তাদের চোখ তোমাকে পর্যবেক্ষণ করছে সব সময়।
ঘিরে ধরে আছে তাদের কণ্ঠস্বর। ঘুমে বা জাগরণে, ঘরে বা বাইরে, গোসলে বা বিছানায়- এর
থেকে মুক্তি নেই। শরীরে কয়েক সেন্টিমিটারের কঙ্কালটুকু ছাড়া আর কিছুই তোমার নিজের না।
এভাবেই একনায়কতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনগণের পরিস্থিতি
চিত্রিত করেছেন জর্জ অরওয়েল। বলা হয়ে থাকে, জোসেফ স্ট্যালিনের সময়কার সোভিয়েত ইউনিয়নের
ছায়া অবলম্বনে ১৯৪৯ সালে লিখেন বিখ্যাত উপন্যাস ‘১৯৮৪’। তখন থেকেই ‘বিগ ব্রাদার ইজ
ওয়াচিং ইউ’ লাইনটি যেন স্বৈরশাসক ও একনায়কদের বিরুদ্ধে ব্যঙ্গাত্মক স্লোগানে পরিণত
হয়। বিশ্বব্যাপী দারুণ জনপ্রিয়তা অর্জন করে উপন্যাসটি।
স্বাভাবিকভাবেই সোভিয়েত ইউনিয়ন ভালো ভাবে
নেয়নি বিষয়টি। ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত নিষিদ্ধ রাখা হয় উপন্যাসটি। পরবর্তীতে নিষেধাজ্ঞা সরিয়ে
নেয়া হলেও বিতরণ সহজ থাকেনি। তবে সম্প্রতি রুশ জনগণই স্থাপন করলেন অনন্য নজির।
২০২২ সালে রাশিয়ায় সবচেয়ে বেশি বিক্রিত বইয়ের
তালিকায় রয়েছে ‘১৯৮৪’। রাশিয়ার অনলাইন বই বিক্রি প্রতিষ্ঠান লিটরেসে সর্বোচ্চ ডাউনলোড
হওয়া ফিকশন ছিল এটি। আর সব ক্যাটাগরি মিলিয়ে অবস্থান দ্বিতীয়। অনেকে ‘বেস্ট সেলার’
হওয়ার বিষয়টিকে দেশটির সাম্প্রতিক পরিস্থিতির সঙ্গে মিলিয়ে দেখছেন।
গত শতাব্দির শ্রেষ্ঠ উপন্যাসগুলোর একটি হিসেবে পরিগণিত ‘১৯৮৪’। জর্জ অরওয়েল যখন লিখতে বসেছেন, তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ মাত্র শেষ হয়েছে। শুরু হয়েছে স্নায়ুযুদ্ধ। ফলে উপন্যাসটি ছিল তার চোখে নিকট ভবিষ্যতের একটি দেশের আখ্যান। দেশটির অধিকাংশ মানুষ জীবনযাপন করে ব্রাদারহুড শাসক দলের সুতীক্ষ্ণ নজরদারিতে। শাসক দল আবার নিয়ন্ত্রিত হয় ‘বিগ ব্রাদার’ হিসেবে চিহ্নিত একনায়কের দ্বারা। ব্রাদারহুড দলের শ্লোগান হয়, ‘যুদ্ধই শান্তি, স্বাধীনতাই দাসত্ব, অজ্ঞতাই শক্তি’।
ভ্লাদিমির পুতিনের উত্থানের পর থেকেই রাশিয়ায়
ক্ষমতা কেন্দ্রীকরণ নীতির দিকে ঝুঁকে পড়ে। গত ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেন আক্রমণের সময় এমন
কিছু আইন জারি হয়, যেগুলো অরওয়েলপ্রেমীদের কাছে অজানা না। বিশেষ করে মার্চ মাসে রুশ
সেনাবাহিনী নিয়ে ‘মিথ্যা সংবাদ’ প্রচার হতে থাকে। রাষ্ট্রায়াত্ত সংবাদমাধ্যমে দাবি
করা হয়, ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’। সেই প্রোপাগান্ডা রূপ নিয়েছে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের।
রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত সংবাদমাধ্যমে সকাল ৯টা থেকে ভোররাত ৩টা পর্যন্ত চলে যুদ্ধের সমর্থনে
প্রচারণা।
গত এপ্রিলে প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর ‘মূলহোতা’
হিসেবে পরিচিত রসিয়া সেগোদনিয়া মিডিয়া গ্রুপের সিইও দিমিত্রি কিসেলিয়ভ ইউক্রেন যুদ্ধকে
‘মূলত যুদ্ধরোধী পদক্ষেপ’ হিসেবে দাবি করেছেন। অন্যদিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ
ইউক্রেন আক্রমণকেই অস্বীকার করেছেন। প্রচারণা এতটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেছে যে, কেবল
কিয়েভে চালানো নির্যাতনের সমালোচনা করার অভিযোগে গত সপ্তাহে আট বছরের কারাদণ্ড পেয়েছেন
রুশ রাজনীতিক ইলিয়া ইয়াশিন।
তথ্যের অবাধ প্রবাহকেও নিয়ন্ত্রণ করছে রাশিয়া।
নির্দেশনা দেয়া হয়েছে, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে সত্যায়িত না হলে কোন বক্তব্যকেই
যেন গ্রহণযোগ্য মনে করা না হয়। দেশী-বিদেশী সংবাদমাধ্যমের প্রচারও সীমিত হয়ে পড়ে। ফলে
রাশিয়ার বর্তমান রাষ্ট্রনায়কের মধ্যে অরওয়েলের কল্পিত বিগ ব্রাদারের ছায়া খুঁজে পাচ্ছেন
অনেকেই।
এর আগে বেলারুশেও ২০২০ সালে বেস্টসেলারের
তালিকায় উঠেছিল ‘১৯৮৪’। প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার লুকাশেঙ্কোর বিরুদ্ধে আন্দোলনের ঘটনাও
তখনকার। যদিও রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারভা উপন্যাসটিকে একনায়কতন্ত্রের
বিরুদ্ধে স্বীকৃতি দিতে নারাজ। তার দাবি, অরওয়েল মূলত পাশ্চাত্য উদার নৈতিকতাবাদের
পতন নিয়ে লিখেছেন। একই প্রতিধ্বনি করেছেন ‘১৯৮৪’ উপন্যাসের নতুন রাশিয়ান সংস্করণের
অনুবাদক দারিয়া সেলোভালনিকোভা।
সিএনএন
অবলম্বনে










