প্রকৃতিতে টিকে থাকার লড়াইয়ে কেবল শারীরিক শক্তিই শেষ কথা নয়, বরং বুদ্ধিমত্তা ও সঠিক তথ্যের আদান-প্রদান যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার এক অনন্য নজির স্থাপন করেছে স্পাইডার মাঙ্কি বা মাকড়সা-বানর। সম্প্রতি মেক্সিকোর ইউকাটান উপদ্বীপে পরিচালিত সাত বছরের এক দীর্ঘ গবেষণায় দেখা গেছে, এ বানররা বনের কোথায় সেরা ফল পাওয়া যাবে, তা পরস্পরের সঙ্গে শেয়ার করার জন্য এক জটিল ও কার্যকর সামাজিক নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে।
গবেষকরা দেখেছেন, স্পাইডার মাঙ্কিরা দীর্ঘ সময় ধরে একই সামাজিক গণ্ডিতে আটকে থাকে না। তারা প্রতিনিয়ত নিজেদের ছোট ছোট উপদলে ভাগ করে নেয়, বারবার সঙ্গী পরিবর্তন করে। বিজ্ঞানীরা একে বলছেন ‘ফিশন-ফিউশন’ সমাজ ব্যবস্থা। অর্থাৎ, সকালে হয়তো একটি বানর তিনজন সঙ্গীর সঙ্গে খাবার খুঁজছে। বিকালে সে সম্পূর্ণ নতুন এক দলে যোগ দিচ্ছে। এ প্রতিনিয়ত সঙ্গী বদলানোর মূল উদ্দেশ্য হলো—তথ্য সংগ্রহ ও বিনিময়।

বনের গহীনে ‘হিডেন জেম’
এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিদ ড. ম্যাথিউ সিল্কের মতে, এটি কোনো এলোমেলো দলবদলের ঘটনা নয়। প্রতিটি বানরের বনের নির্দিষ্ট কিছু এলাকা সম্পর্কে খুব ভালো ধারণা থাকে। কেউ জানে কোন গাছটিতে প্রচুর ফল ধরেছে, আবার কেউ জানে সেই ফলগুলো ঠিক কবে খাওয়ার উপযোগী হবে।
গবেষণায় একটি চমৎকার উদাহরণ দেয়া হয়েছে: ধরা যাক, একটি দল জানে একটি বড় ফলের গাছের অবস্থান। অন্য একটি দল জানে বনের সেই অংশে ফল পাকার সঠিক সময়। যখন এই দুই দল একে অপরের সঙ্গে মেশে, তখন তাদের সম্মিলিত জ্ঞান একটি নতুন পূর্ণাঙ্গ তথ্যের জন্ম দেয়। এতে পুরো গোষ্ঠীটি লাভবান হয়। অনেকটা শহরের আনাচে-কানাচে লুকিয়ে থাকা ভালো রেস্টুরেন্টের খবর আদান-প্রদান করার মতো!
গণিত ও প্রকৃতির ভারসাম্য
হেরিয়ট-ওয়াট ইউনিভার্সিটির গবেষক রস ওয়াকার বানরদের এ আচরণের ওপর একটি গাণিতিক মডেল তৈরি করেছেন। তিনি দেখেছেন, স্পাইডার মাঙ্কিরা এক অদ্ভুত ভারসাম্য বজায় রেখে চলে। যদি তারা সব সময় একসাথে থাকতো, তবে বনের নতুন এলাকাগুলো চেনা সম্ভব হতো না। আবার যদি তারা খুব বেশি ছড়িয়ে পড়তো, তবে একে অপরকে তথ্য দেয়ার সুযোগ পেত না।
গবেষণায় দেখা গেছে, এ বানররা এমন এক 'মিডল গ্রাউন্ড' বা মধ্যপন্থা বেছে নিয়েছে যা তাদের যৌথ বুদ্ধিমত্তাকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যায়। এর ফলে পুরো দলটি বনকে একক কোনো প্রাণীর চেয়ে অনেক বেশি ভালোভাবে চিনতে পারে।

বিলুপ্তির পথে এক বুদ্ধিমান প্রজাতি
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এ অত্যন্ত বুদ্ধিমান প্রাণীরা বর্তমানে বিপন্ন প্রজাতির তালিকায় রয়েছে। সেন্ট্রাল আমেরিকান স্পাইডার মাঙ্কি বা ‘ব্ল্যাক-হ্যান্ডেড’ মাঙ্কি নামে পরিচিত এ প্রজাতিটির অস্তিত্ব এখন সংকটে। মেক্সিকো ও এডিনবরার বিজ্ঞানীদের এ যৌথ গবেষণা কেবল তাদের বুদ্ধিমত্তাই প্রকাশ করেনি, বরং একটি ভঙ্গুর ইকোসিস্টেমে তারা কীভাবে তথ্যের ওপর ভিত্তি করে টিকে থাকে, তার গুরুত্বও তুলে ধরেছে।
প্রকৃতির এই জটিল পাঠ আমাদের শেখায় যে, সহযোগিতা এবং সঠিক তথ্য বিনিময় কেবল মানুষের সমাজেই নয়, বরং বনের গহীন কোণেও সমানভাবে কার্যকর।
দ্য গার্ডিয়ান অবলম্বনে










