দৈনন্দিন খাবার তালিকায় অতি গোবেচারা, কিন্তু
উপমহাদেশে প্রায় অপরিহার্য এক রসদ ডাল। দানা জাতীয় এ শস্যের রয়েছে নানান জাত, এর মধ্যে
কোনো একটি যে নীরব ঘাতক হয়ে উঠতে পারে, তা ছিল একেবারেই অকল্পনীয়।
উনবিংশ শতাব্দীর ভারত কোনোভাবেই বসবাসের জন্য
আদর্শ ছিল না। খরার কারণে প্রায় দুর্ভিক্ষ লেগে থাকত। টানা অনাহারে কিংবা রোগে ভুগে
লাখ লাখ মানুষ মারা গিয়েছিল ওই সময়। আর দেখা দিয়েছিল একটি নতুন রোগ।
অজানা এক কারণে পক্ষাঘাতের শিকার হতে লাগল
হাজার হাজার মানুষ। অবশ হয়ে যাচ্ছিল তাদের পা। গ্রামের পর গ্রামে বাড়তে লাগল পঙ্গু
মানুষের সংখ্যা। কেউ পা টেনে টেনে হাঁটছেন, কেউ বা লাঠি হাতে হোঁচট খেতে খেতে এগোচ্ছেন।
কেউ হামাগুড়ি দিচ্ছেন। আরো অদ্ভুত ব্যাপার হলো, অধিকাংশ ক্ষেত্রে এ রোগ হচ্ছে গরীবদের।
ধনীদের ক্ষেত্রে হার প্রায় শূন্যের কোঠায়।
এ রোগের কারণ অনুসন্ধানে মূল অপরাধী হিসেবে
শনাক্ত হলো এক প্রকারের ডাল, সাধারণ্যে তা ‘খেসারি’ নামে পরিচিত। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি
সময়ে এসে ভারতীয় বিজ্ঞানী ও রোগতত্ত্ববিদরা একমত হন যে, যদি দীর্ঘ সময় ধরে বেশি পরিমাণ
খেসারি খাওয়া হয়, তাহলে এ রোগ হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা। রোগের নাম ল্যাথাইরিজম। তাদের সুপারিশের
ভিত্তিতে ভারত সরকার ১৯৬১ সালে খেসারি ডালের বিপণন ও মজুদ নিষিদ্ধ করে।
বোঝাই যাচ্ছে, খেসারি মূলত গরীবের ডাল। বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্সের নিউরোলজি বিভাগের প্রধান ডক্টর বিজয়নাথ মিশ্র এমনটাই দাবি করেছেন। এক বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘খেসারি হলো গরীবের ডাল। কম খরচে প্রচুর পরিমাণ আমিষের চমত্কার একটি উত্স। এটি রান্না করতে জ্বালানিও লাগে কম।’ স্বাভাবিকভাবেই দরিদ্র জনগোষ্ঠী প্রচুর পরিমাণে খেসারি ডাল খেত।
ছবি: দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস
আরো একটি ব্যাপার ছিল। জমিদাররা দরিদ্র কৃষকদের
বেতন হিসেবে নগদ অর্থের পরিবর্তে ফসল দিত। প্রায়শ তা হতো সস্তা ও মোটা খেসারি। ফলে
জীবন ধারণের জন্য হতভাগা চাষিরা কেবল খেসারি ডালের ওপর নির্ভরশীল ছিল। দুর্ভিক্ষপীড়িত
সে সময়ে অন্য কিছু কেনার মত সামর্থ্য বা নগদ অর্থ কোনোটাই তাদের ছিল না।
ভোজপুরী একটি লোকসঙ্গীতে এ চিত্র চমত্কারভাবে
উঠে এসেছে। গানের কথাগুলো এমন— আংগাজি রাহাল ভাইয়া, আংগাজি রাহাল ভাইয়া!/ এক মাহিনভা
মে পাঁচ গো রুপাইয়া হো/ খাইকে মোটা চাউল, রাহাল খুবে লাল/ কোকো কে তেল আউর খেসারি কা
ডাল! (দাস হয়ে থাকো ভাইয়া, দাস হয়ে থাকো!/ প্রতি মাসে পাঁচ রুপি পাবে, নিশ্চিন্তে থাকো/
আনন্দে থাকব আর খাব মোটা চাল/ নারিকেলের তেল আর খেসারির ডাল!)
এ প্রান্তিক কৃষকেরা কেবল দরিদ্রই ছিলেন না,
বর্ণপ্রথায় তারা ছিলেন একেবারে নিম্নস্তরে। যখন তারা ল্যাথাইরিজমে আক্রান্ত হতো ও জমিতে
চাষ করতে পারত না, জমিদাররা তাদেরকে তাড়িয়ে দিত। তাদের সামনে তখন কেবল দুটো পথ খোলা
থাকত- ভিক্ষা অথবা পাথর ভাঙ্গা। পাটনা, বেনারস, বোম্বে ও কলকাতায় সে সময় অদ্ভুত রোগে
বিড়ম্বিত অসংখ্য ভিক্ষুকের দেখা মিলত।
একটি মজার ব্যাপার উল্লেখ করে লেখাটির ইতি
টানা যাক। পুরুষদের চেয়ে নারীদের এ রোগ কম হতো। কারণ, পুরুষতান্ত্রিক সমাজে এমনকি দুর্ভিক্ষের
সময়েও পুরুষেরা নারীদের চেয়ে বেশি খাবার খেতো। আর দরিদ্র পুরুষদের জন্য তখন খাবার বলতে
তো একটিই- খেসারি!
স্ক্রল ডট ইন অবলম্বনে নিজাম আশ শামস










