দেশে বিপুল পরিমাণ খনিজ সম্পদ মজুদ থাকলেও তা উত্তোলনে পর্যাপ্ত সরকারি উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয় না। অথচ বাংলাদেশ একটি স্বল্পোন্নত দেশ এবং এ দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি শিল্প খাত। আর শিল্প খাতের কাঁচামাল বিভিন্ন খনিজ উপাদান আমদানি করতে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়। তাই দেশজ খনিজ সম্পদের যথাযথ উত্তোলন নিশ্চিত করলে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হতো এবং একই সঙ্গে তা বাড়তি বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের উপায় হতো।
বণিক বার্তায় প্রকাশ, দেশে মজুদ প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যতীত অন্যান্য মজুদ খনিজ সম্পদের বাজারমূল্য প্রায় ২ দশমিক ২৬ ট্রিলিয়ন ডলার বা ২ লাখ ২৬ হাজার কোটি ডলার। বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তর (জিএসবি) তাদের জরিপের তথ্যাদি পর্যালোচনাপূর্বক এ মূল্য নিরূপণ করেছে। সংস্থাটির হিসাবের সঙ্গে প্রাকৃতিক গ্যাসের মূল্যকে বিবেচনায় নেয়া হলে দেশে মজুদ খনিজ সম্পদের নিরূপিত মূল্য আরো কয়েক ট্রিলিয়ন ডলার বাড়বে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
জিএসবি মহাপরিচালক মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসেনের মতে, মজুদ এ খনিজ সম্পদের প্রকৃত মূল্য জানতে পরিপূর্ণ ফিজিবিলিটি স্টাডি প্রয়োজন। জিএসবি মহাপরিচালক বলেছেন, ফিজিবিলিটি স্টাডি হলে তখন অর্থের পরিমাণ আরো বাড়তে বা কমতেও পারে।
কিন্তু আক্ষেপের বিষয় হচ্ছে, সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকরা বলছেন যে মজুদ বিপুল পরিমাণ খনিজ সম্পদ উত্তোলনে সরকারের তেমন কোনো আগ্রহ দেখা যায়নি। যে কারণে এ খাতে বিনিয়োগের পরিমাণও বছরের পর বছর ধরে সামান্যই থেকে গেছে।
এক্ষেত্রে খনিজ সম্পদের অর্থমূল্য বিবেচনায় সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধিপূর্বক তার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা উচিত বলে বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছেন। কেননা খনিজ সম্পদ অনুসন্ধানপূর্বক উত্তোলন বাড়ানো হলে তা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কমাবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের নতুন বড় উৎস হতে পারে। এছাড়া এর মাধ্যমে চলমান জ্বালানি সংকটের সমাধান ও নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
সংবিধানের ১৪৩ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে দেশীয় জ্বালানি ও খনিজ সম্পদের ওপর রাষ্ট্রীয় মালিকানা প্রতিষ্ঠা করা হয়, যেহেতু দেশের মজুদ খনিজ সম্পদের অংশীদার দেশের জনগণ। অতএব সংবিধান অনুসারে খনিজ সম্পদ সংরক্ষণ ও উত্তোলনের দায়ভার রাষ্ট্রের। এজন্য রাষ্ট্রকেই ভূমিকা রাখতে হবে।
১৯৬৩ সালে জয়পুরহাট জেলায় চুনাপাথর খনি আবিষ্কৃত হয়। ওই খনিতে প্রায় ১০০ মিলিয়ন টন চুনাপাথর মজুদ থাকলেও আজ পর্যন্ত এক টনও উত্তোলন করা সম্ভব হয়নি। জিএসবি-সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, ৬০ বছর আগে খোঁজ পাওয়া সেই খনির চুনাপাথর অত্যন্ত উঁচুমানের। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে সেখান থেকে চুনাপাথর উত্তোলন সম্ভব। ভারতসহ অনেক দেশই বাংলাদেশের চেয়ে অনেক গভীরের খনি থেকে চুনাপাথর তুলছে। কিন্তু অর্থায়নের উৎস না পাওয়ার পাশাপাশি তাপমাত্রা ও ভূগর্ভস্থ পানিপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণের চ্যালেঞ্জের কারণে খনি থেকে চুনাপাথর উত্তোলন করা সম্ভব হচ্ছে না।
এছাড়া দেশের কক্সবাজার ও ব্রহ্মপুত্র নদে খনিজ বালি আছে। বড় নদীগুলোতেও মূল্যবান খনিজ বালি রয়েছে। এগুলো উত্তোলনেও পর্যাপ্ত উদ্যোগ নেই বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। এভাবে নিজস্ব সম্পদ উত্তোলন করে জাতীয় উন্নয়নে কাজে না লাগাতে পারলে তা কার্যত রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা বলেই গণ্য হবে। উদাহরণ হিসেবে জয়পুরহাটের চুনাপাথর প্রকল্পের কথাই বলা যায়। এ প্রকল্প রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ১৯৮২ সাল থেকে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিয়োজিত রয়েছেন। চুনাপাথর উত্তোলন না হলেও প্রতি মাসে তাদের বেতন-ভাতা দেয়া হচ্ছে। ফলে স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন ওঠে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের কি চুনাপাথর উত্তোলনে মনোযোগী হওয়ার সময় এখনো আসেনি?
চুনাপাথর প্রধানত চুন তৈরি করতে ব্যবহৃত হয়। সিমেন্ট শিল্পের প্রধান কাঁচামাল চুনাপাথর এবং চুনাপাথর থেকে তৈরি হয় ক্লিংকার। নির্মাণ, রাসায়নিক ও কাচ শিল্পে চুনাপাথর ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়। ধাতু নিষ্কাশনে এবং চিনি শিল্পেও চুনাপাথর ব্যবহৃত হয়। দেশের জন্য অত্যন্ত কার্যকরী এ খনিজ বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের খাতও হতে পারে। কিন্তু জয়পুরহাটের চুনাপাথরের খনি ঠিকমতো কাজে লাগানো সম্ভব হচ্ছে না। বর্তমানে দেশে ব্যাপক নির্মাণ কর্মযজ্ঞ চলমান রয়েছে। দেশের সিমেন্ট কারখানাগুলোও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন বলে বিবেচিত হচ্ছে। তাই দেশীয় কাঁচামাল চুনাপাথর দিয়ে সিমেন্ট তৈরি সম্ভব হলে দামে সাশ্রয় হবে। সংগত কারণেই জয়পুরহাটসহ দেশীয় সব খনির চুনাপাথর উত্তোলন করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় যে সরকারি বিনিয়োগ প্রয়োজন পড়বে, সেক্ষেত্রে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা প্রয়োজন। এছাড়া দেশে মজুদ খনিজ সম্পদের মধ্যে প্রাকৃতিক গ্যাসই বড় পরিসরে উত্তোলন করা হচ্ছে। বর্তমানে গ্যাসের মজুদ নিঃশেষ হয়ে আসছে। পেট্রোবাংলার তথ্যমতে, দেশে আরো গ্যাস আছে এবং তা উত্তোলন করা সম্ভব। কিন্তু এক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে কাঙ্ক্ষিত উদ্যোগ ও বিনিয়োগ মিলছে না। অথচ সরকার তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে নতুন অর্থবছরে।
চুনাপাথর ছাড়াও দেশে কয়লা, পিট কয়লা, সাদামাটি, নুড়িপাথর, কঠিন শিলা, আকরিক লৌহ, কাচবালির বিপুল পরিমাণ মজুদ রয়েছে। বাংলাদেশের সমুদ্র ও স্থলভাগে বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক সম্পদ মজুদ আছে। বিশেষত গ্যাস ও কয়লার মজুদের বিষয়টি প্রমাণিত। এসব সম্পদ উত্তোলনে যথাযথ অনুসন্ধান ও বিনিয়োগ হয়নি। যে কারণে বছরের পর বছর গ্যাস সরবরাহ কমার বিপরীতে আমদানিনির্ভরতা বেড়েছে। শুধু দেশের চট্টগ্রাম অঞ্চলেই গ্যাস ও জ্বালানি তেল মজুদের প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের অনুসন্ধানের সুপারিশ থাকলেও সে ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। জিএসবির ভাষ্যমতে, দেশে আবিষ্কৃত খনিজ সম্পদের যে আর্থিক মূল্যমান নিরূপণ করা হয়েছে, তা মূলত মজুদ থেকে পাওয়া ধারণাগত সংখ্যা। সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করা সম্ভব হলে খনিজ সম্পদের পরিমাণ যেমন বাড়বে, তেমনি এ সম্পদের যথাযথ আকার সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে। পাশাপাশি বাজারমূল্য অনুযায়ী সম্পদের প্রকৃত আর্থিক মূল্যমান নিরূপণ করা সম্ভব হবে।
আমরা প্রত্যাশা করব সরকার দেশের ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে খনিজ সম্পদ উত্তোলনে যথাযথ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। খনিজ সম্পদ আমাদের জাতীয় সম্পদ। কাজেই উত্তোলনযোগ্য খনিজ সম্পদ আহরণ ও ব্যবহারের যুগোপযোগী প্রযুক্তিশৈলী ও প্রক্রিয়া অনুসরণ করলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন হবে।










