ক্রমাগত ২৫ বছর ধরে লোকসান দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। সর্বশেষ প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২০-২১ সালে সংস্থাটির লোকসান বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ১০০ কোটি টাকা এবং সংস্থাটির অপারেটিং রেশিও বা পরিচালনা ব্যয় ও মোট আয়ের অনুপাত দাঁড়িয়েছে ২৭৭ দশমিক ৮৩ শতাংশ, যা ২৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। খোদ রেলপথ মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছে, ‘রেলের দুর্নীতি-অনিয়ম বন্ধ করা না হলে, রেলের সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করা না গেলে এবং যাত্রীসেবার মান না বাড়ানো হলে লোকসান কমানো কষ্টকর হবে।’ কিন্তু এটা কোনো পুরনো কথা নয়। প্রতি বছর বাংলাদেশের মহা হিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি) তার বার্ষিক নিরীক্ষা প্রতিবেদনে প্রায় একই কথা বলে যাচ্ছেন। তা সত্ত্বেও লোকসানের হার বেড়ে চলেছে। কারণ সংস্থাটি সিএজি কিংবা অন্য কোনো বেসরকারি সংস্থার পরামর্শ গ্রাহ্য করতে অনাগ্রহী।

স্বাধীনতার পর দেশের জনসংখ্যা দ্বিগুণ পেরিয়ে গেছে, কিন্তু রেলের পরিধি সে তুলনায় তেমন একটা বাড়েনি এবং রেলের সেবাও বিস্তৃত করা হয়নি। তাই বাস্তবতা হলো বাংলাদেশের রেল ব্যবস্থা যাত্রী সংখ্যা অনুসারে ও চাহিদা অনুসারে পরিবহনসেবা দিতে পারঙ্গম নয়। গত ২৫ বছরে রেলওয়ের শুধু যাত্রী সংখ্যাই বাড়েনি, দেশের মাথাপিছু আয়ও বেড়েছে। এ অবস্থায় রেলওয়ের ক্রমাগত লোকসান দিয়ে যাওয়া কোনো যুক্তি দিয়ে বোঝা যায় না। কারণ যাত্রী সংখ্যা বাড়লে এবং জনগণের মাথাপিছু আয় ও ক্রয়ক্ষমতা বাড়লে রেলওয়ের আয় অতীতের চেয়ে বহুগুণে বেড়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু তা না হয়ে উল্টোটি ঘটছে; যা একদমই বোধগম্য নয়।

বণিক বার্তায় প্রকাশ, রেলের মালিকানাধীন মোট ভূমির পরিমাণ অর্ধেকই এখন রেলের বেদখলে। বেশির ভাগ বেদখল জমির খবর সম্পর্কে রেল কর্তৃপক্ষ অবগত নয়। এর জন্য সিএজি তার ২০১৬-১৭ সালের বার্ষিক নিরীক্ষা প্রতিবেদনে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের ‘বাংলাদেশ রেলওয়ে জমি ব্যবস্থাপনা নীতিমালা ২০০৬’-এর অমান্য করাকে দায়ী করেছিল। একই প্রতিবেদনে সিএজি এও বলেছিল যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নির্দেশনা অমান্য করে রাজস্ব সংগ্রহে অবহেলা করায় সংস্থাটি বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির শিকার হয়। একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা, বাংলাদেশ রেলওয়ে প্রকৌশল কোড, বাংলাদেশ রেলওয়ে অ্যাকাউন্টস কোড ইত্যাদি নানা বিধি ও প্রবিধি ভঙ্গ করায় রেলওয়ে লোকসানের শিকার হচ্ছে। রেলওয়ের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ নতুন কিছু নয়। কিন্তু রেল কর্তৃপক্ষকে বারবার ছাড় দিয়ে যাওয়ায় এবং কোনো কর্মকর্তাকে এসব অনিয়মের দায় বহন করতে না হওয়ায় এমন অনিয়মের অবসান হওয়া তো দূরের কথা, বরং অনিয়ম বেড়ে সংস্থাটিতে লোকসানের পরিমাণ দিন দিন বেড়ে চলেছে।

এদিকে রেলসংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে অর্ধেক জনবল নিয়ে কাজের কথা বলা হচ্ছে। সে হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালন ব্যয় কম হওয়ার কথা থাকলেও সেটি কেন হচ্ছে না এ নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। এর কারণ হিসেবে কেনাকাটায় রেলের অতিরিক্ত আগ্রহ, রেল কর্মীদের দায়িত্বে অবহেলা ও দুর্নীতির কথাই উঠে আসে। প্রতিকার হিসেবে সারা দেশে রেলের যে জমি আছে, সে জমিগুলোর সদ্ব্যবহার করার বিষয়টি সর্বাগ্রে গুরুত্ব পায়। কারণ রেল কর্তৃপক্ষ নিজেদের জমি রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়ে সচেতন নয়, এ অভিযোগ পুরনো। তার ওপর কীভাবে রেলকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা যায়, সেক্ষেত্রেও প্রশাসনের মনোযোগের ঘাটতি রয়েছে। এছাড়া রেলকে পুনরায় লাভজনক করার ক্ষেত্রে শুধু যাত্রী পরিবহনের ভিত্তিতে পরিকল্পনা করলে হবে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, পণ্য পরিবহনের ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে এবং সে অনুযায়ী অবকাঠামো ব্যবস্থাপনা ঢেলে সাজাতে হবে।

এটা সত্য, আমাদের দেশে সরকারি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে জবাবদিহিতার সংস্কৃতি সেভাবে গড়ে ওঠেনি। এর প্রভাব একসময়ের লাভজনক রেল খাতের ওপরও পড়েছে। অথচ এখনো মানুষ রেলে যাতায়াতের ওপর নির্ভরশীল। রেলে ই-টিকিটিং সার্ভিস শুরু হওয়ার আগে ঈদের আগে কমলাপুর রেলস্টেশনে ভোর থেকেই টিকিট কাটার জন্য লাইন শুরু হতো। বর্তমানেও রেলে যাতায়াতের বিষয়টি যাত্রীদের কাছে প্রাধান্য পেয়ে থাকে। আন্তঃমহানগর রেলগুলো সবসময় যাত্রীতে ভরপুর থাকে। এর পরও রেলকে কেন লাভজনক করা যাচ্ছে না, সেটি তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।

বিশেষ করে রেলের যাবতীয় আয়-ব্যয় হিসাব নিরপেক্ষ ও নিবিড় নিরীক্ষার পর লোকসানের কারণ খুঁজে বের করতে হবে। কারণ একটি প্রতিষ্ঠান ক্রমাগত লোকসানের ভেতর দিয়ে চলতে পারে না। এজন্য জরুরি ভিত্তিতে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানটির সামগ্রিক কার্যক্রম জবাবদিহির আওতায় নিয়ে আসা দরকার। অন্যথায় লোকসানের এ ধারা অব্যাহত থাকলে প্রতিষ্ঠানটি একসময় মুখ থুবড়ে পড়বে।

এভাবে অনিয়ন্ত্রিতভাবে চললে পরিচালনা ব্যয় ও মোট আয়ের অনুপাত বাড়তেই থাকবে ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ধ্বংসের পথে ধাবিত হবে। এজন্য কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণ খুব জরুরি। রেলওয়ের কোনো কর্মকর্তা ও কর্মচারী রেলওয়ে পরিচালনার কোনো নীতি, বিধি কিংবা প্রবিধান ভঙ্গ করলে তার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রয়োজনে রেলের যাবতীয় আয়-ব্যয়ে স্বচ্ছতা আনয়ন, যাত্রীসেবার মান বৃদ্ধি, পণ্য পরিবহনসহ সামগ্রিক সেবা ব্যবস্থায় পুনর্বিন্যাস থেকে শুরু করে কীভাবে প্রতিষ্ঠানটিকে লাভজনক ধারায় ফেরানো যায় সেজন্য রেল ব্যবস্থাপনায় সংস্কারের উদ্যোগ নিতে হবে।