতুন আইনটি করা হচ্ছে। বিলে বলা হয়েছে, খাদ্যদ্রব্য বলতে যেকোনো প্রকার দানাদার খাদ্যদ্রব্য যথা চাল, ধান, গম, আটা, ভুট্টা ইত্যাদি বোঝাবে। উত্থাপিত বিলে আরো বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি সরকার নির্ধারিত পরিমাণের বেশি পরিমাণ খাদ্যদ্রব্য মজুদ করলে বা মজুদসংক্রান্ত সরকারের কোনো নির্দেশনা অমান্য করলে তা অপরাধ হবে। এর শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ১৪ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড। তবে এরূপ অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি প্রমাণ করতে পারেন যে তিনি আর্থিক বা কোনো প্রকার লাভের উদ্দেশ্য ছাড়া মজুদ করেছিলেন তাহলে তিনি অনূর্ধ্ব তিন মাস কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন। এ অপরাধ জামিন অযোগ্য হবে।

আইনের উদ্দেশ্য পূরণে প্রয়োজনীয় সংখ্যক আদালত থাকবে, যেটি ‘খাদ্যদ্রব্য বিশেষ আদালত’ নামে অভিহিত হবে।  আইনটির অধীনে ভ্রাম্যমাণ আদালতেও কিছু অপরাধের বিচার করা যাবে।

কী পরিমাণ খাদ্যশস্য কতদিন মজুদ রাখা যাবে তা নির্ধারণ করে ২০১১ সালের ৪ মে গেজেট জারি করে সরকারের খাদ্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়। ওই গেজেট অনুযায়ী, লাইসেন্স ছাড়া কোনো ব্যবসায়ী এক টনের বেশি খাদ্যশস্য বা খাদ্যসামগ্রী মজুদ রাখতে পারবেন না। আর আমদানিকারক, পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ী এবং চালকল মালিকরা সরকার নির্ধারিত হারে ধান ও চাল নির্ধারিত সময়ের জন্য মজুদ করতে পারবেন। যেমন অটোমেটিক, হাসকিং ও মেজর চালকলের মালিকরা তাদের পাক্ষিক (১৫ দিন) ছাঁটাই ক্ষমতার পাঁচ গুণ ধান ৩০ দিনের জন্য মজুদ করতে পারবেন। অটোমেটিক ও মেজর চালকলের মালিকরা পাক্ষিক ছাঁটাই ক্ষমতার দুই গুণ চাল এবং হাসকিং চালকলের মালিকরা সর্বোচ্চ ১০০ টন চাল ১৫ দিন পর্যন্ত মজুদ রাখতে পারবেন। পাইকারি বিক্রেতারা সর্বোচ্চ ৩০০ টন ধান বা চাল ৩০ দিন মজুদ রাখতে পারবেন। আর খুচরা বিক্রেতারা ১৫ দিনের জন্য সর্বোচ্চ ১৫ টন এবং আমদানিকারকরা আমদানীকৃত ধান বা চালের সবটুকু ৩০ দিন পর্যন্ত মজুদ করতে পারবেন। অন্যান্য খাদ্যশস্য মজুদের ক্ষেত্রে পাইকারি বিক্রেতারা সর্বোচ্চ ২০০ টন গম বা গমজাত দ্রব্য ৩০ দিনের জন্য মজুদ করতে পারবেন। আর খুচরা বিক্রেতারা ১৫ দিনের জন্য সর্বোচ্চ ১০ টন এবং আমদানিকারকরা আমদানীকৃত সবটুকু গম এক মাস মজুদ রাখতে পারবেন। পাইকারি বিক্রেতারা সর্বোচ্চ ৫০ টন পরিশোধিত চিনি ৩০ দিনের জন্য মজুদ করতে পারবেন। আর খুচরা বিক্রেতারা ৩০ দিনের জন্য সর্বোচ্চ পাঁচ টন চিনি এবং আমদানিকারকরা আমদানীকৃত চিনির ৫০ ভাগ ৪০ দিনের জন্য মজুদ করতে পারবেন। পাইকারি বিক্রেতারা সর্বোচ্চ ৩০ টন পরিশোধিত সয়াবিন তেল ও পরিশোধিত পাম অয়েল ৩০ দিনের জন্য মজুদ রাখতে পারবেন। খুচরা বিক্রেতারা সর্বোচ্চ পাঁচ টন পরিশোধিত সয়াবিন তেল ও পরিশোধিত পাম অয়েল সর্বোচ্চ ৩০ দিন মজুদ রাখতে পারবেন। আর আমদানিকারকরা আমদানীকৃত ভোজ্যতেলের ২৫ শতাংশ মজুদ করতে পারবেন ৫০ দিনের জন্য। পাইকারি বিক্রেতারা সর্বোচ্চ ৪০ টন ডাল ৩০ দিনের জন্য মজুদ করতে পারবেন। খুচরা বিক্রেতারা ২০ দিন মজুদ রাখতে পারবেন সর্বোচ্চ পাঁচ টন ডাল। আমদানিকারকরা আমদানীকৃত ডালের ২৫ শতাংশ ৬০ দিনের জন্য মজুদ করতে পারবেন।

১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে মজুদদারি নিষিদ্ধ করে কঠোর সাজার বিধান রাখা হয়েছে। মূলত মানুষের চাহিদাকে পুঁজি করে খাদ্যপণ্য মজুদ করে রাখার প্রবণতাকে নিয়ন্ত্রণের জন্যই আইনের প্রয়োজন হয়। এক্ষেত্রে আগের আইনগুলোয় শাস্তির ব্যবস্থা থাকলেও নতুন আইনের সূত্রপাত হলো। কিন্তু শুধু আইন দিয়ে কি এ বিশৃঙ্খলার প্রতিকার সম্ভব? মোটা দাগে এ প্রশ্ন থেকে যায়। আবার আইন যথাযথভাবে প্রয়োগ না করা হলে শুধু নতুন আইন করে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল যে পাওয়া যাবে না সেটিও সহজে বোধগম্য হচ্ছে। অর্থাৎ আইন যে রয়েছে সেটি নিয়ে ব্যাপক প্রচার ও আইনের ওপর ভিত্তি করে তৎপরতা চালাতে হবে। না হলে আইন শুধু আইন হিসেবেই রয়ে যাবে। বাজার ব্যবস্থাপনায় বিশৃঙ্খলার ফলে জনগণের খাদ্যনিরাপত্তাও অর্জিত হবে না।

এটা সত্য, ব্যবসায়ীরা ব্যবসার জন্য খাদ্য মজুদ করবে এটি খুব স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু সেটি যদি নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি হয় এবং পণ্য মজুদের মাধ্যমে বাজারে কৃত্রিম সংকটের উদ্দেশ্যে হয়ে থাকে তাহলে তা অবশ্যই শাস্তিযোগ্য হবে। এক্ষেত্রে জড়িতদের ছাড় দেয়া যাবে না। এবং কেউ যেন অবৈধ মজুদদারি না করতে পারে, সেজন্য নিয়মিত বাজার তদারকি করতে হবে।

উন্নত রাষ্ট্রগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনে খাদ্যপণ্যের বাজার ব্যবস্থাপনার জন্য সরকারের কঠোর ভূমিকা রয়েছে। দেশগুলোতে কেউ যেন ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে অতিরিক্ত খাদ্য মজুদ না করতে পারে, এজন্য কঠোর তদারকি চালানো হয়। আমাদের দেশেও আইনের সঠিক প্রয়োগ হলে খাদ্যপণ্যের বাজারে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা যাবে সে আশা করা যায়। একটি বিষয় অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে যে খাদ্যনিরাপত্তাকে প্রাধান্য দেয়ার বিকল্প নেই। কারণ দেশের মানুষের জন্য খাবারের সহজপ্রাপ্যতা যদি নিশ্চিত না করা যায়, তাহলে সব অর্জনই ম্লান হয়ে যাবে। এজন্য খাদ্য সরবরাহ চেইনকে স্বাভাবিক রাখতে হবে। এছাড়া খাদ্যনিরাপত্তার জন্য টিসিবিকে আরো কার্যকর করার কোনো বিকল্প নেই। আমরা আশা করব, দেশের সাধারণ মানুষের কথা ভেবে খাদ্য মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। সবার জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাদ্য যেন নিশ্চিত হয়, এক্ষেত্রে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্যের বাজার মনিটরিং অব্যাহত রাখতে হবে। খাদ্যপণ্যের অবৈধ মজুদদারি বন্ধে যে নতুন আইন করা হয়েছে, সেটির যথাযথ প্রয়োগ হোক, সাধারণ মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত হোক, এটিই আমাদের কাম্য।