রান্নার কায়দা-কানুন আবিষ্কার মানবসভ্যতায়
একটি বৈপ্লবিক ঘটনা। এর মাধ্যমে কেবল পরিপাকতন্ত্রের ওপর চাপই কমেনি, খাদ্যদ্রব্য হয়েছে
উপাদেয়। এবং ক্রমে রান্না গ্রহণ করেছে স্বতন্ত্র শিল্পের রূপ।
বর্তমানে দেশে দেশে সেরা রাঁধুনী নির্বাচনের
আসরও বসে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগতে পারে, কেমন ছিল প্রস্তর যুগে রান্নার হাল? সেই
কৌতূহলের জবাব হাজির করছে সাম্প্রতিক এক গবেষণা।
উত্তর ইরাকের শানিদার গুহার খ্যাতি মূলত নিয়ান্ডারথাল
কবরের জন্য। কবরের সঙ্গে সেখানে লতাপাতায় তৈরি খাদ্যের নিদর্শন পাওয়া গিয়েছে। গ্রিসের
ফ্রান্সথি গুহাতে মিলেছিল প্রাগৈতিহাসিক রান্নাবান্নার ধারণা। তা দেখতে অনেকটা রুটির
মতো।
দুই নিদর্শনকে পাশাপাশি রাখলে বহু প্রশ্নের
জবাব মিলে বলে দাবি গবেষকদের। ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত জার্নাল
‘এনটিকুইটি’তে তার বিস্তারিত ওঠে এসেছে।
বিচিত্র সব উপাদানে ঠাসা আদিম সমাজের সেই
রান্নার প্রণালী বেশ জটিল। বন্য বাদাম, ডাল, ছোলা, কলাই ও শিমের সঙ্গে মেশানো হতো লতাপাতা
ও ঘাস জাতীয় উদ্ভিদ। ব্যবহার করা হতো সরিষা। পিষতে যেন সহজ হয়, এর জন্য ডালকে ভিজিয়ে
নেয়া হতো। পাথরের আঘাতে ছাড়িয়ে নেয়া হতো খোসা।
শানিদার গুহায় পাওয়া লতাপাতা অন্তত ৭০ হাজার
বছর আগের। তখন সেখানে নিয়ান্ডারথালরা বসবাস করত। হোমো স্যাপিয়েন্সের নিকটতম প্রজাতি
নিয়ান্ডারথাল। প্রায় ৪০ হাজার বছর আগে বিলুপ্ত হয়ে যায় পৃথিবী থেকে। অন্যদিকে ফ্রাঞ্চথি
গুহায় প্রাপ্ত খাবারের অবশিষ্টাংশ ১২ হাজার বছর আগের। তখন সেখানে হোমো স্যাপিয়েন্স
বসবাস করছে। প্রজাতিগত ভিন্নতা থাকার পরও দুই স্থানে রান্নায় একই পদ্ধতি ব্যবহার করা
হয়েছে বলে দাবি জানিয়েছেন ইউনিভার্সিটি অব লিভারপুলের বিজ্ঞানী ড. সিরিন কাবুকচু।
তিনি বলেন, রান্নার উপাদান ও প্রক্রিয়া দুই
প্রজাতিতে তফাত নেই। যদিও শানিদার গুহায় হোমো স্যাপিয়েন্স আগমন করার পরই কেবল সেখানে
রান্নায় সরিষা ব্যবহার শুরু হয়।
শানিদার গুহায় প্রাপ্ত রান্নার চিহ্নটি আফ্রিকার বাইরে পাওয়া সবচাইতে পুরোনো নিদর্শন। এভাবে নানা উপাদান মিশিয়ে রান্নার প্রণালি চমৎকৃত করেছে সিরিনকে। এতদিন মনে করা হয়েছে, প্রাগৈতিহাসিক মানুষেরা প্রধানত মাংসই গ্রহণ করতো খাদ্য হিসেবে। কিন্তু এই গবেষণা ভিন্ন সংকেত দেয়।
যথাক্রমে গ্রিস ও ইরাকের গুহায় পাওয়া খাবারের নমুনা
সিরিনের দাবি, প্রাচীন সভ্যতায় খাদ্যাভ্যাস
নির্ভর করত মূলত তাদের বসবাসের অঞ্চলের উপর। তাদের বসবাসের মতো খাদ্যাভ্যাসও ছিল বৈচিত্র্যে
ঘেরা। শানিদার গুহার ফলাফল তারই প্রমাণ।
এই গবেষণা অন্য একটা দিকেও আলো ফেলে। এখন
পর্যন্ত মনে করা হয়, মানুষ শিকার সভ্যতা থেকে কৃষি সভ্যতায় প্রবেশের সময় রান্নার প্রক্রিয়া
রপ্ত করেছে। আর সেই সময়কাল ৬-১০ হাজার বছর আগে। শানিদার গুহার নিদর্শন থেকে অনায়াসে
ভিন্ন অনুসিদ্ধান্তে আসা যায়। অর্থাৎ প্রস্তর যুগের জীবন প্রণালী কেবল যুদ্ধ বিগ্রহে
পরিবেষ্টিত ছিল না। খাবারের প্রক্রিয়া ও স্বাদের দিকে মনোযোগ দেয়ার মতো যথেষ্ট অবসর
ও মানসিক পরিণতি ছিল।
ইউনিভার্সিটি অব সাউদাম্পটনের অধ্যাপক জন ম্যাকনাব যদিও গবেষণায় ছিলেন না। তবে ফলাফল দেখে উচ্ছ্বসিত তিনি। তার ভাষায়, শানিদার গুহা নিয়ে আরো গবেষণা প্রয়োজন। জটিল খাদ্য তৈরির পেছনে এই প্রস্তুতির নিদর্শন অনেক বড় কিছু।
সিএনএন অবলম্বনে










