বাংলাদেশের অর্থনীতিকে স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে গড়ে তুলতে হলে দেশীয় শিল্পের বিকাশে গুরুত্ব দিতে হবে। বিভিন্ন ঋণদান সংস্থা থেকে ঋণের পরিমাণ ক্রমেই বাড়ছে। তবে যেসব ঋণ নেয়া হচ্ছে তার সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করা দরকার। দেশের রিজার্ভ নিয়ে চাপের মধ্যেই ঋণ পরিশোধের দায়ের ব্যবধানও বাড়ছে। এর সঙ্গে পাঁচ বৃহৎ প্রকল্পের গ্রেস পিরিয়ড শেষে বর্ধিত ঋণ দায় দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির ভারসাম্যকে আরো চাপে ফেলতে পারে। ঋণ পরিশোধের দায় ও চাপ এভাবে বেড়ে যাওয়ার অর্থ হলো রিজার্ভ সংকট আরো ঘনীভূত হওয়া। দেশের রাজস্ব, রেমিট্যান্স ও রফতানি কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বাড়ছে না। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের রাজস্ব আহরণ খুবই কম। তাই সরকারের ঋণ পরিশোধের চাপ কমাতে রাজস্ব আহরণ, রফতানি ও রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে এসব খাতের উন্নয়নে প্রয়োজন পরিকল্পনামাফিক পদক্ষেপ।
ঢাকা থেকে পদ্মা সেতু হয়ে যশোর পর্যন্ত ১৬৯ কিলোমিটার দীর্ঘ রেলপথটি নির্মাণ হচ্ছে। ঋণ পরিশোধে নির্ধারিত পাঁচ বছরের গ্রেস পিরিয়ড এরই মধ্যে শেষ হয়েছে। তবে এখনো এর ঋণ পরিশোধ শুরু হয়নি। আসন্ন ২০২৪-২৫ অর্থবছর থেকে ১৫ বছর ধরে এ ঋণ ও ঋণের সুদ পরিশোধ করতে হবে সরকারকে। ঢাকা পাওয়ার নেটওয়ার্ক ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের নেটওয়ার্ক শক্তিশালীকরণে গৃহীত প্রকল্পেরও গ্রেস পিরিয়ড আগামী মাসে শেষ হবে। এ প্রকল্পের জন্য নেয়া ১ বিলিয়ন ডলারের ঋণ ও ঋণের সুদ পরিশোধ শুরু হবে। শেষ হতে যাচ্ছে প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন (পিইডিপি-৪) প্রকল্পের গ্রেস পিরিয়ডও। এছাড়া আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ও রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতো বৃহৎ প্রকল্পগুলোর গ্রেস পিরিয়ড আগামী দুই বছরের মধ্যে শেষ হতে যাচ্ছে। এর সঙ্গে সঙ্গে বড় হতে যাচ্ছে সরকারের ঋণ পরিশোধের দায়ও। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) পরিসংখ্যান বলছে, ২০২১-২২ অর্থবছরে সরকারের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের দায় ছিল ৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন (৩০৬ কোটি) ডলার। আগের দুই অর্থবছরেও তা ৩ বিলিয়নের ঘরেই ছিল। কিন্তু ২০২২-২৩ অর্থবছরে এ বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের দায় ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন (৪৭০ কোটি) ডলারে পৌঁছেছে। এর মধ্যে শুধু সুদই পরিশোধ করতে হয়েছে ১ বিলিয়ন (১০০ কোটি) ডলারের বেশি।
বৈদেশিক ঋণের দায় পরিশোধ ও অর্থনীতির ঝুঁকি এড়াতে রফতানি বৈচিত্র্যকরণ ও রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়াতে হবে। বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার প্রধান উৎস রফতানি ও রেমিট্যান্স। যদিও রফতানি ও রেমিট্যান্স কাঙ্ক্ষিত হারে বাড়ছে না। তাই রফতানি ও রেমিট্যান্স বাড়াতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে। তবে বাস্তবতা হলো রফতানি নির্ভরশীল হয়ে আছে একটি পণ্যের ওপর, যা অত্যন্ত ঝুঁকির বিষয়। তাই রফতানি আয় বাড়াতে হলে পোশাকের বাইরে চামড়া, ওষুধ ও কৃষিপণ্যের মাধ্যমে বহুমুখীকরণ করতে হবে। নতুন বাজার খুঁজতে হবে। বেশি মূল্যের পণ্য বিশেষ করে প্রযুক্তিনির্ভর পণ্য উৎপাদন ও রফতানি করতে হবে।
দেশে আরেকটি বড় সমস্যা হলো এখনো অনেক রেমিট্যান্স আসছে অবৈধভাবে হুন্ডির মাধ্যমে। এসব রেমিট্যান্স প্রাতিষ্ঠানিক চ্যানেল বা ব্যাংক চ্যানেলে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। যদিও অবৈধ হুন্ডি লেনদেনের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থার নেয়ার কথা জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। চলতি বছরের ৯ মে জাতীয় সংসদে এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, অবৈধ হুন্ডির মাধ্যমে লেনদেনসংক্রান্ত অভিযোগে ৫ হাজার ৭৬৬ জন এজেন্টের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য তাদের তথ্য সিআইডিতে পাঠানো হয়েছে। তার মধ্যে হুন্ডি লেনদেনে জড়িত সন্দেহে ৫ হাজার ২৯টি মোবাইল আর্থিক সেবা (এমএফএস) এজেন্টশিপ বাতিল করা হয়েছে। হুন্ডি কমানোর জন্য কিন্তু অনেক আইনকানুন আছে। হুন্ডি একেবারে নির্মূল করা কঠিন হলেও কমানো সম্ভব। তবে এদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন।
আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা দরকার, দীর্ঘদিন ধরে ডলারের বিনিময় হারকে ধরে রাখা হয়েছে। যদিও সম্প্রতি ডলারের বিনিময় হার ১১৭ টাকা নির্ধারণ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে ডলারের বিনিময় হারকে আরো আগেই বাজারের ওপর ছেড়ে দেয়া দরকার ছিল। তাহলে হয়তো হুন্ডিওয়ালাদের দৌরাত্ম্য এত বাড়ত না।
দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়াতে হলে বাইরে দক্ষ জনশক্তি পাঠাতে হবে। তবে বর্তমানে যারা দেশের বাইরে যাচ্ছে তাদের সিংহভাগই শ্রমিক। প্রশিক্ষণের অভাবে তাদের দেশের বাইরে গিয়ে নানা প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পড়তে হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে বিদেশে যাওয়া কর্মীদের ৬২ শতাংশ অদক্ষ, ৩৬ শতাংশ আধা দক্ষ ও ২ শতাংশ মাত্র অতিদক্ষ। যে কারণে এসব কর্মীর মজুরিও কম। তাই এ মানবসম্পদকে দক্ষ জনসম্পদে পরিণত করতে হলে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী সব ধরনের টেকনিক্যাল বা কারিগরি, ইঞ্জিনিয়ারিং, মেডিকেল ও নার্সিং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে। এসব প্রতিষ্ঠানের প্রশিক্ষণ প্রদান পদ্ধতি তথা সার্টিফিকেট যেন লেবার রিসিভিং কান্ট্রিগুলো আস্থায় নেয়। তা না হলে উন্নত দেশগুলোয় ডাক্তার, নার্স, ইঞ্জিনিয়ার ও বিভিন্ন কারিগরি জ্ঞানসমৃদ্ধ দক্ষ জনশক্তির বিপুল চাহিদা থাকলেও তারা বাংলাদেশ থেকে এ ধরনের জনশক্তি নেবে না। তাই বিষয়টির প্রতি অধিকতর নজর দিয়ে এবং বিশ্ব চাহিদা ও মান অনুযায়ী প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি তৈরির জন্য উল্লেখযোগ্য অবকাঠামোসহ প্রশিক্ষকের ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
এছাড়া সংশ্লিষ্ট দেশের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে হবে। সারা বিশ্বে এখন দক্ষ জনশক্তি প্রেরণের প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। এ প্রতিযোগিতায় টিকতে হলে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী দক্ষ জনশক্তি পাঠানোর কোনো বিকল্প নেই। বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নিরাপদ, সুষ্ঠু ও নিয়মতান্ত্রিক অভিবাসন নিশ্চিত করা। নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করতে কূটনৈতিক তৎপরতা আরো জোরদার করতে হবে। আর প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ শ্রমিক বিদেশে পাঠানো গেলে বেশি পরিমাণ রেমিট্যান্স আসবে বলে আশা করা যায়।
বর্তমানে দেশে কর-জিডিপির অনুপাত ৭ দশমিক ৬ শতাংশ। কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে হলে রাজস্ব খাত সংস্কার করতে হবে। বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে হলে সর্বনিম্ন ১০ শতাংশ কর-জিডিপির অনুপাত থাকা প্রয়োজন। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে কর-জিডিপির অনুপাত সবচেয়ে কম। বর্তমানে বাংলাদেশে কর-জিডিপি অনুপাত সোমালিয়া বা ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোর কাছাকাছি। কর আহরণ বাড়াতে হলে কর ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তন আনতে হবে। এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলও (আইএমএফ) বিভিন্ন নির্দেশনা দিয়েছে। তাই কর প্রশাসনকে ঢেলে সাজাতে হবে। পাশাপাশি কর আহরণ ব্যবস্থাকে ডিজিটাইজেশনের আওতায় আনাও জরুরি।
তবে আমাদের সম্প্রসারণমূলক মুদ্রানীতি দরকার। সরকারি আয়-ব্যয় রাজস্ব দ্বারা পরিচালিত হলেও এর অনেক সীমাবদ্ধতা আছে। প্রথমেই যে বিষয়টি আসে তা হলো রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্র হবে কোনটা। প্রত্যক্ষ করের মাধ্যমে নাকি পরোক্ষ করের মাধ্যমে রাজস্ব আহরণ করা হবে? এ ব্যাপারে অনেক আলোচনা আছে। তবে অর্থনীতিবিদদের পরমার্শ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) প্রত্যক্ষ কর আদায়ে আরো বেশি জোরালো ভূমিকা নিতে হবে। এ খাতে দুর্নীতি কমিয়ে আনতে হলে কর আদায়ের ব্যবস্থাও সহজীকরণ জরুরি। বিদ্যমান ব্রিটিশ পদ্ধতিতে কর আদায় অব্যাহত থাকলে তা কর আহরণে সুফল দেবে না।
বহুমুখী ঋণদান সংস্থার ঋণ ও সুদ পরিশোধ এবং ভবিষ্যৎ ঝুঁকি কমাতে হলে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের বিকল্প নেই। তাই বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের জন্য দেশের রফতানি খাতকে আরো প্রসারিত করতে হবে। প্রযুক্তিনির্ভর মূল্যবান পণ্য উৎপাদন ও রফতানিতে গুরুত্ব দিতে হবে। দেশের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় এসব বিষয়কে মাথায় রেখেই অর্থনৈতিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। এছাড়া ঋণ পরিশোধের জন্য বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ বাড়াতে না পারলে দেশের আর্থিক খাত ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে যেসব ঋণ নেয়া হয়েছে তা সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে, তা না হলে দীর্ঘমেয়াদে ঋণের দায় দেশের সাধারণ জনগণকে বহন করতে হবে। এতে সাধারণ মানুষের জীবন আরো দুর্বিষহ হয়ে উঠতে পারে। তাই ঋণ পরিশোধের ঝুঁকি এড়াতে আমাদের রাজস্ব আহরণ, রফতানি ও রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়াতে হবে।










