এক রাতে রাজা ভাদকের মা স্বপ্ন দেখলেন।
উড়ন্ত যানে চড়ে একজন সন্ন্যাসী জাভায় নামলেন। আর পরদিনই এক কাশ্মীরি ভিক্ষু জাভা দ্বীপে
এসে পৌঁছলেন, যিনি কি না পাল্টে দেবেন পুরো অঞ্চল বিশ্বাস। তার নাম ছিল গুণবর্মণ।
খ্রিস্টিয় চার শতকের শেষ দিকের ঘটনা এটি।
ভাদক তখন জাভার হিন্দু রাজা। তার মা ভিক্ষুকে স্বাগত জানালেন। গ্রহণ করলেন বৌদ্ধ ধর্মের
পঞ্চশীল। কিন্তু ভাদক করলেন না। তখন মা তাকে বললেন, ‘আগের জন্মের পূণ্যের
ফলে এ জন্মে আমরা মা ও পুত্র। কিন্তু তুমি এখনো পঞ্চশীল গ্রহণ করোনি। আমার ভয় হচ্ছে,
এ কারণে পরের জন্মে আমাদের এ সম্পর্ক ছিন্ন হবে।’ ভাদক তখন পঞ্চশীল
গ্রহণ করতে রাজি হলেন। কালক্রমে তিনি আচারনিষ্ঠ বৌদ্ধে পরিণত হলেন।
জাভার লোককাহিনিতে রাজা ভাদকের বৌদ্ধ ধর্ম
গ্রহণ করা নিয়ে এ ধরনের কিংবদন্তি প্রচলিত আছে। আর ভিক্ষু গুণবর্মণ, রাজা ভাদক ও তার
মায়ের এসব আলাপ ‘মেমোয়ারস অব এমিনেন্ট মংকস’-এ উল্লেখ আছে।
পাঁচ শতকে হুই জিয়াও নামক এক ভিক্ষু এ পাণ্ডুলিপি সংকলন করেছিলেন।
ইন্দোনেশিয়ার জাভা দ্বীপে গুণবর্মণ প্রথম
গৌতম বুদ্ধের বাণী নিয়ে যান। এটি ছিল তার ঘটনাবহুল জীবনের আরেকটি অধ্যায়ের শুরু। তার
কয়েক বছর আগে তিনি কাশ্মীরের রাজা হওয়ার সুযোগ স্বেচ্ছায় ছেড়ে দিয়েছিলেন।
যুবরাজ
থেকে ভিক্ষু
৩৬৭ খ্রিস্টাব্দে কাশ্মীরের এক রাজপরিবারে
গুণবর্মণের জন্ম। শৈশব থেকেই আধ্যাত্মিকতার প্রতি তার সহজাত আকর্ষণ ছিল। কিন্তু পরিবার
কখনোই এ প্রবণতাকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখেননি। স্থানীয় ভিক্ষুরা তার বিষয়টি লক্ষ্য করেন।
তারা গুণবর্মণের দয়ালু ও বিনয়ী স্বভাবে মুগ্ধ হন।
গুণবর্মণ ২০ বছর বয়সে গৃহত্যাগ করে ভিক্ষু হন। বৌদ্ধ ধর্ম ও ভারততত্ত্বের জার্মান পণ্ডিত ভ্যালেন্টিনা স্টেশ-রোজেন ‘গুণবর্মণ (৩৬৭-৪৩১): অ্যা কমপারেটিভ অ্যানালাইসিস অব দি বায়োগ্রাফিস ফাউন্ড ইন দি চাইনিজ ত্রিপিটক’ নামক গবেষণাপত্রে লেখেন, ‘তিনি বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থের নয়টি অধ্যায় আত্মস্থ করেছিলেন। তিনি আগম শাস্ত্রে (তান্ত্রিক সাহিত্য ও হিন্দু ধর্মগ্রন্থের সংকলন) দক্ষতা অর্জন করেছিলেন। বৌদ্ধ ধর্মের ১০ হাজার সূত্র তিনি শতবারের বেশি পাঠ করেছিলেন। তিনি বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থের বিভিন্ন অধ্যায় মুখস্থ করেছিলেন। ধ্যান করার ব্যাপারে তিনি বেশ দক্ষ ছিলেন।’
বড়বুদুর বিহার। ছবি: পিকপিএক্স
গুণবর্মণ ভিক্ষু হওয়ার এক দশক পর তার বাবা
বর্ণাদিত্য কোনো উত্তরাধিকারী না রেখেই পরলোকগমন করেন। তখন অনেক মন্ত্রী গুণবর্মণকে
ভিক্ষু জীবন পরিত্যাগ করে কাশ্মীরের সিংহাসনে আরোহণ করতে বলেন। কিন্তু তিনি অনুরোধ
প্রত্যাখ্যান করেন। স্টেশ-রোজেন লেখেন, ‘তিনি মঠ ছেড়ে
চলে যান। পাহাড় অতিক্রম করে নির্জন স্থানে চলে যান, যেন তাকে কেউ খুঁজে না পায়।’
গুণবর্মণের জীবনের এ সময় সম্পর্কে অল্পই
জানা যায়। কয়েক বছর পর তিনি শ্রীলঙ্কায় পৌঁছেন। সেখানে অনুরাধাপুরের কাছে অভয়গিরি মঠে
কিছুকাল ছিলেন। মঠে একজন কাশ্মীরি ভিক্ষুর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন অন্যরা। তাদের মতে,
বিনয় পিটকের একজন পণ্ডিত ছিলেন গুণবর্মণ।
রাজার
পরামর্শক
গুণবর্মণ শ্রীলঙ্কা থেকে সুমাত্রা হয়ে
জাভায় পৌঁছলেন। রাজা ভাদক বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণে তাকে পরামর্শকের পদ দেন। তৎকালীন ইন্দোনেশিয়া
দ্বীপপুঞ্জের কয়েকটি ছোট রাজ্য নিজেদের মধ্যে যুদ্ধে লিপ্ত ছিল। বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষিত
হওয়ার ফলে জাভার রাজা অহিংসার শপথ নিয়েছিলেন। তাই পাশ্ববর্তী একটি রাজ্য জাভা আক্রমণ
করার উপক্রম করলে তিনি কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হন।
ভাদক তখন গুণবর্মণকে বলেন, ‘যদি আমি তাদের
সঙ্গে যুদ্ধ করি, তাহলে নিশ্চিতভাবে অনেক মানুষ আহত ও নিহত হবে। আর যদি আমি তাদের সঙ্গে
যুদ্ধ না করি, তাহলে বড় বিপর্যয় ঘটে যাবে। হে আমার গুরু, এখন আমি বিষয়টি আপনার বিবেচনার
ওপর ছেড়ে দিলাম। আমি জানি না আমার কী করা উচিত্।’
কাশ্মীরি ভিক্ষু রাজ্য রক্ষা করতে উৎসাহ
দিলেন। তিনি বললেন, ‘যদি নৃশংস ডাকাত তোমাকে আক্রমণ করে, তুমি
অবশ্যই নিজেকে রক্ষা করবে। কিন্তু তোমার উচিত নিজের মনে সহানুভূতি তৈরি করা এবং ঘৃণার
কোনো অনুভূতি না রাখা।’ হুই জিয়াওয়ের সংকলনে এ কথোপকথনের উল্লেখ
আছে।
যুদ্ধ কিন্তু হলো না! জাভার সেনাবাহিনী
প্রতিরক্ষার জন্য প্রস্তুত, এ কথা শুনে আক্রমণকারীরা ফিরে গেল। বৌদ্ধ ধর্মে রাজা ভাদকের
বিশ্বাস এতটাই দৃঢ় হলো যে, তিনি সিংহাসন পরিত্যাগ করে ভিক্ষু হয়ে যেতে চাইলেন। কিন্তু
তার মন্ত্রীরা তাকে বুঝিয়ে এ সিদ্ধান্ত থেকে নিরস্ত করলেন। ভাদক তিনটি শর্তে রাজা হিসেবে
থাকতে সম্মত হলেন। প্রথম শর্ত, তার রাজ্যের প্রত্যেক প্রজাকে গুণবর্মণকে সম্মান জানাতে
হবে। দ্বিতীয় শর্ত, সারা রাজ্যে সবাইকে হত্যা করা থেকে বিরত থাকতে হবে। তৃতীয় শর্ত,
কোষাগারে সঞ্চিত অর্থ রাজ্যের দরিদ্র ও অসুস্থদের মাঝে উদারভাবে দান করতে হবে। মন্ত্রীরা
এসব শর্তে রাজি হলেন। রাজা ভাদকের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে জাভা দ্বীপের মানুষেরা বৌদ্ধ
ধর্ম গ্রহণ করলেন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় জাভা বৌদ্ধ ধর্মের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে
পরিণত হলো।
জাভায় বৌদ্ধ ধর্ম প্রতিষ্ঠিত হওয়ার দুই
শতক পর সেখানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় বৌদ্ধ বিহার নির্মিত হলো। এর নাম বড়বুদুর। এক ভিক্ষু
ও এক রাজার যুগলবন্দির পথ ধরে ধীরে ধীরে সমগ্র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও চীনে গুণবর্মণের
খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ল। এশিয়া মহাদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দর্শনার্থীরা তার কাছে আসতে
লাগল। চর্মচক্ষুর সেই দর্শন এখন পরিণত হয়েছে দিব্য দর্শনে।
স্ক্রল
ডট ইন অবলম্বনে নিজাম আশ শামস










