‘ঋণ করে হলেও ঘি খাও’- প্রাচীন চার্বাক দর্শনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই উক্তি থেকে বোঝা যায় উপমহাদেশের খাদ্য তালিকার ঘির উপস্থিত অনেক পুরোনা। হাজার বছর তো হবেই, ঘির সঙ্গে এখানকার মানুষের পরিচয়ের। আদর্শ খাদ্য দুধের শুদ্ধতম রূপ মনে করা হয় একে। নিরামিষ বা আমিষ, উভয় ক্ষেত্রেই রন্ধনের সেরা উপকরণ ঘি।

ভারতীয় সংস্কৃতিতে ঘিকে গণ্য করা হয় ‘টাঙ অব দ্য গডস’ বা দেবতাদের জিহবা। হিন্দু ঐতিহ্যে দেবতাদের উদ্দেশ্যে নিবেদন করা হয় ঘি। বিশ্বাস করা হয়, এর মাধ্যমেই প্রার্থনা দেবতাদের কাছে পৌঁছাবে।

ধর্মগ্রন্থ ঋগ্বেদে ঘিয়ের উল্লেখ রয়েছে। পুরাণ মতে, প্রজাপতি ব্রহ্মার দুই হাত ঘর্ষণের মাধ্যমে প্রথম ঘি প্রস্তুত হয়। সেই ঘি তিনি আগুনে ফেলেন। তার থেকে জন্ম লাভ করে সন্তানেরা।

কল্যাণ কামনা করে বিয়ে, শেষকৃত্য ও অন্যান্য অনুষ্ঠানে আগুনে ঘি দেয়ার রেওয়াজ ভারতে অনেক পুরোনো। আয়ুর্বেদে ঘিকে সর্বরোগের ঔষধ মনে করা হয়। সকালে গরম ভাতের সঙ্গে ঘি খাওয়া বাঙালির অন্যতম প্রধান খাবার ছিল দীর্ঘদিন। যার উল্লেখ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়সহ অনেক ক্লাসিক লেখকের বইয়ে পাওয়া যায়। এ ছাড়া মোগল বা এমন বাদশাহী ঐতিহ্যে ঘি’র তুমুল ব্যবহার ছিল।

পুষ্টিবিদরাও ঘি গুণাগুণকে বিশিষ্ট হিসেবেই দেখেন। ঘি শরীরের আর্দ্রতার ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। এর অ্যান্টি-ভাইরাল ও অ্যান্টি-ফাঙ্গাল বৈশিষ্ট্য ত্বকের জন্য উপকারী। খালি পেটে ঘি হজমের জন্য উপকারী। বৃদ্ধি করে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা।

রান্নার স্বাদ বাড়াতে ঘি অদ্বিতীয়। তবে ঘি খাওয়ার শ্রেষ্ঠ উপায় কোরমার মতো খাদ্য। শীতের দিন রুটির সঙ্গেও খাওয়া যেতে পারে। রোস্ট কিংবা শুধু গরম ভাতের সঙ্গেও মজাদার।  

আশির দশকে ভোজ্য তেলকে রান্নাঘরে প্রতিষ্ঠিত করতে বিপুল প্রচারণা চালায় কোম্পানিগুলো। প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করানো হয় ঘিকে। অতিরিক্তি ফ্যাটের অজুহাতে মানুষকে অনুৎসাহিত করা হয়। দাবি করা হয়, এর ফ্যাট শরীর ও হার্টের জন্য ক্ষতিকর। এরপর বিস্ময়করভাবে ভাটা পড়ে ঘি খাওয়ার রীতিতে। তার স্থান দখল করে ভোজ্য তেল। এভাবে সারা আশির দশক ছিল সম্পৃক্ত চর্বিকে নেতিবাচক হিসেবে উপস্থাপনের যুগ। সঙ্গে সঙ্গে ঘিয়ের জনপ্রিয়তা হ্রাসের যুগ।

ইদানিং ঘি নিয়ে নীরবতা ভেঙেছেন বিশেষজ্ঞরা। যুক্তরাষ্ট্রে যদিও ঘিয়ের ব্যবহার সূচক কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী, বাঙালি সংস্কৃতিতে এই খাদ্যাভ্যাস এখনো ক্ষয়িষ্ণু সময় পার করছে। তবে আজকাল অরগানিক উদ্যোগের ভিড়ে নতুন করে ‘খাঁটি ঘি’ খুঁজছেন ভোজনরসিকরা।