জনমিতিক লভ্যাংশ অর্জনের অতি গুরুত্বপূর্ণ খাত হলো দক্ষ জনশক্তি রফতানি। প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের অন্যতম উৎস। প্রবাসে কর্মীদের দক্ষতা অনুযায়ী আয়ের পরিমাণ নির্ধারিত হয়ে থাকে। সে বিচারে বাংলাদেশী প্রবাসীদের আয় কম। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) বিশ্ব অভিবাসন প্রতিবেদন ২০২৪ অনুযায়ী, অভিবাসীর উৎস ও রেমিট্যান্স পাওয়া দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান যথাক্রমে ষষ্ঠ ও অষ্টম। অন্যদিকে অভিবাসী শ্রমিক পাঠানো ও রেমিট্যান্স আয়ের ক্ষেত্রে পাকিস্তান যথাক্রমে সপ্তম ও ষষ্ঠ এবং ফিলিপাইন যথাক্রমে নবম ও চতুর্থ স্থানে রয়েছে। এ তথ্য স্পষ্টভাবে জানাচ্ছে যে বিপুলসংখ্যক জনশক্তি বিদেশে পাঠানোর পরও দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ কম। ২০২২ ও ২০২৩ সালে বাংলাদেশ থেকে ১০ লাখের বেশি মানুষ প্রবাসে গেলেও রেমিট্যান্সের প্রবাহ ২১-২২ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। আর এর পেছনে অন্যতম কারণ অদক্ষ জনশক্তি রফতানি। যদিও প্রশিক্ষিত মানবসম্পদ রফতানির লক্ষ্যে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) অধীনে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিষ্ঠা করা হয় ১০৪টি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (টিটিসি) ও ছয়টি ইনস্টিটিউট অব মেরিন টেকনোলজি (আইএমটি)।
বণিক বার্তার প্রতিবেদন বলছে, সরকারি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থান উপযোগী ৫৫টি ট্রেডে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। এর মধ্যে ২০২২-২৩ অর্থবছরেই প্রশিক্ষিত করা হয়েছে পৌনে ১২ লাখের বেশি কর্মীকে। তবে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, সংশ্লিষ্ট কাজে কোনো প্রশিক্ষণ ছাড়াই বিদেশ পাড়ি জমাচ্ছেন দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ কর্মী। বিএমইটির তথ্যমতে, গত বছর বিশ্বের ১৩৭টি দেশে বাংলাদেশের ১৩ লাখ কর্মীর কর্মসংস্থান হয়েছে। এর মধ্যে দক্ষ অভিবাসন ছিল প্রায় ২৫ শতাংশ এবং অদক্ষ শ্রমিক ছিলেন প্রায় ৫০ শতাংশ। স্বাভাবিকভাবেই অদক্ষ শ্রমিকের এ পরিসংখ্যান সরকারি টিটিসি ও আইএমটির প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। তাদের প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার মূল্যায়ন ও নিয়মিত তদারকি আবশ্যক। দেশে কেবল প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সংখ্যা বেড়েছে, সে অনুপাতে বাড়েনি দক্ষ কর্মীর সংখ্যা। ফলে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে প্রতিযোগী দেশগুলোর দক্ষ কর্মীদের অংশীদারত্ব বাড়ছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সরকারকে বাজার চাহিদাভিত্তিক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থায় জোর দিতে হবে।
চার দশক আগে বাংলাদেশ জনশক্তি রফতানি শুরু করে সরকার। আশির দশকে কিছুটা ধীরগতি দেখা গেলেও নব্বইয়ের দশক থেকে আবার তা ক্রমবর্ধমান হারে বাড়তে থাকে। কিন্তু এ চার দশকে দক্ষ জনশক্তির তুলনায় অদক্ষ জনশক্তিই বেশি রফতানি করতে হয়েছে সরকারকে। ফলে সংখ্যার দিক থেকে রফতানি বাড়লেও দক্ষ কর্মী পাঠানোর হার বাড়েনি। বিবিএসের আর্থসামাজিক ও জনমিতিক জরিপ ২০২৩-এর তথ্যমতে, প্রতি বছর প্রায় ৯০ শতাংশ কর্মীই বিদেশ যাচ্ছেন কোনো প্রশিক্ষণ ছাড়া। অভিবাসীদের মধ্যে মাত্র ১০ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ বিদেশ পাড়ি জমানোর আগে কর্মসংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে থাকেন। এর মধ্যে আবার ৪৭ দশমিক ৬৬ শতাংশই দক্ষতা অর্জন করেন বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে। অর্থাৎ সরকারি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলো দক্ষ কর্মী তৈরি ও রফতানিতে পিছিয়ে আছে।
আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ কর্মী প্রশিক্ষণের গুরুত্ব অনুধাবন করে প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনায় জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আইন, ২০১৮ অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা করা হয়, যার কার্যক্রম শুরু হয়েছে ২০১৯ সালে। বাংলাদেশের দক্ষতা উন্নয়ন ও ইকোসিস্টেমের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তনের লক্ষ্যে গঠিত প্রতিষ্ঠানটির গভর্নিং বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রধানমন্ত্রী। জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন নীতি, কৌশল ও কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করে এ প্রতিষ্ঠান। যুবকদের যুবশক্তিতে রূপান্তরই এ প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্য। বিএমইটি টিটিসি প্রকল্পটির ওপর সরকারের মনিটরিং প্রতিষ্ঠান বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রভাব মূল্যায়ন সমীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, যুগোপযোগী প্রায়োগিক প্রশিক্ষণের অভাব, ব্যবহারিক বিদ্যার সুযোগ না থাকা, প্রশিক্ষক সংকটসহ নানা জটিলতায় সরকারের উদ্দেশ্য পূরণে ব্যর্থ এই টিটিসিগুলো। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিএমইটি এবং এর সহযোগী সংস্থাগুলোর সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার অভাবে বিদ্যমান প্রশিক্ষণ সুবিধাগুলোর কার্যকারিতা নেই। প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন প্রয়োজন; চাহিদাভিত্তিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
দক্ষ কর্মী প্রেরণের হার বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোকে তথ্যপ্রযুক্তির উৎকর্ষে অগ্রগামী করে গড়ে তুলতে হবে। তাদের সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রস্তুত করা প্রয়োজন। এজন্য ব্যবহারিক শিক্ষায় সর্বাধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করতে হবে। আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলো ঢেলে সাজাতে হবে। যাতে প্রশিক্ষিত কর্মীরা আন্তর্জাতিক শ্রমবাজার উপযোগী প্রশিক্ষিত হন। স্থানীয় শ্রমবাজারে প্রশিক্ষণার্থীদের কর্ম উপযোগী করতে হলে দেশীয় শিল্পোদ্যোক্তাদের সঙ্গে পরামর্শ করে তাদের চাহিদার নিরিখে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। ইন্টার্নশিপের ব্যবস্থা করে প্রশিক্ষণার্থীদের ব্যবহারিক শিক্ষাকে আরো দক্ষ, কার্যকর ও শাণিত করে তুলতে হবে। একই সঙ্গে তাদের শিক্ষক ও প্রশিক্ষকদেরও দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য সরকারের পক্ষ থেকে সামষ্টিক উদ্যোগ জরুরি। পাশাপাশি এটিও দেখতে হবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কতজন বিদেশে যাচ্ছেন।
বিএমইটি কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে বাংলাদেশ প্রায় ১১ দশমিক ৩৭ লাখ কর্মী বিদেশে পাঠিয়েছিল। কিন্তু ওই বছর কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর সংক্ষিপ্ত কোর্সের অধীনে মাত্র ১ দশমিক ২০ লাখ লোক প্রশিক্ষণ পেয়েছে। যদিও তাদের মধ্যে কতজন প্রশিক্ষণ পেয়ে ওই বছরই বিদেশে গেছেন সেটি কর্তৃপক্ষের অজানা। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলো সক্ষমতার অতিরিক্ত মানুষকে প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে বলে দক্ষ কর্মী তৈরিতে ব্যর্থ হয়। সুতরাং শুরুতেই প্রকৃতপক্ষে কারা বিদেশগামী, তাদের অগ্রাধিকার দেয়া গেলে এ সমস্যা দূর হতে পারে। এজন্য কতজন প্রশিক্ষণ পেয়ে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন সে হিসাব রাখাটিও জরুরি।
বিদেশে চাকরিপ্রত্যাশীদের ওয়ান-স্টপ পরিষেবার ডিজিটাল প্লাটফর্ম ‘আমি প্রবাসী’ অ্যাপ্লিকেশনের অনলাইন নিবন্ধন তথ্য অনুসারে, ২২ লাখেরও বেশি ব্যক্তি প্রবাসে কর্মসংস্থানের জন্য নতুন করে নিবন্ধন করেছেন। তাদের মধ্যে ৭২ শতাংশ মাধ্যমিকের পাঠ সম্পন্ন করেননি। এসব ব্যক্তির সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত চাকরির মধ্যে রয়েছে শ্রম, সাধারণ কর্মী, পরিচ্ছন্নতা কর্মী, হোটেল বয়, বিক্রয়কর্মী এবং নির্মাণ শ্রমিক। দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে হলে কেবল প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের ওপর চাপ দেয়াটা সমীচীন হবে না। কর্মমুখী কারিগরি শিক্ষা এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাই জাতীয় শিক্ষানীতি যুগোপযোগী করার বিষয়টিও আমলে নিতে হবে। গোড়ায় গলদ রেখে গৃহীত প্রকল্প থেকে ফলপ্রসূ সমাধান পাওয়া বেশ কঠিন।










