প্যারিসের ল্যুভর মিউজিয়ামের স্নিগ্ধ সকালের নিস্তব্ধতায় চিরকালের মতো বসে ছিলেন সেই নারী—এক অদ্ভুত হাসির ছায়া ঠোঁটে, চোখে অস্পষ্ট রহস্য। নাম লা জিওকোন্দা, যিনি পরে সারা বিশ্বের কাছে মোনা লিসা নামে পরিচিত হবেন। কে জানত, সেই মুখশ্রীকে অদৃশ্য করে দেবে এক সাধারণ কারিগরের হাত!
১৯১১ সালের আগস্টের এক সকাল। কর্মীদের সাদা পোশাকের নিচে ছবি লুকিয়ে নিয়ে একজন মানুষ স্রেফ হেঁটে চলে গেলেন ব্যস্ত রু দ্য রিভোলির পথে। যেন কোনো গল্পের কাহিনি, অথচ এটাই সত্যি। নাম তার ভিনসেঞ্জো পেরুজিয়া।
কেউ বলেন, তিনি রাতভর মিউজিয়ামের আলমারিতে লুকিয়ে ছিলেন। কেউ বলেন, তার সহযাত্রী ছিল আরও কয়েকজন। কিন্তু যা অস্বীকার করা যায় না তা হলো—ছবিটি দেয়াল থেকে হারিয়ে যাওয়ার পর প্রায় একদিন ধরে কেউ কিছুই বুঝতে পারেনি।
পরদিন সকালে শিল্পী লুই বেরো এসে দেয়াল খালি দেখে স্তব্ধ হয়ে যান। সঙ্গে সঙ্গে খবর ছড়িয়ে পড়ে—মোনা লিসা নেই!

ছবি- রজার ভায়োলেট
ছবির দীর্ঘ যাত্রা
শতাব্দী আগে ফ্লোরেন্সে আঁকা হয়েছিল ছবিটি। এক ধনী রেশম ব্যবসায়ীর স্ত্রী লিসা গেরারদিনির মুখচ্ছবি—কিন্তু দা ভিঞ্চি তা কখনোই তার হাতে তুলে দেননি। অপূর্ণ ছবিটি নিয়ে তিনি পাড়ি জমালেন ফ্রান্সে, এবং মৃত্যুর পর ছবিটি চলে গেল ফরাসি রাজার সংগ্রহে। সেখান থেকে ল্যুভরে, অসংখ্য মাস্টারপিসের মাঝে নিঃশব্দে ঝুলে থাকল সে।
শিল্পমহলে ছবিটি এক বিস্ময় হলেও সাধারণ মানুষের কাছে তখনো এটি কোনো দেবতুল্য প্রতীক হয়ে ওঠেনি।
এক কারিগরের অন্তর্লীন ইচ্ছা
পেরুজিয়া ছিলেন এক গ্লেজিয়ার। কাচ বসাতেন, সুরক্ষিত কেস বানাতেন। হয়তো তার হাতেই একদিন তৈরি হয়েছিল মোনা লিসার জন্য সেই কাচের ঢাল। কে জানত, একদিন সেই হাতই কাচ ভেঙে ছবিকে মুক্তি দেবে!
তিনি দেশপ্রেমিক ছিলেন কিনা জানা যায়নি। ফ্রান্স নয়, ইতালির মাটিতেই থাকা উচিত এই সৃষ্টি—এমনটি কি ভেবেছিলেন? নাকি কেবল অর্থলোভী এক মানুষ? ইতিহাস আজও নিশ্চিত উত্তর দেয় না।
প্যারিসের অস্থিরতা ও গুজবের ঝড়
ছবিটি উধাও হওয়ার খবর ছড়াতেই প্যারিস শহর শোকে ভেসে যায়। মানুষ খালি দেয়ালের সামনে ভিড় জমায়, ফুল রেখে যায়, যেন এটি কোনো প্রিয়জনের মৃত্যু। নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, এই চুরির ঘটনা এতটাই আলোড়ন তৈরি করে যে মানুষ সাময়িকভাবে 'যুদ্ধের গুজব' ভুলে গিয়েছিল। সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় স্থান পায় হারিয়ে যাওয়া মুখশ্রী। ফরাসি পুলিশ মোনালিসার হাজার হাজার অনুলিপি শহরজুড়ে ছড়িয়ে দেয় এবং সংবাদপত্রগুলোও ছবিটি প্রকাশ করে। মোনা লিসা হঠাৎই হয়ে ওঠেন সবার—যাদের অনেকেই জীবনে ল্যুভরের ভেতরে পা-ও রাখেননি।

ইতালিতেও শুরু হয়েছিল তোলপাড়—লা দোমেনিকা দেল কোরিয়েরে পত্রিকার প্রথম পাতায় হারিয়ে যাওয়া শিল্পকর্মের ছবি ছাপা হয়েছিল প্রধান সংবাদ হিসেবে। ছবি- দি আগোস্তিনি
পুলিশ খুঁজতে থাকে সর্বত্র। গুজব উড়ে—ভেতরের কেউ করেছে, আবার কেউ ফিসফিস করে বলে এটি নাকি সাংস্কৃতিক নাশকতা। পুলিশ মিউজিয়ামের প্রতিটি কর্মচারীকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। এক সময় এই চুরির জন্য বিখ্যাত চিত্রশিল্পী পাবলো পিকাসোকেও সন্দেহ করা হয়। পিকাসো এবং তার বন্ধু, কবি গিলেম অ্যাপোলিনেয়ারকে সন্দেহ করা হয়েছিল কারণ, তারা পরিচিত ছিলেন ঠাট্টা-তামাশা করা মানুষ হিসেবে। যদিও তারা মোনালিসা চুরির সঙ্গে জড়িত ছিলেন না, তবে পিকাসো ল্যুভর থেকে চুরি যাওয়া দুটি আইবেরিয়ান ভাস্কর্য তার কাছে রেখেছিলেন, যা পরে জানা যায়।
অন্ধকার বাক্সে দুই বছর
এদিকে ছবিটি নিঃশব্দে বিশ্রাম নিচ্ছিল পেরুজিয়ার এক কামরার ঘরে। কোনো আলো, কোনো দৃষ্টি ছোঁয়নি তাকে। এমনকি পেরুজিয়াও নাকি মুখখানি দেখার সাহস করেননি—লুকিয়ে রেখেছিলেন বাক্সের ভেতর, যেন এক বন্দিনী রানি।

প্যারিসের এই অ্যাপার্টমেন্টেই পেরুজিয়া লুকিয়ে রেখেছিলেন মোনা লিসাকে। ছবি-রজার ভায়োলেট
ইতালিতে ফেরা ও ধরা পড়া
দীর্ঘ দুই বছর পর, ১৯১৩ সালে, পেরুগিয়া মোনালিসা ছবিটি নিয়ে প্যারিস থেকে ফ্লোরেন্সে চলে যান। ছদ্মনামে তিনি ফ্লোরেন্সের প্রত্নতাত্ত্বিক ডিলার আলফ্রেদো গেরির কাছে ছবিটি বিক্রির প্রস্তাব দেন। এই খবর ইতালীয় শিল্প মহলে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। গেরির সঙ্গে দেখা করার সময় পেরুজিয়া জানান, মোনালিসা তার লজিং-এ আছে। এর পরপরই তিনি ধরা পড়েন এবং গ্রেফতার হন।

পেরুজিয়া দাবি করেছিলেন, দা ভিঞ্চির জন্মভূমি ইতালির মাটিতেই থাকা উচিত এই চিত্রকর্ম। ছবি- বেটম্যান
পেরুগিয়া চুরির জন্য দোষ স্বীকার করেন এবং তাকে মাত্র সাত মাসের জেল দেয়া হয়। জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর তিনি প্যারিসে ফিরে আসেন এবং ১৯২৫ সালে সেখানেই মারা যান।
অমরত্বের পথে এক হাসি
কিন্তু এ ঘটনার পর আর মোনা লিসা আগের মতো রইল না। তার রহস্যময় দৃষ্টি ছড়িয়ে পড়ল সর্বত্র—সংবাদপত্রের পাতায়, পোস্টারে, আলোকচিত্রে। অনুপস্থিতিতেই তিনি হয়ে উঠলেন সর্বব্যাপী।

ফ্লোরেন্সে ছবিটি উদ্ধার হওয়ার পর ইতালীয় কর্তৃপক্ষ মোনা লিসার চারপাশে কড়া নিরাপত্তার প্রহরা বসিয়েছিলেন। ছবি- রজার ভায়োলেট
১৯১৪ সালের জানুয়ারিতে যখন আবার তাকে ল্যুভরের দেয়ালে স্থাপন করা হলো, তখন তিনি আর কেবল একটি প্রতিকৃতি নন—তিনি বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত মুখ, সবচেয়ে বেশি পুনরুৎপাদিত শিল্পকর্ম, শিল্পের প্রতীকমূর্তি।
আজ, ১১৪ বছর পর
পেরুজিয়া কেন মোনালিসা চুরি করেছিলেন, তা নিয়ে এখনো বিতর্ক রয়েছে। তার উদ্দেশ্য কি ছিল জাতীয়তাবাদী আবেগ, নাকি কেবলই টাকা উপার্জনের চেষ্টা?

ল্যুভরে মোনা লিসা দেখার জন্য পর্যটকদের দীর্ঘ সারি দেখা এখন সাধারণ দৃশ্য। ছবি-রয়টার্স
এই ঘটনাটি আধুনিক বিশ্বে উপনিবেশবাদের সময় চুরি হওয়া বা স্থানান্তরিত হওয়া শিল্পকর্মগুলো তাদের আসল দেশে ফিরিয়ে আনার বিতর্ককেও উসকে দেয়।
সঙ্গে সৃষ্টি হয় মোনা লিসার কিংবদন্তি—সে যে কেবল এক নারীর মুখশ্রী নয়, বরং রহস্যের প্রতিমা, ইতিহাসের সাক্ষী, আর শিল্পের এক অদ্বিতীয় প্রতীক।










