সারা বিশ্বে মূল্যস্ফীতি কমলেও বাংলাদেশ বিরল কয়েকটি দেশের একটি যেখানে কমেনি। টানা দুই বছর ধরে বিরাজমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি অর্থনীতিতে অস্থিতিশীলতা নিয়ে এসেছে। খাদ্যপণ্যের বাড়তি দামের চাপে আঁটসাঁট করে দিনাতিপাত করতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এখন দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নতুন অর্থবছরের বাজেটে তাই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। এ অর্থবছরের বাজেটে মূল্যস্ফীতি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা সরকারের। যদিও অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্টদের মতে, বাস্তব প্রেক্ষাপট বিবেচনায় এ লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছানো বেশ দুঃসাধ্য। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সঠিক সময়ে নীতি প্রণয়নে গড়িমসি এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থতা মূল্যস্ফীতিকে দিনে দিনে স্ফীত করেছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে জুনে সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৭২ শতাংশে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ। জুনে সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমলেও গ্রাম ও শহরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশের ওপরেই ছিল। 

বণিক বার্তার প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতির হার ভারত ও নেপালের চেয়েও দ্বিগুণ। এমনকি ২০২২ সালে দেউলিয়া হয়ে যাওয়া শ্রীলংকাও মূল্যস্ফীতি কমিয়ে এনেছে। কিন্তু বাংলাদেশ এখনো তা করতে পারেনি। 

ভয়াবহ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের মুখে ২০২২ সালে শ্রীলংকার মূল্যস্ফীতি ৬০ শতাংশে ঠেকেছিল। রিজার্ভ সংকটে বন্ধ হয়ে যায় জ্বালানি তেলের মতো অতিপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি। আমদানি দায় আর বিদেশী ঋণ পরিশোধের ব্যর্থতায় নিজেদের দেউলিয়াও ঘোষণা করে শ্রীলংকা সরকার। কিন্তু ইতিহাসের সবচেয়ে নাজুক সে পরিস্থিতি দ্রুতই কাটিয়ে উঠছে শ্রীলংকা। মূল্যস্ফীতির হার কমতে কমতে গত জুনে নেমে আসে ১ দশমিক ৭ শতাংশে। দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, মে মাসে এ হার ছিল ১ শতাংশের নিচে। প্রতিবেশী দেশ ভারতের মূল্যস্ফীতিও দুই বছরের মধ্যে সর্বনিম্নে নেমেছে। তাদের পরিসংখ্যান মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, মে মাসে দেশটির মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ। নেপালেও ৩১ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থানে রয়েছে মূল্যস্ফীতি। দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, মে মাসে নেপালের মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৪ দশমিক ৪ শতাংশ। এক বছর আগে এ হার ছিল ৭ দশমিক ৪১ শতাংশ। বাংলাদেশের চেয়ে মূল্যস্ফীতি বেশি রয়েছে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটে থাকা পাকিস্তানে। দেশটির পরিসংখ্যান বিভাগের তথ্যমতে, জুনে পাকিস্তানে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ১২ দশমিক ৬ শতাংশ। 

বিশ্বব্যাপী কভিড-১৯ সৃষ্ট বৈশ্বিক দুর্যোগ আর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের দামামায় বিশ্বের বেশিরভাগ দেশেই মূল্যস্ফীতি বাড়তে থাকে। আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বিভিন্ন দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকটে পড়ে। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় প্রায় সব দেশেরই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এসেছে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল, ভোজ্যতেল, খাদ্যশস্য, সার, কৃষি খাতের কাঁচামাল, সার ইত্যাদির মূল্যও কমেছে। কিন্তু দেশের বাজারে এসব পণ্যের দাম কমেনি, উল্টো বেড়েছে। বিশেষ করে খাদ্যমূল্যের প্রভাবে বেড়েছে সার্বিক মূল্যস্ফীতি।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে গত অর্থবছরের শুরু থেকেই একের পর এক পদক্ষেপ নেয় সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ব্যাংক খাতে ঋণের সুদহার ৯ শতাংশ থেকে কয়েক দফা বাড়িয়ে নেয়া হয় ১৪ শতাংশে। এখন বাজারের ওপর ছেড়ে দেয়ায় কোনো কোনো ব্যাংকে সুদহার ১৬ শতাংশের ওপরে উঠে গেছে। সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির অংশ হিসেবে টাকা ছাপিয়ে সরকারকে ঋণ প্রদানের নীতি থেকেও সরে এসেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বাজার নিয়ন্ত্রণে কয়েক দফায় নির্দিষ্ট কিছু নিত্যপণ্যের দামও বেঁধে দেয় সরকার; সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য নিয়ন্ত্রণে বারবার অভিযানেও নামিয়েছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে। সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির অংশ হিসেবে নতুন অর্থবছরের বাজেটও আগের বছরের মতো সম্প্রসারণ করা হয়নি। এতসব প্রয়াস সত্ত্বেও দেশে মূল্যস্ফীতির হার নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভবপর হয়নি। এর অন্যতম কারণ বাজারে সরবরাহজনিত সংকট ও নীতি সমন্বয়হীনতা। মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সার্বিক অর্থনীতির শৃঙ্খলা ও সুশাসন জড়িত থাকে। শৃঙ্খলা ও সুশাসন নিশ্চিত করতে না পারলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন। এক্ষেত্রে গৃহীত মুদ্রানীতি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন ও অন্য নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখা জরুরি। একই সঙ্গে বাজার ব্যবস্থাপনায় বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে। সঠিক বাজার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমানো গেলে সার্বিক মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরা যাবে। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে এটি করা অতীব জরুরি।

খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমাতে হলে সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে শক্ত পদক্ষেপ এবং সরবরাহ শৃঙ্খল ঠিক রাখা জরুরি। পাশাপাশি উৎপাদন বাড়াতে হবে। বাজার অর্থনীতিতে দাম নির্ধারণ করে বাজারদর নিয়ন্ত্রণ বেশ কঠিন। অতিমুনাফা অর্জনে কেউ যেন কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে না পারে এবং দাম বাড়িয়ে দিতে না পারে তা নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে সরকারিভাবে কৃষিদ্রব্য যত বেশি গুদামজাত করা যাবে, অবৈধ মজুদকারীর দৌরাত্ম্য তত কমানো সম্ভব হবে। আর দীর্ঘমেয়াদে কৃষি উৎপাদন বাড়িয়ে আমদানিনির্ভরতা থেকে ধীরে ধীরে সরে আসা দরকার। বাজারে পণ্য সরবরাহ বাড়ানোর মাধ্যমে প্রতিযোগিতা বাড়াতে হবে। বাজারে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা গেলে মূল্য সহনীয় পর্যায়ে রাখা যেতে পারে।

যেখানে প্রতিবেশী দেশ ভারত, নেপাল, শ্রীলংকায় মূল্যস্ফীতি কমেছে, সেখানে বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ। এক্ষেত্রে সুসমন্বিত পরিকল্পনার যে ঘাটতি রয়েছে, সেটিও চিহ্নিত করতে হবে।

উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে সবচেয়ে বেশি আর্থিক চাপ বাড়ে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের। বাজারে পণ্যের দাম বাড়লেও সে অনুপাতে বাড়েনি মানেুষের আয়। আয়বৈষম্য দিনে দিনে তীব্র হচ্ছে। এ অবস্থায় সাধারণ মানুষকে মূল্যস্ফীতির অভিঘাত থেকে বাঁচাতে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) মাধ্যমে পণ্যের সরবরাহ বাড়াতে হবে। টিসিবির মাধ্যমে খোলাবাজারে পণ্য বিপণন ও তদারকিতে জোর প্রদান আবশ্যক। সর্বোপরি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বিশ্বের অন্য দেশগুলোর উদাহরণের আলোকে বাজার ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ও মুদ্রানীতির কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।