দেশের জনসংখ্যা বাড়লেও রেলের পরিধি সে অনুপাতে বাড়েনি। বাড়ানো হয়নি রেলসেবাও। বলা বাহুল্য, যাত্রীসংখ্যা ও চাহিদা অনুসারে পরিবহনসেবা দিতে সমর্থ নয় রেল খাত। যদিও এ খাতে বিনিয়োগের তেমন কোনো ঘাটতি নেই। গত আড়াই দশকে মোটা অংকের বিনিয়োগ পেয়েছে রেল খাত। তবুও সেবার পরিসর বাড়েনি, উল্টো সম্প্রতি সেবা সংকোচনের পথে হাঁটছে তারা। এমনকি ২৬ বছর ধরে লোকসান করে চলেছে রেলওয়ে।
২০০৯-এর জানুয়ারি থেকে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত বাস্তবায়ন করা হয় ৮৩টি উন্নয়ন প্রকল্প। এতে ব্যয় হয় ২০ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকা। এর পরও ‘বাংলাদেশ ইকোনমিক রিভিউ ২০২৩’-এর তথ্যমতে, ২০২০-২১ বছরে সব মিলিয়ে ২ হাজার ১০২ কোটি টাকা লোকসান করেছে সংস্থাটি। বিপুল বিনিয়োগের পরও কেন রেলসেবার পরিসর না বেড়ে সংকুচিত হচ্ছে কিংবা কেন লোকসান কাটিয়ে উঠতে ব্যর্থ হচ্ছে—এসব প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়ালে রেলওয়ের দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার বিষয়টিকে অগ্রাহ্য করা যায় না।
বণিক বার্তার প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, সারা দেশকে রেল নেটওয়ার্কের আওতায় নিয়ে আসতে নতুন নতুন রেলপথ নির্মাণ, ট্র্যাক সংস্কারসহ বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন হলেও সেবা বৃদ্ধির পরিবর্তে বাংলাদেশ রেলওয়ে সেবা সংকোচনের চিন্তা করছে। সর্বশেষ চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে একটি চলমান সেবা বন্ধের পাশাপাশি আরো বেশকিছু ট্রেন বন্ধের পরিকল্পনা রয়েছে রেলওয়ের। প্রতি বছর নতুন রেলপথ নির্মাণের উদ্বোধন ও ট্রেনসেবা শুরু করলেও চাহিদা অনুযায়ী ইঞ্জিন আমদানি করা হয় না। উপরন্তু সংকটের মধ্যেও যথাসময়ে জনবল নিয়োগ না দেয়া, সাধারণ ও অত্যাবশ্যকীয় কর্মীদের পদোন্নতি টানা কয়েক বছর ধরে বন্ধ রাখায় দফায় দফায় ট্রেনসেবা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছে রেলওয়ে। রেলওয়ের এমন কার্যকলাপ তাদের অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির স্বরূপকেই দৃশ্যমান করে।
২৬ বছর আগেও বাংলাদেশ রেলওয়ে ছিল একটি লাভজনক সংস্থা। যাত্রী ও পণ্য পরিবহন করে সংস্থাটি যে টাকা আয় করত, তা দিয়ে ট্রেন পরিচালনার সব ব্যয় মেটানোর পরও কিছু টাকা উদ্বৃত্ত থাকত। ১৯৯৮-৯৯ অর্থবছরে সংস্থাটিতে এমন উদ্বৃত্ত ছিল প্রায় সাড়ে ১৮ কোটি টাকা। ওই অর্থবছর সংস্থাটির অপারেটিং রেশিও ছিল ৯৫ দশমিক ৯ শতাংশ। অর্থাৎ ওই অর্থবছরে প্রতি ১ টাকা আয় করতে গিয়ে রেলওয়ের ব্যয় হয়েছিল ৯৫ দশমিক ৯ পয়সা। পরবর্তী সময়ে অপারেটিং রেশিওর এ হার আর ধরে রাখতে পারেনি সংস্থাটি। বর্তমানে প্রতি ১ টাকা আয় করতে গিয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের খরচ হয় প্রায় ২ টাকা ৭৮ পয়সা। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিপুল বিনিয়োগের পরও সেবার পরিধি বাড়াতে না পারা ও আয়-ব্যয়ের ক্রমবর্ধমান ফারাকের কারণ মূলত দুর্নীতি এবং অদক্ষ ব্যবস্থাপনা। রেলের দুর্নীতি-অনিয়ম বন্ধ ও সুব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা না গেলে সেবার মানোন্নয়ন করা কঠিন হয়ে পড়বে।
রেলের পরিবহন বিভাগ ও ওয়ার্কিং টাইম টেবিলের তথ্যমতে, ২০১৯ সালে কভিড-১৯ কালীন বন্ধের পর অন্তত ১০৫টি মেইল, এক্সপ্রেস, কমিউটার জাতীয় দ্বিতীয় শ্রেণীর ট্রেন বন্ধ (উভয় অঞ্চল) করে দেয় রেলওয়ে। পূর্বাঞ্চলে ৫৬টি ট্রেন আজও চালু করেনি। এছাড়া পূর্বাঞ্চলে লোকোমাস্টার ও সহকারী লোকোমাস্টার প্রয়োজন ১ হাজার ২৫৪ জন। বর্তমানে আছেন ৫৪৯ জন। পদ খালি রয়েছে ৭০৫টি। এরপর সাময়িকভাবে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে ৩০টি ইঞ্জিন আমদানি হলেও কয়েক বছরের মধ্যে এসব ইঞ্জিনের অধিকাংশই এখন অকেজো হয়ে পড়েছে। এছাড়া নতুন আমদানি করা ৩০০০ সিরিজের আটটি ইঞ্জিন দীর্ঘদিন ধরে চারটির পরিবর্তে দুটি মোটরে চলাচল করছে। যার কারণে এসব ইঞ্জিনের গতি কমে নেমে এসেছে প্রতি ঘণ্টায় ২০-৩০ কিলোমিটারের মধ্যে। আবার রেলের তথ্যমতে, পূর্বাঞ্চল রেলে প্রতিদিন ইঞ্জিনের চাহিদা ১১৬টি। প্রকৌশল বিভাগ প্রতিদিন ১০০ (কম-বেশি) ইঞ্জিন সরবরাহ করেছে বা করতে পারবে বলে জানালেও প্রকৃতপক্ষে ইঞ্জিন পাওয়া যায় ৮৫টি। এর মধ্যে ট্রেন দুর্ঘটনার কারণে চারটি ইঞ্জিন ব্যবহার উপযোগী নয়। আবার ঢাকা-কক্সবাজার রুটে দুটি এবং ঢাকা-বুড়িমারী রুটে একটি নতুন আন্তনগর ট্রেন চালু হয়েছে। এই তিন জোড়া ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক রাখতে ৫টি ইঞ্জিনের প্রয়োজন। ফলে জোড়াতালি দিয়ে ট্রেন পরিচালনা করা
একদিকে দীর্ঘদিনের পুরনো ও মেয়াদোত্তীর্ণ ইঞ্জিন, অন্যদিকে যথাসময়ে নতুন করে ইঞ্জিন আমদানি না হওয়ায় নিয়মিত সেবা প্রদানে হিমশিম খাচ্ছে রেলওয়ে পরিবহন বিভাগ। এছাড়া আছে লোকবল সংকট। পাশাপাশি এমন অনেক রেলপথ আছে যেখানে ট্রেন চলাচলের মতো অবস্থা নেই। তার পরও প্রকল্প ব্যয় দেখাতে নামেমাত্র ট্রেন সেবা চালু রাখা হয়। সুপরিকল্পনা ছাড়া কেবল বিনিয়োগ সুফল আনতে পারে না—রেলওয়ের অব্যবস্থাপনা সেটিরই নজির হয়ে দাঁড়িয়েছে বলা যায়।
যাত্রীবাহী ট্রেন পরিচালনায় বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির পাশাপাশি বাংলাদেশ রেলওয়ের অনিয়ম-দুর্নীতির একাধিক খাত চিহ্নিত করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। খাতগুলো হলো সম্পত্তি ইজারা ও হস্তান্তর, অবৈধ স্থাপনা তৈরি, কেনাকাটা, ভূমি অধিগ্রহণ, যন্ত্রাংশ নিলাম, টিকিট বিক্রি, ট্রেন ইজারা, ক্যাটারিং ইত্যাদি। দুর্নীতি বন্ধ করা গেলে ট্রেন পরিচালনার ব্যয় ও আয়ের মধ্যে ব্যবধান অনেকটাই যেমন কমিয়ে আনা সম্ভব, তেমনি সেবার পরিধিও বাড়ানো সম্ভব বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। পাশাপাশি বিদ্যমান সম্পদগুলো সুষ্ঠু ব্যবহার করে রেলকে সহজেই লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা সম্ভব। তাই বিদ্যমান অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। একই সঙ্গে কাজ করতে হবে সেবার মান বাড়ানোর।
কোনো দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে সাশ্রয়ী ও তুলনামূলক নিরাপদ পরিবহন ট্রেন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিসরে এটি একটি জনপ্রিয় পরিবহন। আর আমাদের মতো সীমিত সম্পদ কিন্তু জনসংখ্যার আধিক্যের দেশে ট্রেন কেবল জনপ্রিয়ই নয়, গণপরিবহন হিসেবে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। যাতায়াত, মালামাল পরিবহন থেকে শুরু করে কর্মসংস্থানের অন্যতম মাধ্যম রেল খাত। অথচ বাংলাদেশ রেলওয়ে চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। ইদানীং ট্রেন দুর্ঘটনাও বেড়েছে। আর টিকিট কালোবাজারিও যেন স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিপুল বিনিয়োগের পরও কেন বর্তমানে রেলওয়ের এ অবস্থা, প্রকল্পগুলোর ফাঁকফোকর কোথায় তা তদন্ত করে খুঁজে বের করা দরকার। প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা অতি আবশ্যক। বিশেষ করে রেলের যাবতীয় আয়-ব্যয় হিসাব নিরপেক্ষ ও নিবিড় নিরীক্ষার মাধ্যমে রেলের লোকসানের কারণ খুঁজে বের করতে হবে। এজন্য জরুরি ভিত্তিতে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানটির সামগ্রিক কার্যক্রম জবাবদিহির আওতায় নিয়ে আসা দরকার। অন্যথায় লোকসানের এ ধারা অব্যাহত থাকলে সেবার পরিধি বিস্তৃত হবে না। সেই সঙ্গে দুর্নীতিকারীদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি যেসব রেল কর্মচারী দায়িত্বে অবহেলা করে তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। কেবল অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে সেবা বৃদ্ধি করা যায় না যদি না তা সঠিকভাবে পরিচালিত হয়। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে এ পর্যন্ত রেল খাতের অনেক উন্নতি সাধন হয়েছে ঠিকই, তবে সেবার মান্নোয়নে দূর করতে দুর্নীতি ও অব্যস্থাপনা দূর করা ছাড়া উপায় নেই।










