[ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনের বীজ বপনকারী অগ্রসেনানীদের মধ্যে অধ্যাপক আবদুল গফুর ছিলেন অন্যতম। ভাষা আন্দোলনের নির্ভীক মুখপত্র সৈনিক পত্রিকার সহসম্পাদক ও সম্পাদক হিসেবে তিনি যে সংগ্রামী ভূমিকা পালন করেছেন তা ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে অম্লান হয়ে থাকবে।

আবদুল গফুর ১৯২৯ সালের মার্চে ফরিদপুরের পাংশা থানার দাদপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা গভর্নমেন্ট ইসলামিয়া ইন্টারমিডিয়েট কলেজ থেকে ১৯৪৭ সালে আইএ পাস করেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অনার্স নিয়ে ভর্তি হন। এ সময় ১৯৪৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর অধ্যাপক আবুল কাসেমের উদ্যোগে তমদ্দুন মজলিস গঠিত হয়। কিছুদিন পর শাহেদ আলীর উৎসাহে তিনি তমদ্দুন মজলিসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হয়ে পড়েন। আন্দোলনের প্রতি সহজাত আকর্ষণের জন্য তিন বছরের অনার্স কোর্স সমাপ্ত হওয়া সত্ত্বেও তার পরীক্ষা দেয়া হয়নি। লেখাপড়ায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির ফলে প্রত্যক্ষভাবে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন তিনি।

প্রথম দিকে তিনি সৈনিকের সহসম্পাদক হিসেবে যোগদান করেন এবং পরে সম্পাদক নিযুক্ত হন। এককালের সৈনিক সম্পাদক, ভাষা আন্দোলনের নির্ভীক সৈনিকের এ সাক্ষাৎকার ইতিহাসের মূল্যবান উপকরণে সমৃদ্ধ হবে বলে আমরা মনে করি।]

তমদ্দুন মজলিসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হওয়ার মাধ্যমেই কি আপনি ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন?

হ্যাঁ, একরূপ তাই বলা যায়। তমদ্দুন মজলিস আর তার মুখপত্র সৈনিক পত্রিকার মাধ্যমেই আমি ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করি।৷

কীভাবে তমদ্দুন মজলিসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হন? তমদ্দুন মজলিসের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আবুল কাসেমের সঙ্গে কি আপনার পূর্বপরিচিতি ছিল?

শাহেদ আলীর উৎসাহ-উদ্দীপনায় আমি তমদ্দুন মজলিসে যোগ দিই। আবুল কাসেমের সঙ্গে কোনো পূর্বপরিচিতি ছিল না। তবে অপরিচিত অবস্থায়ই আকস্মিকভাবে সাক্ষাৎ ঘটে।

আমি তখন জিন্দেগী পত্রিকার একজন স্টাফ। মরহুম কাজী আফসার উদ্দীন আহম্মদ ও এসএম বজলুল হকের যুগ্ম সম্পাদনায় তখন জিন্দেগী বের হচ্ছে। একদিন কাসেম সাহেব জিন্দেগী অফিসে গিয়ে তমদ্দুন মজলিস প্রকাশিত ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু?’ শীর্ষক পুস্তিকাটি আমাকে দিলেন জিন্দেগীতে রিভিউর জন্য। কাসেম সাহেব তখন আমার কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত। আমি পুস্তিকাটি গ্রহণ করি সত্য, কিন্তু ভাষা নিয়ে এতখানি তৎপরতা তখন আমার কাছে যুক্তিগ্রাহ্য ছিল না বলে ব্যাপারটি ততটা ভালো লাগেনি।

ভাষা প্রশ্নটি আপনার তখন ভালো না লাগার কারণ কী ছিল?

কারণ আর কি, সবে পাকিস্তান হয়েছে, এ নিয়ে সে সময় ততটা বাড়াবাড়ি আমার কাছে যুক্তিসংগত মনে হয়নি।

কখন থেকে মজলিসের রাষ্ট্রভাষা-সংক্রান্ত কর্মতৎপরতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হন?

ঠিক কখন যুক্ত হয়েছি বলা মুশকিল। তবে প্রত্যক্ষভাবে তমদ্দুন মজলিসে যোগ দেয়ার আগে থেকেই শাহেদ আলীর সঙ্গে মজলিস সম্পর্কিত আলাপ-আলোচনায় এর প্রতি অনুরাগী হয়ে উঠি এবং স্বেচ্ছায় মজলিসের রাষ্ট্রভাষা সম্পর্কিত সেমিনার ও আলোচনা সভায় উপস্থিত থাকতে শুরু করি। পোস্টারিং লেখা থেকে শুরু করে বিভিন্ন কাজেও নিজেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে যুক্ত করে ফেলি। প্রথম দিকে বিচ্ছিন্নভাবে অংশ নিলেও পরে মজলিসের কর্মতৎপরতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত হয়ে পড়ি।

সৈনিক পত্রিকা কোন সময় থেকে প্রকাশ হয়? তমদ্দুন মজলিসের মুখপত্র হিসেবে সৈনিক সম্পর্কে আপনার অভিমত কী?

১৯৪৮ সালের ১৪ নভেম্বর সৈনিকের প্রকাশনা শুরু হয়। সৈনিক, তমদ্দুন মজলিস, রাষ্ট্রভাষা—এর কোনোটিকে কোনোটি থেকে বিচ্ছিন্ন করার মতো নয়। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে সৈনিকের নিরবচ্ছিন্ন বলিষ্ঠ ভূমিকা সংবাদপত্রজগতে এবং জাতীয় জীবনে এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের সংযোজন করেছে।

মজলিসের রাষ্ট্রভাষা সম্পর্কিত সব সেমিনার ও আলোচনা সভার রিপোর্ট কি সৈনিকে প্রকাশ হতো?

হ্যাঁ, সব রিপোর্ট তো প্রকাশ হতোই, এছাড়া বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার স্বপক্ষে অনেক ফিচার, প্রবন্ধ এমনকি কার্টুন পর্যন্ত নিয়মিতভাবে প্রকাশ হতো। ছাত্র-জনতাকে রাষ্ট্রভাষা বাংলার স্বপক্ষে সচেতন এবং আন্দোলনকে দুর্বার করার জন্য সৈনিক সদা সচেষ্ট ছিল।

মজলিসের অফিস কোথায় ছিল? মজলিসের ঘরোয়া তৎপরতা বা সাংগঠনিক সভাগুলো কোথায় অনুষ্ঠিত হতো?

১৯ নম্বর আজিমপুরে মজলিস ও সৈনিকের অফিস ছিল । প্রথম দিকে কিছুদিনের জন্য রশিদ বিল্ডিংয়ের কাছে সুরুজ্জামান মেসে মজলিসের অফিস ছিল। পরে আবার ১৯ নম্বর আজিমপুর রোডে মজলিসের অফিস স্থানান্তর হয়। এখানে কাসেম সাহেব থাকতেন। সৈনিকের সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি শাহেদ আলীও এখানে থাকতেন। ১৯ নম্বর আজিমপুরের এ মজলিস অফিসকে কেন্দ্র করে আন্দোলনের অনেক তৎপরতা চলত। এছাড়া ইউনিভার্সিটি হলে অবস্থানরত দু-একজন মজলিস কর্মীর কক্ষেও সভা অনুষ্ঠিত হতো। এসএম হলে সৈয়দ নজরুলের কক্ষেও মাঝে মধ্যে মজলিসের ঘরোয়া বৈঠক অনুষ্ঠিত হতো।

সৈয়দ নজরুল ইসলাম কি তমদ্দুন মজলিসের কর্মী ছিলেন?

হ্যাঁ, তা না হলে মজলিসের বৈঠক তার কক্ষে অনুষ্ঠিত হবে কেন?

১৯৫২ সালে সৈনিকের সম্পাদনা কে করতেন?

তখন আমিই সম্পাদক ছিলাম। আমিও কাসেম সাহেবের সঙ্গে ১৯ নম্বর আজিমপুরে থাকতাম।

নবাবপুরে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদের মিটিংয়ে আপনি উপস্থিত ছিলেন?

হ্যাঁ, উপস্থিত ছিলাম।

কর্মপরিষদের সদস্য হিসেবে, নাকি সৈনিকের সংবাদ সংগ্রহের জন্য?

কর্মপরিষদের সদস্য হিসেবেই আমি উপস্থিত ছিলাম।

মিটিংয়ের সিদ্ধান্তের কথা স্মরণ আছে?

১৪৪ ধারা না ভাঙার জন্যই মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। তবে ছাত্রদের দাবির মুখে বলা হয় ১৪৪ ধারা ভাঙা বটতলার ছাত্রসভায় ছাত্রদের ভূমিকার ওপর নির্ভর করবে। সেখানে কর্মপরিষদের সিদ্ধান্ত মেনে না নিলে স্বাভাবিকভাবে কর্মপরিষদ ভেঙে যাবে। ৷

গুলিবর্ষণের সময় আপনি ঘটনাস্থল বা তার আশপাশে উপস্থিত ছিলেন?

না, গুলিবর্ষণের সময় সম্ভবত আমি সৈনিক অফিসে ছিলাম।

একুশে ফেব্রুয়ারির গুলিবর্ষণের পর পরবর্তী পরিস্থিতিতে সৈনিক প্রকাশ হয়েছিল?

একুশে ফেব্রুয়ারিতে সংগৃহীত তথ্য নিয়ে সৈনিকের বিশেষ শহীদ সংখ্যা বের হয়। ঢাকাতেই স্বল্প সময়ের মধ্যে হাজার হাজার সংখ্যা বিক্রি হয়ে যায়। আন্দোলনের ব্যাপারে সৈনিকের স্বাধীন মত জানার জন্য ছাত্র-জনতার প্রচুর আগ্রহ পরিলক্ষিত হয়। সৈনিকের অফিসে ভোর ছয়টা থেকে কারফিউর আগ পর্যন্ত (রাত নয়টা) ছাত্র-জনতার ভিড় লেগে থাকত সে সময়।

সৈনিকের এ ভূমিকার জন্য পুলিশের হামলা হয়নি?

হ্যাঁ, হামলা হয়েছিল। ২৩ ফেব্রুয়ারি রাত ৩টায় পুলিশ এসে সৈনিক অফিস ঘিরে ফেলে। আমরা আগে থেকেই পরিস্থিতি আঁচ করে একটু সতর্ক ছিলাম। কাসেম সাহেবের স্ত্রী বুদ্ধি করে দরজা না খুলে অনেকক্ষণ পুলিশের কার্যক্রম নিয়ে তাদের সামনে বিতর্কে মেতে ওঠেন এবং আমাদের নিরাপদে পালিয়ে যাওয়ার সময় করে দেন।

আমরা শেখ সাহেব বাজারের কবরস্থান ও জঙ্গলের ভেতর দিয়ে অগ্রসর হয়ে অপরদিকের কারো বাড়িতে গিয়ে আশ্রয় নেয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু ভয়ে কেউ দরজা খুলে আশ্রয় দেয়নি। ফলে আমি ও কাসেম সাহেব জঙ্গলেই কাটাই। খুব ভোরে মসজিদে নামাজ পড়ে আমি নবাবগঞ্জে আমার পুরনো লজিং বাড়িতে আশ্রয় নিই। কাসেম সাহেবও পাশের এক বাড়িতে আশ্রয় নেন। লজিংয়ের ছেলেরা দিনের বেলায় আমাকে একটি গুদামঘরের বাইরে তালা দিয়ে সতর্কতার সঙ্গে পাহারা দিত এবং কাসেম সাহেবের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করত।

এরপর উভয়ে ঢাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই।৷ ঢাকা ত্যাগের আগে গোপনে একবার ইকবাল হলে যাই, কিন্তু দুর্ভাগ্য এমন যে তখন‍ই পুলিশ এসে হল ঘেরাও করে। আমি কোনো প্রকারে বর্তমান ইডেন কলেজের পাশ দিয়ে (সে আমলের মেথর পট্টি) হল থেকে ফিরে আসি।

এরপর ঢাকার বাইরে চলে যাই। প্রথমে ময়মনসিংহে কাসেম সাহেবের শ্বশুরবাড়ি যাই। সেখানেও পুলিশ টের পেয়ে যায়। অতঃপর কুষ্টিয়ার ড. সদরুদ্দীনের বাড়িতে এবং তারপর ভেড়ামারার ব্যারিস্টার আবদুল হকের (পরবর্তীকালে জাগদল নেতা) বাড়িতে থাকি। এভাবে বেশ কিছুদিন ঘুরে বেড়ানোর পর পুনরায় ঢাকা ফিরে আসি।

তমদ্দুন মজলিসের কর্মতৎপরতা কি ঢাকার বাইরেও বিস্তৃত ছিল? ’৫২ সালে ঢাকার বাইরে কারা আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন এবং গ্রেফতার হয়েছিলেন বলতে পারেন?

হ্যাঁ, ঢাকার বাইরেও মজলিসের কর্মতৎপরতা বিস্তৃত ছিল। ’৫২ সালে বিভিন্ন জেলায় অনেক তমদ্দুন মজলিস সংগঠক এবং কর্মী আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছেন। অনেকে গ্রেফতার হয়েছেন।

চট্টগ্রাম থেকে আজিজুর রহমান, মাহফুজুর রহমান (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যাপক), চৌধুরী শাহাবুদ্দীন খালেদ (চট্টগ্রাম তমদ্দুন মজলিসের প্রতিষ্ঠাতা, পরবর্তীকালে চট্টগ্রাম সিটি কলেজের অধ্যাপক। তিনি কাসেম সাহেবের প্রাক্তন ছাত্র ছিলেন) আন্দোলনে অংশ নেন।

রংপুর থেকে অধ্যাপক গোলাম আযম ও (তখন রংপুর কারমাইকেল কলেজের অধ্যাপক) জমির উদ্দীন (তিনিও ওই কলেজের অধ্যাপক) আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। অধ্যাপক গোলাম আযম গ্রেফতার হয়েছিলেন।

রাজশাহী থেকে অংশ নেন আনসার আলী (বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট)।

কুমিল্লা থেকে আন্দোলনে অংশ নেন শওকত আলী, শফিউল হক ও মো. নুরুল্লাহ।

ফরিদপুর থেকে বাহাদুর মুন্সি (তখন কলেজের ছাত্র, পরবর্তীকালে ইপিসিএস অফিসার। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তিনি মুন্সিগঞ্জের এসডিও ছিলেন), নূরুদ্দীন আহমদ (ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুলের ভাইস প্রিন্সিপ্যাল), আনজুমান মনোয়ার হোসেন প্রমুখ।

খুলনা থেকে আন্দোলনে অংশ নেন এসএম আমজাদ হোসেন (প্রাক্তন মুসলিম লীগ মন্ত্রী) ও মমিন উদ্দিন। ৷

কুষ্টিয়া থেকে এমএ সাত্তার (কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের সিনিয়র প্রফেসর)।

বগুড়া থেকে মসিউল ইসলাম (অ্যাডভোকেট, সুপ্রিম কোর্ট)।

সিলেট থেকে অংশ নেন আরব আলী (এখন ইংল্যান্ডে আছেন), মাসুদ খান (সন্তোষ সিটি ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের টেকনিক্যাল কলেজের প্রিন্সিপ্যাল) প্রমুখ।

[মোস্তফা কামালের ভাষা আন্দোলন: সাতচল্লিশ থেকে বায়ান্ন গ্রন্থ থেকে ওপরের সাক্ষাৎকারটি সংকলিত হয়েছে। গ্রন্থটি ১৯৮৭ সালে বাংলাদেশ কো-অপারেটিভ বুক সোসাইটি লি. প্রকাশ করে। সাক্ষাৎকারটি নেয়া হয়েছিল ১৯৭৮ সালের সেপ্টেম্বরে]