গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই গরমে অতিষ্ঠ বাংলাদেশসহ পুরো এশিয়া মহাদেশ। বিশেষজ্ঞদের উদ্ধৃত করে গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়েছে, এ বছর গরম এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যা মানুষের অভিযোজন ক্ষমতাকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি এপ্রিলে রেকর্ড তাপমাত্রা দেখেছে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার বেশিরভাগ দেশ এবং থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, লাওস, ভিয়েতনাম ও চীন।এই অসহনীয় পরিস্থিতিতে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে বেড়ে যাচ্ছে বিদ্যুতের ব্যবহার। এমনকি দেশে দেশে বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
এপ্রিলের
শুরুর দিকে ঢাকার তাপমাত্রা ছাড়িয়েছিল ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এই তাপমাত্রা
বাংলাদেশের ৫৮ বছরের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। তীব্র তাপপ্রবাহের মধ্যে প্রচণ্ড রোদে
বিভিন্ন স্থানে রাস্তার পিচ গলে গিয়েছে। বেঁকে গেছে রেললাইনও। গরমের ফলে বিদ্যুৎ ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় লোডশেডিংয়ের
মাত্রাও বেশ কয়েকগুণ বেড়েছে।
গত মঙ্গলবার (২৫ এপ্রিল) মিয়ানমারের চারটি আবহাওয়া অফিস রেকর্ড তাপমাত্রার খবর দিয়েছে। দেশটিতে ওইদিন সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
পরদিন বুধবারও ইয়াঙ্গুনের কিছু এলাকায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৪২ দশমিক
২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। যা ছুঁয়েছে দেশটির সর্বোচ্চ উষ্ণতার রেকর্ড।
থাইল্যান্ডেও তাপমাত্রা ছাড়িয়েছে স্বাভাবিকতার
সীমা। অসুস্থ হওয়া এড়াতে দেশটির রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকার মানুষকে প্রয়োজন ছাড়া বাসার
বাইরে যাওয়ার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে। গত শনিবার ব্যাংককে তাপমাত্রা ছিল ৪২
ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর্দ্রতা কারণে অনুভূত হয়েছে ৫৪ ডিগ্রি
সেলসিয়াসের সমান। গরমের এই মাসে থাইল্যান্ডে বিদ্যুৎ খরচও পৌঁছেছে রেকর্ডে।
গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়েছে, এশিয়ার দেশগুলোতে
মানুষ শীতলতার জন্য হাতপাখা বহন করতে শুরু করেছে। অনেকে এসিযুক্ত শপিংমলগুলোতে গিয়ে
আশ্রয় নিয়েছে, এমনকি শহরের বাতাস আর্দ্র রাখতে বিভিন্ন ভবন থেকে স্প্রে করা হয়েছে পানি।
ফিলিপাইনের শিক্ষার্থীরা এপ্রিলসহ বছরের
সবচেয়ে উষ্ণ সময়গুলো কাটায় বিদ্যালয়ে। সংবাদমাধ্যম বলছে, দেশটির রাজধানী ম্যানিলায় অন্তত
১০০ শিশুকে গরমজনিত কারণে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এ বছর গরমের কারণে ফিলিপাইনে
স্কুলের ক্যালেন্ডার সংশোধন করা হয়েছে। শিশুদের অসুস্থ হওয়া এড়াতে শত শত স্কুলে অনলাইন
ক্লাস চালু করা হয়েছে।
গার্ডিয়ান বলছে, ২০২২ সালকে এ যাবৎকালের
সবচেয়ে উষ্ণ বছরগুলোর অন্যতম মনে করা হচ্ছিল। তবে চলতি ২০২৩ সাল ওই বছরকেও টেক্কা দিচ্ছে।
মূলত এল নিনো পরিস্থিতি ফিরে আসার ফলে তাপমাত্রা আরো বাড়তে পারে বলেও ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ক্লাইমেট সায়েন্স পলিসি ইনস্টিটিউটের দক্ষিণ
এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক প্রধান ড. ফাহাদ সাঈদ বলছেন, এই গরমে সবচেয়ে বেশি
কষ্ট পাচ্ছে দরিদ্ররা। বিশেষ করে যারা কৃষি ও মাছধরার মতো জীবিকার সঙ্গে জড়িত, তাদের
জন্য এই গরম ভয়াবহ। গরম এখন মানুষের অভিযোজন ক্ষমতাকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
এদিকে হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলে বৈশ্বিক
উত্তাপের নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন বিজ্ঞানীরা। ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড
মাউন্টেন ডেভেলপমেন্টের (আইসিমোড) বিজ্ঞানী দীপশিখা শর্মা বলেছেন, ওই এলাকায় বিশ্বের
তৃতীয় বৃহত্তম জমাট বরফের স্তূপ রয়েছে। আইসিমোডের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী উষ্ণতা
বৃদ্ধির হার স্বাভাবিকের তুলনায় দ্বিগুণ। ফলে হিন্দুকুশ এলাকা থেকে অন্তত এক-তৃতীয়াংশ
বরফ গলে যেতে পারে। এই পরিস্থিতি বাস্তুতন্ত্র ও মানবসভ্যতার জন্য বিশাল হুমকি।
এ জলবায়ু বিজ্ঞানী আরো বলছেন, মানবসৃষ্ট
জলবায়ু পরিবর্তনই এশিয়া মহাদেশে তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রধান কারণ। সম্ভাব্য সংকট কাটাতে
এখনই জলবায়ুর ইতিবাচক পরিবর্তন নিশ্চিত করতে বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে।










