দেশের ব্যাংক ও আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ব্যাংক। অর্থনৈতিক কার্যক্রমের সঙ্গে ব্যাংকটির নিবিড় সংযোগ বিদ্যমান। এছাড়া ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প, রফতানি, আমদানিসহ সার্বিক অর্থনীতিতে আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাও এর অন্যতম দায়িত্ব। বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং অধীনস্থ ব্যাংকের ওপর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কার্যকারিতা সরাসরি সংস্থাটির স্বাধীনতার সঙ্গে সম্পর্কিত। কিন্তু অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় গত কয়েক বছরে ব্যাংক খাতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বেড়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংককে পাশ কাটিয়েও এখন দেশের ব্যাংক খাতের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হচ্ছে। ফলে বাংলাদেশ ব্যাংক আইনে যে স্বাধীনতা ও স্বায়ত্তশাসন তাকে দেয়া হয়েছে, সেগুলোর কতটুকু বাস্তবায়ন হচ্ছে সেটা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে অনেক আগে থেকেই। ফলে ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব হচ্ছে না। এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন নিয়ে আইনি সীমাবদ্ধতার বিষয়গুলো উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) এক প্রতিবেদনেও। সেখানে ব্যাংকটির বর্তমান কার্যপদ্ধতির মূল্যায়ন করে বেশকিছু সুপারিশও করা হয়েছে।
রাষ্ট্রপতির আদেশ নং ১২৭-এর (বাংলাদেশ ব্যাংক আদেশ ১৯৭২) বলে ১৯৭২ সালে পরিপূর্ণ কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক যাত্রা করে। শুরু থেকেই দেশের আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচিত। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক আদেশ-১৯৭২-এর ১০, ১৫ ও ৭৭ ধারা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লক্ষ্য অর্জনে যেকোনো পদক্ষেপ গ্রহণের সক্ষমতাকে বাধাগ্রস্ত করছে বলে মনে করছে আইএমএফ।
ব্যাংক ও আর্থিক খাতে সুশাসন বজায় রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আইনি সীমাবদ্ধতাগুলো পর্যালোচনা করা দরকার। কেননা দেশের স্বার্থে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যেন যেকোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে পারে, সে বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বাড়ার কারণে ব্যাংক খাতে তৈরি হয়েছে অস্থিরতা। বেড়েছে খেলাপি ঋণের পরিমাণ। এ ঋণ আদায়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকা জোরালো হওয়ার কথা থাকলেও সেই ভূমিকা দেখা যায়নি। বরং খেলাপিদের সুযোগ দিয়ে বরাবরই তাদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে ব্যাংকটি। এজন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আইনি কাঠামোয় পরিবর্তন দরকার। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ তৈরি করতে হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা বিশ্বজুড়েই আলোচনার বিষয়। বিশ্বে স্বাধীন ও আধুনিক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রচলন ১৯৮৯ সালে নিউজিল্যান্ডে। নিউজিল্যান্ডের গভর্নর নিয়োগ পান চুক্তির ভিত্তিতে। চুক্তির শর্ত পূরণ করতে না পারলে চাকরিচ্যুতি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংককে স্বাধীন রাখার জন্য নানা ধরনের আইনকানুন করা হয়েছে। পাশাপাশি তৈরি করা হয়েছে জবাবদিহির জায়গাটি। কিন্তু বাংলাদেশে অনুপস্থিত দুটোই।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগে যোগ্যতার কোনো মাপকাঠি নেই। সরকার যে কাউকে এখানে গভর্নর পদে নিয়োগ দিতে পারে। আবার তাকে সরকার না চাইলে গভর্নর পদে থাকতে পারেন না। এসব নানা জটিলতায় বর্তমানে বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকটি স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে না। স্বাধীন না হওয়ার আরেকটি কারণ রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ। আর এ কারণেই বাংলাদেশ ব্যাংককে জবাবদিহির মধ্যে আনা সম্ভব হচ্ছে না। এজন্য আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে শক্তিশালী ও স্বাধীন করতে হবে, তারপর জবাবদিহির মধ্যে আনতে হবে। ব্যাংকের লক্ষ্য অর্জনের জন্য, বিশেষ করে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং উন্নত আর্থিক ব্যবস্থাপনা ইত্যাদির জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সব ধরনের প্রভাব থেকে মুক্ত হওয়া জরুরি। ব্যাংককে তার সব কার্যকরী ও সিদ্ধান্তগত কার্যক্রমে সম্পূর্ণরূপে স্বাধীন হতে হবে।
আইনে বাংলাদেশ ব্যাংককে জাতীয় সংসদের কাছে জবাবদিহির কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে তা দেখা যাচ্ছে না। অথচ গভর্নর যদি সংসদের কাছে ব্যাংক খাতের অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়ে জবাবদিহির বিষয়ে বাধ্য হতেন তাহলে দেশের অর্থনীতি অনেক ভালো হতো এবং দেশের জনগণের স্বার্থ রক্ষিত হতো।
দেশে দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে গভর্নর নিয়োগ পেয়ে থাকেন। ফলে গভর্নর বিভিন্ন অনিয়ম করলেও সেগুলো রাজনৈতিকভাবেই মোকাবেলা করা হয়। এ কারণে জবাবদিহির বিষয়টি নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে সরকার যেভাবে চায় সেভাবেই বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হচ্ছে। দেশের অর্থনীতিতে নতুন ব্যাংকের দরকার না থাকলেও রাজনৈতিক বিবেচনায় ব্যাংকের অনুমোদন দেয়া সম্ভব হয়েছে। ঋণখেলাপিসহ নানা অনিয়মের কারণে ব্যাংকগুলো ক্রমেই দুর্বল হতে থাকলেও শক্ত কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। আবার ব্যাংকগুলোর অবস্থা খারাপ হয়ে পড়লে সরকারের ইচ্ছা অনুসারেই ব্যাংক একীভূতকরণ প্রক্রিয়া শুরু হয়। এছাড়া ব্যাংক খাত থেকে যখনই সরকার ঋণ চেয়েছে ঋণের ব্যবস্থা করা হয়েছে, যা অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর। সরকারের চাওয়া পূরণ করতে গিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ইচ্ছার বিরুদ্ধে যেমন কাজ করেছে, ব্যর্থ হয়েছে নিজের এখতিয়ারের মধ্যে থাকা কাজ করতেও। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো স্বায়ত্তশাসন বিষয়টি আইনি কাঠামোর চেয়েও চর্চার বিষয়। আমরা স্বাধীনতার এত বছর পরও সেই চর্চা গড়ে তুলতে পারিনি। তাই স্বায়ত্তশাসনচর্চায় যেসব সীমাবদ্ধতা রয়েছে সেগুলো পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশ ব্যাংককে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে।










