আকাশে তুলার মতো মেঘ। নিচে পাহাড়ঘেঁষে
কাঠের তৈরি বাড়ি ও গৃহপালিত পশুদের বিচরণ। উপকূলে ছোট-বড় মাছ ধরার ট্রলার। দূর থেকে
ছবির মতোই মনে হয় সবকিছু। আরো মনে হয়, কত চমৎকার জীবন ফ্যারো দ্বীপপুঞ্জের মানুষের।
কিন্তু সেখানে রয়েছে লৈঙ্গিক ভারসাম্যে দুর্লঙ্ঘ্য এক বাধা।
আইসল্যান্ড ও নরওয়ের মাঝামাঝি ফ্যারোর
অবস্থান। দ্বীপটির সৌন্দর্যের টানেই ছুটে গিয়েছিলেন ফটোগ্রাফার আন্দ্রে গিয়েস্টভাঙ।
ক্যামেরায় বন্দি করেছেন স্থানীয়দের যাপিত জীবন। সেখানে আছে অজানা অনেক গল্প, সুখ-দুঃখের
অশ্রুত ইতিহাস।
দ্বীপের ওপর আদ্রের প্রকাশিত বইয়ের নাম
‘আটলান্টিক কাউবয়’। ফ্যারোর নৃবিজ্ঞানী
ফিরোজ গাইনির ১৯৯৭ সালের বই থেকে প্রভাবিত হয়ে এই নাম। অবশ্য আরো একটি কারণও আছে, তা
একটু পরেই বলছি। ওই প্রকাশনায় উঠে এসেছে দ্বীপের লৈঙ্গিক অনুপাতের ভারসম্যহীনতা।
ফ্যারো দ্বীপপুঞ্জে প্রথম বসতি সম্ভবত ষষ্ঠ শতকের দিকে। আইরিশ পাদ্রীরা ছিল যার অগ্রদূত। ক্রমে বাড়তে থাকে জনসংখ্যা। তবে সেখানকার নাগরিকদের প্রধান অংশই পুরুষই। অর্থনীতি আবর্তিত হয় শারিরীক শ্রমের ওপর ভিত্তি করে। সে কাজগুলোও পুরুষরাই করে। আর মোট শ্রমশক্তির ১৫ শতাংশ নিযুক্ত মৎস্য সংক্রান্ত পেশায়।
ছবি: সিএনএন
দ্বীপপুঞ্জটি ডেনমার্কের অন্তর্ভুক্ত।
সেখানকার তরুণীরা সাধারণত দেশটির রাজধানী কোপেনহেগেনে পড়াশোনা করতে যায়। কেউ চলে যায়
ইউরোপের অন্যান্য দেশে। তাদের অনেকেই কখনো আর ফেরে না। ২০২১ সালে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের
তথ্য অনুযায়ী, ফ্যারোর মোট জনসংখ্যার ৪৮ দশমিক ২ শতাংশ নারী। প্রতি ১০০ নারীর বিপরীতে
১০৭ জন পুরুষ। অর্থাৎ দেশটিতে ২ হাজার নারী ঘাটতি রয়েছে। ফলে স্থানটি লৈঙ্গিক দিক থেকে
ক্রমেই পরিণত হয়েছে ইউরোপের সবচেয়ে ভারসম্যহীন অঞ্চলে।
সংখ্যাটিকে হয়তো বড় মনে হয় না। কিন্তু
যেখানে ১৭টি দ্বীপ মিলিয়ে মাত্র ৫৩ হাজার মানুষ, যেখানে এই পার্থক্য বড়সড়ই।
ফ্যারোর প্রধানমন্ত্রী আকসেল ভি জোহানসেন
ক্ষমতায় এসেছেন ২০১৫ সালে। নারী ও পুরুষদের অনুপাত নিয়ে তার দল বেশ সরব। লিঙ্গ সমতা
ও কর্মসংস্থানে নতুন বিনিয়োগের মাধ্যমে দ্বীপগুলোকে নারীদের কাছে আকর্ষণীয় করার চেষ্টায়
কমতি নেই। সিঙ্গেল মাদারদের জন্য অনেককিছু সহজ করা হয়েছে। রাজধানীর বিশ্ববিদ্যালয়ে
রয়েছে বিশেষ অফার ও কভিড-১৯ মহামারীর সময় আলাদাভাবে দেয়া হয় রিমোট ওয়ার্কের সুযোগ।
নব্বইয়ের দশকে অর্থনৈতিক সংকটের দরুন বিপুলসংখ্যক
মানুষ ফ্যারো ত্যাগ করে। পরবর্তীতে পরিকল্পিতভাবে বাড়তে থাকে পর্যটন ও পরিষেবা খাত।
ফুলে উঠতে থাকে জিডিপি। বর্তমান জিডিপি ২০০০ সালের তুলনায় তিনগুণ বেশি।
এত পরিবর্তনের মাঝেও ফ্যারোয় নারীদের অনুপস্থিতি
দৃশ্যমান। আন্দ্রের প্রকল্পটি পুরোদস্তুর ফ্যারোর পুরুষদের নিয়ে। ছয় বছর ধরে বেশ কয়েকবার
ভ্রমণ করেছেন ফ্যারোতে। অবিবাহিত মানুষদের জীবনযাত্রা সম্পর্কে ধারণা নিয়েছেন। তাদের
কেউ হয়তো ভেড়ার পশম ছাড়াচ্ছে। কেউ হয়তো কসাইখানায় জবাই করা ছাগল নিয়ে ব্যস্ত, কেউ বেরিয়ে
পড়েছে ডলফিন শিকারে। নারীদের উপস্থিতি সেখানে খুব একটা চোখে পড়ে না। তার চেয়ে বড় কথা
এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে, ভবিষ্যত চিত্রও অনুকূলে থাকবে না।
আদ্রে জানান, ফেরোর রাজধানী তোরশাভনে নারীদের অভাব ততটা স্পষ্ট নয়। কিন্তু ছোট গ্রামে ভ্রমণ করলে লৈঙ্গিক ভারসাম্যহীনতা বেশ বেশ দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। বিশেষ করে উপকূলীয় এলাকার বন্দরে পুরুষদের আড্ডার জায়গায় একাকীত্বের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ধরা দেয়। এমনকি সেখানকার বাড়িগুলোতে পুরুষদের একাকীত্বের ছাপ বিদ্যমান। আদ্রের বইতে পুরুষ-শাসিত সমাজে জীবনের বাস্তবতা উন্মোচিত হয়েছে। যেখানে একজন তাকে বলছেন, আমি ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি যে একজন স্ত্রী খুঁজে পাব। কিন্তু তিনি হয়তো আমার কথা শুনতে পাচ্ছেন না।
ছবি: সিএনএন
আবার অনেকে স্ত্রী-সন্তান ছাড়াও দৃঢ় পারিবারিক
বন্ধনের মধ্যে রয়েছেন। ৪০ বছর বয়সী এক ব্যক্তি জানান, তার একাকীত্বের বিকল্প হলো দৃঢ়
পারিবারিক বন্ধন। স্ত্রী ও সন্তান না থাকলেও তার পরিবার রয়েছে। যখন কারো বড় পরিবার
থাকে, তখন নিজের কিছু আছে এমন শান্তি ও স্বাধীনতা থাকে।
‘আটলান্টিক কাউবয়’
নামটি বেছে নেয়ার পেছনে আন্দ্রে যোগ করেন, সাক্ষাৎকারে এক ব্যক্তি আমাকে বলেছিলেন যে
ফ্যারো দ্বীপপুঞ্জ পুরুষদের জন্য উপযুক্ত খেলার মাঠ। আরো বলছেন, এটি এমন একটি জায়গা
যেখানে আপনি মাছ ধরতে পারেন। ঘরের বাইরে থাকতে পারেন। একরকম অন্তহীন স্বাধীনতা উপভোগ
করতে পারেন।
একাকীত্ব ছাড়াও ফ্যারোর পুরুষদের জন্য এই দ্বীপপুঞ্জে বেছে থাকা কঠোর পরিশ্রমসাধ্য বিষয়। ফলে এখানে শক্তিশালী পুরুষের ধারণাটি আগা-গোড়া বিদ্যমান। যা পুরো সমাজকে ভীষণভাবে প্রভাবিত করে। ফলশ্রুতিতে ফ্যারোর নারীদেরও টিকে থাকার তাগিদে কঠিন ও শক্তিশালী হতে হয়।
সিএনএন অবলম্বনে










