বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। প্রতিনিয়ত বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের চাহিদা বিশ্ববাজারে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে।
নিটওয়্যার উৎপাদনের জন্য স্থানীয়ভাবে সুতা তৈরি থেকে শুরু করে পোশাকের সুতার রঙ করা, পোশাকের নকশা করা ও ফিনিশিং পর্যন্ত সবকিছু এখন বাংলাদেশেই হয়। এ সেক্টরের মূল শক্তি হলো এর ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ। বর্তমানে এ সেক্টরের প্রয়োজনীয় ফ্যাব্রিকের চাহিদার ৯০ শতাংশ বাংলাদেশেই তৈরি হচ্ছে। বাংলাদেশে নিটওয়্যার পোশাক তৈরির জন্য দুই হাজারটির বেশি স্বয়ংসম্পূর্ণ কারখানা রয়েছে। এছাড়া পোশাক সেলাই শিল্পে কর্মীদের রয়েছে অতুলনীয় দক্ষতা। বিশ্বে গুণগত মানের দিক থেকেও এগিয়ে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক। এ সেক্টরের উদ্যোক্তারা প্রডাকশনের সামগ্রিক ক্ষমতা বাড়াতে প্রচুর বিনিয়োগ করেছেন। বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের ১৫৩টি দেশে নিটওয়্যারের পোশাক রফতানি করে আসছে।
এ প্রবন্ধে গার্মেন্টস শিল্পে ফ্যাশন পণ্য উন্নয়নে ডিজাইন প্রক্রিয়া কীভাবে পরিচালিত হয় বা ডিজাইনাররা কীভাবে কাজ করেন, সে বিষয়টিকে মূলত প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। তবে শুরুতে বুনা (নিট) এবং বোনা (ওভেন) কাপড়/ম্যাটেরিয়াল নিয়ে সংক্ষেপে একটু আলোচনা করা হলো।
বুননকৃত কাপড় অথবা বুনা কাপড় তৈরির ক্ষেত্রে কাপড়ের সুতাগুলোর একটির সঙ্গে আরেকটি ইন্টারলেসিংয়ের মাধ্যমে বুনন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। একটি বুনা কাপড়ের কাঠামোর মূল উপাদান হলো লুপ। বুনা কাপড় খুব কাছে নিয়ে দেখলে সুতার ছোট লিংকগুলো অনেকটা ছোট বিনুনির মতো মনে হবে। প্রযুক্তিগতভাবে বুনা কাপড়ে দুটি ভিন্ন ধরনের সুতার ইন্টারলেসমেন্ট হয়। একটি ওয়ার্প-নিট, যা খাড়া বা উল্লম্ব লুপ ফ্যাব্রিক। এ কাপড়ের গঠনে ছোট ছোট বিনুনির মতো সুতাগুলো চেইনের মতো কাপড়ের ওপরে ও নিচে দেখা যায়। আরেকটি হলো ওয়েফট-নিট। এ কাপড়ের সমতল লুপ রয়েছে এবং ছোট ছোট বিনুনির মতো সুতা ইন্টারলেসমেন্ট হয়, যা কাপড়জুড়ে থাকতে দেখা যায়। বুনন শিল্পে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত নিটিং মেশিনগুলো হলো ফ্ল্যাট বুনন মেশিন ও বৃত্তাকার বুনন মেশিন। আরো অনেক ধরনের নিট মেশিন আছে, যা বিভিন্ন ধরনের নিট কাপড় তৈরি করে, যেমন সিঙ্গেল জার্সি বুনন মেশিন, ডাবল জার্সি, রিব, ইন্টারলক, জ্যাকার্ড বুনন মেশিন, টেরি, সার্কুলার বুনন মেশিন, ফ্লাট, সিমলেস ইত্যাদি। ওয়ার্প বুননের বৈশিষ্ট্যগুলোর ওপর ভিত্তি করে মেশিনগুলোকে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়। একটি ট্রাইকোট, আরেকটি রাশেল।
বোনা কাপড় মূলত তিন প্রকার, সেগুলো হলো ওয়েফট বোনা কাপড়, ওয়ার্প বোনা কাপড়, ক্রোশেট কাপড়। পোশাক কারখানায় নিট কাপড়গুলো দিয়ে যে পোশাকগুলো তৈরি হয় সেগুলো
হলো পোলো শার্ট, টি-শার্ট, সোয়েট শার্ট, খেলাধুলার পোশাক, সাঁতারের পোশাক, সোয়েটার, আন্ডারগার্মেন্টস, শিশুদের পোশাক ইত্যাদি। প্রতিটি কাপড়ের বৈশিষ্ট্য আলাদা হতে পারে, যা সুতার স্পেসিফিকেশন ও কাপড়ের গঠন বৈশিষ্ট্যের ওপর নির্ভর করে। বুননকৃত কাপড় কোমল, আরামদায়ক ও নমনীয় হয়। বুনা কাপড় তাদের আসল আকারের থেকে ৫০০ শতাংশ পর্যন্ত ইলাস্টিক হয়, যা তার বুনন প্যাটার্নের ওপর নির্ভর করে প্রসারিত হবে। লাইক্রার মতো প্রসারিত উপাদান দিয়ে বোনা ফ্যাব্রিক একটি স্থিতিশীল বুননের চেয়ে বেশি প্রসারিত হতে পারে। অন্য কাপড়ের থেকে বুনা কাপড়ের তৈরি পোশাকের ক্ষেত্রে বডি ফিটিংয়ের ওপর তেমন জোর দিতে হয় না।
অন্যদিকে ওভেন কাপড় অথবা বোনা কাপড় তৈরি করতে একটা লুম/তাঁতে সাধারণত দুটি স্টাইলে সুতার সেট থাকে, যা একে অন্যের ওপর বা নিচে দিয়ে প্রবেশের মাধ্যমে একটি প্যাটার্ন তৈরি করে। এ কাপড় তৈরি করতে কারখানাগুলোয় অনেক বড় বড় তাঁত/লুম ব্যবহার করতে হয়। বয়ন শিল্পে বাংলাদেশের কারখানাগুলোয় সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয় পাওয়ার লুম মেশিন। পাওয়ার লুমের তিনটি ক্যাটাগরি রয়েছে। সাধারণ পাওয়ার লুম মেশিন, আধুনিক তাঁত বা শাটললেস তাঁত মেশিন ও স্বয়ংক্রিয় পাওয়ার লুম মেশিন। যদি বোনা কাপড়ের একটি টুকরো খুব কাছ থেকে দেখা যায়, তবে এর গঠনটি খড়ের বা বাঁশের ঝুড়িতে থাকা আপ ও ডাউন প্যাটার্নের মতো দেখাবে। কিন্তু সব বোনা কাপড় একই বয়ন প্যাটার্নের নাও হতে পারে। উপাদানের ধরনের ওপর নির্ভর করে কিছু বোনা কাপড় নরম হয়। তবে বোনা কাপড় নানা রকম টেক্সচারের হয়, যেমন নরম, খসখসে, সিল্কি ইত্যাদি।
বুনন (নিট) বা বয়ন (ওভেন) যাই হোক না কেন, প্রতিটি কাপড়ের নির্মাণ পদ্ধতির স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এখানে নিট ও ওভেন দুই ধরনের ফ্যাশন পণ্যেরই ডিজাইন প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। ওভেন ও নিট ফ্যাব্রিক/কাপড় দিয়ে পোশাক তৈরির ডিজাইন প্রক্রিয়া একই। কিন্তু এ দুটি কাপড় তৈরির প্রক্রিয়া ভিন্ন। বুনা (নিট) কাপড় বোনা (ওভেন) কাপড় থেকে ব্যাপকভাবে আলাদা।
ডিজাইন বিভাগ বা ডিপার্টমেন্টকে একটি পোশাক কারখানার প্রাণকেন্দ্র বলা হয়ে থাকে। সেখান থেকে পোশাক তৈরির সব রকম পরিকল্পনা হয়ে থাকে। ডিজাইন প্রক্রিয়াটি শুরু হয় একজন ডিজাইনারের গভীর গবেষণার মাধ্যমে। ডিজাইন প্রক্রিয়ার দুটি ধারা রয়েছে। একটি ধারায় ফ্যাশন হাউজের ডিজাইনাররা কাজ করে থাকেন। গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রির ডিজাইনারদের ডিজাইন ধারাটি একটু আলাদা। ফ্যাশন ডিজাইন ডেভেলপমেন্ট নিয়ে কাজ করার জন্য একটা ইন্ডাস্ট্রির প্রথমত ডিজাইন স্টুডিও থাকা প্রয়োজন, যাতে একজন ডিজাইনার বা ডিজাইনার গ্রুপ নিজের সৃজনশীল কাজে মনোনিবেশ করতে পারে। সেই সঙ্গে প্রয়োজন হয় স্যাম্পল ডেভেলপমেন্ট। এক্ষেত্রে স্যাম্পল ডেভেলপমেন্ট ডিপার্টমেন্টকে নতুন নতুন ডিজাইনের কাজ করতে হয়। স্যাম্পল ডেভেলপমেন্ট ডিপার্টমেন্ট বা ডিজাইন স্টুডিও যেখানে থাকে না, সেই সব ইন্ডাস্ট্রির ডিজাইনাররা শুধু প্রডাক্ট ডেভেলপমেন্টের কাজ করে থাকেন। সেক্ষেত্রে বায়াররা নিজস্ব ডিজাইন ও টেকপ্যাক (টেকনিক্যাল তথ্য) পাঠিয়ে দেন। সেই টেকপ্যাক অনুযায়ী প্রডাকশনের কাজ হয়ে থাকে। সেখানে ডিজাইনারদের তেমন কোনো কাজ থাকে না। ডিজাইনাররা শুধু ফ্যাব্রিক, কালার ম্যাচিং এবং কাপড়ের অরনামেন্টেশনের সামান্য কিছু পরিবর্তন ইত্যাদি সমন্বয় করে ডিজাইনটি প্রডাকশনের জন্য প্রস্তুত করেন।
নিটওয়্যার ও ওভেনওয়্যার ইন্ডাস্ট্রিতে ডিজাইন প্রক্রিয়াটি ক্রেতাদের বা বায়ারের মতামতের ওপর নির্ভর করলেও বাংলাদেশের ডিজাইনারদের সাফল্যের কাহিনী বহু আগে থেকেই শুরু হয়েছে। আনুমানিক ২০০৫-০৬-এর দিক থেকেই বাংলাদেশের ডিজাইনারদের তৈরীকৃত ডিজাইনের পোশাক রফতানি করে আসছে আমাদের নিটওয়্যার ইন্ডাস্ট্রি। তবে আমরা খুব ভালোভাবে ডিজাইনারদের স্বীকৃতি দিতে পারিনি, এটা আমাদের ব্যর্থতা বলা যেতে পারে। আমাদের ডিজাইনগুলোর জন্য বায়াররা আলাদা পারিশ্রমিক প্রদান করে না, অথচ বিদেশী ডিজাইনারদের কাছ থেকে ডিজাইন নিতে হলে পারিশ্রমিক প্রদান করতে হয়।
একজন ডিজাইনার শৈল্পিক প্রতিভা ও সৃজনশীলতার অধিকারী হলে ডিজাইন উন্নত হয়। ডিজাইন করার জন্য প্রত্যেক ব্যক্তির নিজস্ব পদ্ধতি রয়েছে। তার পরও একজন ডিজাইনার বা ডিজাইনারদের একটি গ্রুপ নির্দিষ্ট ফরম্যাট তৈরি করে, যা একজন ডিজাইনার বা পুরো টিমের কাজকে আরো সহজ করে। গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রিতে ডিজাইন প্রক্রিয়াটি বিভিন্নভাবে হয়ে থাকে। ডিজাইন প্রক্রিয়ার কিছু বিষয় কাজ শুরু করার আগে পরিকল্পনা করতে হবে। ডিজাইনারদের কিছু আর্টিফ্যাক্ট বা সিস্টেমের মাধ্যমে ধারণা তৈরির পর ধারণাটি সুনির্দিষ্ট আকারে প্রকাশ করতে হয়, যা একটি পোশাক হিসেবে আমরা দেখতে পাই। কোনো স্থায়ী বা ফিক্সড পদ্ধতি সব ব্র্যান্ডের জন্য কাজ করে না। ডিজাইনারদের প্রতিটি ব্র্যান্ড সম্পর্কে ভালোভাবে ধারণা রাখতে হয়। কারণ কাজের প্রথমেই একজন ডিজাইনার একটি ব্র্যান্ডের নিজস্ব আইডেন্টিটি, নীতি, দর্শন ও চিন্তাধারা বুঝে দেশের আবহাওয়া, অর্থনীতি ও ক্রেতার স্টাইলের রীতিনীতির সঙ্গে ফ্যাশন ট্রেন্ডের সমন্বয় করে ডিজাইনটি সম্পন্ন করে। এর মধ্যে কিছু প্রক্রিয়া সংক্ষেপে আলোচনা করো হলো।
বাজার শনাক্তকরণ: ডিজাইনার যে দেশের জন্য ডিজাইন করবে, সে দেশের বাজার সম্পর্কে প্রথমে বিশদ গবেষণা করতে হয়। লিঙ্গ, বয়স, আবহাওয়া, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার ভিত্তিতে ডিজাইন পরিকল্পনা করে থাকে। এখানে বাজার হলো একদল মানুষ বা ভোক্তা। প্রতিটি মার্কেট সেগমেন্টের ডিজাইন থেকে ভোক্তার বিভিন্ন প্রয়োজনীয়তা ও প্রত্যাশা থাকে। এজন্য ডিজাইন সফলভাবে সেল করার জন্য ডিজাইনারকে এসব দিকে খেয়াল রাখতে হয়।
ব্র্যান্ডের আইডেন্টিটি বা পরিচয়: প্রতিটি কোম্পানির একটি নির্দিষ্ট আইডেন্টিটি থাকে এবং নির্দিষ্ট ক্রেতা থাকে। যার মাধ্যমে একটি ব্র্যান্ড গ্রাহকের বিশ্বাস অর্জন করে। গ্রাহক বা কাস্টমার যাতে এ ব্র্যান্ডে এসে আবার ফিরে না যায় সেদিকে খেয়াল রেখেই ডিজাইন করতে হয়।
ধারণা: কনসেপ্ট বা ধারণা ডিজাইন প্রক্রিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ডিজাইন তৈরি করতে ডিজাইনটির কনসেপচুয়াল জায়গাগুলো নিয়ে কাজ করতে হয়। এখান থেকেই ডিজাইন প্রক্রিয়া শুরু এবং নকশার মৌলিক আকৃতি সম্পর্কে একটা লেআউট তৈরি হয়। তার সঙ্গে যুক্ত হয় মুড বোর্ড, থিম বোর্ড, কালার বোর্ড, ইন্সপিরেশন বা অনুপ্রেরণা বোর্ড, মোটিভ ডেভেলপমেন্ট বোর্ড, ড্রেসের স্টাইল, বিভিন্ন অ্যাকসেসরিজ এবং ফ্যাব্রিকের বিভিন্ন নমুনা। একই সঙ্গে নান্দনিকতা, সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনী ডিজাইন তৈরি করা খুবই চ্যালেঞ্জিং কাজ।
নকশা প্রক্রিয়া: ডিজাইনাররা একটি প্রকল্প শুরু করার আগে সঠিক গবেষণা এবং পরিকল্পনা করেন। এখানে যে প্রশ্ন উঠতে পারে তা হলো এ বিশেষ পর্যায়ে কতটা সময় দিতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, কখনো একটি ডিজাইন তৈরির কাজ শুরু হয় কাপড় বুনন বা বয়নের সময় থেকেই। নকশা প্রিন্ট অথবা সূচিশিল্প হয়ে থাকে, যা পোশাককে আরো নান্দনিক করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। ফ্যাশন ট্রেন্ড ফোরকাস্টিং বা ক্রেতা কোন ডিজাইনের প্রতি ঝুঁকছেন সে বিষয়ক তথ্য একত্র করে একজন ডিজাইনার তার পোশাকের নকশার কাজটি ভিন্ন সময় নিয়ে সম্পন্ন করেন।
ফ্যাশনপ্রবণতা পূর্বাভাস: ডিজাইনার বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফ্যাশন শো, ফ্যাশন প্রদর্শনী এবং ট্রেন্ড শোতে অংশগ্রহণের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী সর্বশেষ ফ্যাশন ট্রেন্ডের সঙ্গে আপটুডেট থাকেন। দেশে ফিরে এসে তাদের এ ধারণাগুলো নকশা প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করেন। এ ট্যুরগুলো খুবই প্রয়োজনীয়, কারণ দেশে বসে আন্তর্জাতিক বায়ার বা কাস্টমারের চাহিদা ও পছন্দগুলো বুঝে ওঠা সম্ভব হয় না। তাই এসব এক্সিবিশনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে ডিজাইনের ধারণা অনেক অংশে পরিষ্কার হয়ে যায়। এছাড়া ডিজাইনার অনলাইন ও অফলাইন ভোক্তাদের পছন্দ বিশ্লেষণ করেও ভবিষ্যতের ফ্যাশনপ্রবণতার পূর্বাভাস করে থাকেন। এসব তথ্য কাজে লাগিয়েই তারা ডিজাইন করেন।
ডিজিটাল দক্ষতা: নিজস্ব ড্রইং দক্ষতার পাশাপাশি একজন ডিজাইনারের বিভিন্ন ধরনের ডিজিটাল সফটওয়্যার যেমন ইলাস্ট্রেটর, ফটোশপ ও প্যাটার্ন ক্যাডের দক্ষতা থাকে। প্রযুক্তির আবির্ভাব বাংলাদেশের নিট সেক্টরে এবং ওভেন ফ্যাশন ডিজাইনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। বর্তমানে ক্লো নামক একটি নতুন সফটওয়্যার সংযুক্ত হয়েছে, যা থ্রি ডাইমেনশনাল ডিজাইন করতে সাহায্য করে। ক্লো সফটওয়্যারের মাধ্যমে ডিজাইনার এখন গার্মেন্টসটি বাস্তবে দেখতে কেমন হবে তা স্যাম্পল মেকিংয়ের আগেই ফিড টেস্ট হিসেবে দেখতে পারে এবং বায়ারকে তার ডিজাইন সিলেকশনের জন্য পাঠাতে পারে। এছাড়া গার্বার সফটওয়্যার রয়েছে, যা প্যাটার্ন মেকিং করার জন্য গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রিতে ব্যবহার হয়ে থাকে। গার্বার টেকনোলজি একটি সমন্বিত সফটওয়্যার এবং অটোমেশন টেকনোলজি, যা পোশাক নির্মাতাদের কাজ করার পদ্ধতিকে পরিবর্তন করে সহজ করেছে এবং দ্রুতগতি দিয়েছে।
ফর্ম: এ পর্যায়ে নকশার প্রকৃত কাজ শুরু হয়। হাতে-কলমে নকশার গঠন, কাটিং, রং করা, ডিজাইনের আকৃতি এবং তার মাধ্যমে প্রোটোটাইপ তৈরি করা হয়। এ প্রোটোটাইপগুলো ম্যানুয়াল প্যাটার্নের মাধ্যমে করা হয়ে থাকে। আইডিয়া বা ধারণাগুলো বাস্তবে রূপ নেয়ার আগে অনেকবার পরিবর্তন হতে পারে। ডিজাইনার চূড়ান্তভাবে পণ্যটির ডিজাইন শেষ করে প্রডাক্টটি উৎপাদনের জন্য কারখানায় পাঠিয়ে দেন। ভোক্তারা কেবল পণ্যটিই দেখেন। পণ্য এবং নকশার সাফল্যের পেছনে থাকে যত্নশীল, আন্তরিক পরিকল্পনা, গবেষণা ও সঠিক উৎপাদন সিদ্ধান্ত।
পণ্যের খরচ অথবা প্রডাক্ট কস্টিং: এ বিষয় অতি গুরুত্বপূর্ণ। ডিজাইন করার সময় ডিজাইনারকে পণ্যের খরচের ওপর নজর রাখতে হয়। পণ্যটি তৈরি করতে কী পরিমাণ খরচ হয়েছে এবং তার বাজারমূল্য কত তা বুঝতে হয়। খরচের প্রভাবটি ডিজাইনের সঙ্গে সরাসরি জড়িত।
পণ্যের মান পরীক্ষাকরণ: উৎপাদনের বিভিন্ন পর্যায়ে পণ্যের গুণমান পরিদর্শন করে থাকেন ডিজাইনাররা। গুণমান পরিদর্শন ছাড়া কখনই সফল ডিজাইন করা সম্ভব হয় না। বিভিন্ন কোণ থেকে পণ্যের মান পরীক্ষা করা হয়। যেমন নান্দনিকতা, পণ্যের পারফরম্যান্স বা কর্মক্ষমতা, স্থায়িত্ব, শক্তি, কার্যকারিতা ইত্যাদি। এ পণ্যগুলো সব পরীক্ষায় চূড়ান্তভাবে উত্তীর্ণ হয়ে গ্রাহক বা ভোক্তাদের চাহিদা মেটাতে প্রস্তুত হয়।
পণ্যের ডিজাইন চূড়ান্তকরণ: একবার একটি ডিজাইন স্যাম্পল বায়ার বা ক্রেতা দ্বারা নির্বাচন সম্পন্ন হলে তা চূড়ান্ত নকশা অনুমোদন না হওয়া পর্যন্ত সমন্বয় করা হয়ে থাকে। একজন অভিজ্ঞ ডিজাইনারের নকশা তেমন পরিবর্তন করতে হয় না। ডিজাইনটি চূড়ান্তভাবে অনুমোদনের পর ব্যাপক পরিসরে উৎপাদনের জন্য কারখানায় প্রেরণ করা হয়। তবে এসব ডিজাইনের প্রস্তুতি সব ব্র্যান্ডের জন্য একই রকম নাও হতে পারে। প্রকৃত প্রক্রিয়া ব্যবসার আকার, বাজারের লক্ষ্য এবং নির্দিষ্ট ব্যবসায়িক মডেলের ওপর ভিত্তি করে পরিবর্তন হতে পারে।
এভাবে একটি ডিজাইন এবং ডিজাইনিং প্রক্রিয়া শিল্প, নান্দনিকতা, সৃজনশীলতা, কৌশলগত ব্যবস্থাপনা, ভালো গবেষণা ও চমৎকার বিশ্লেষণের সমন্বয়ে গঠিত হয়। বাংলাদেশের নিট ও ওভেন সেক্টরের ফ্যাশন ডিজাইন অসংখ্য বাংলাদেশী প্রতিভাবান দক্ষ ডিজাইনার দ্বারা চালিত হয়ে আসছে, যারা এ দেশে বসে সারা পৃথিবীর মানুষের জন্য ডিজাইন করছেন। তবে ডিজাইনের প্রক্রিয়াটি খুব সহজ নয়। যখন একজন সৃজনশীল ডিজাইনার ডিজাইন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে কাজটি বাস্তবায়ন করেন এবং শেষ পর্যন্ত ডিজাইনগুলো উৎপাদনের জন্য বিদেশী ক্রেতা দ্বারা নির্বাচিত হয়, তখন একজন ডিজাইনারের সৃজনশীল কাজটি সার্থক হয়।
পোশাক শিল্পে এবং বাংলাদেশের ফ্যাশন ডিজাইন সেক্টরে কাজ করার জন্য বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা শিক্ষা কার্যক্রম শেষ করে শুধু বাংলাদেশেই কাজ করছে না, বিভিন্ন দেশে নানাবিধ ব্র্যান্ডের বায়িং অফিসগুলোর প্রধান শাখায় কর্মরত রয়েছে। ফ্যাশন শিক্ষার্থীরা ফ্যাশন স্টাডিজ এবং ফ্যাশন ডিজাইন অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগ থেকে ফ্যাশন ডিজাইন এবং প্রডাক্ট ডেভেলপমেন্টের বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষা গ্রহণ করে। এ শিক্ষার মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থী বাজার এবং ফ্যাশনের প্রবণতার ওপর ভিত্তি করে পণ্যের ধারণা এবং প্রডাক্ট বা পণ্যের লাইন তৈরি করতে পারেন। তার সঙ্গে টেক্সটাইল ও কাঁচামালের ওপর দক্ষতা অর্জনসহ স্টোর ও ভোক্তাদের কাছে তৈরি পণ্য সরবরাহ করার জন্য উৎপাদন কৌশল রপ্ত করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রমে সাসটেইনেবল বা টেকসই ফ্যাশনের ওপর অনেক গুরুত্ব দেয়া হয়। ছাত্র-ছাত্রীরা পরিবেশবান্ধব পণ্যের ওপর অনেক প্রকল্প বাস্তবায়ন করেন। কালচারাল ফ্যাশনের ওপরও একইভাবে গুরুত্ব প্রদান করা হয়ে থাকে। তারা নানান রকম দেশীয় কাপড় ডিজাইন করা থেকে শুরু করে পুরো একটি কালেকশন প্রস্তুত করে থাকেন। সকল প্রকার ডিজিটাল দক্ষতার ওপর জোর দেয়া হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ডিজিটাল দক্ষতার পরিবর্তনের দিকে খেয়াল রেখে ক্লাস ল্যাবগুলোকে আধুনিকায়ন করা হয়। ছাত্র-ছাত্রীরা তাদের পাঠ্যক্রমের চূড়ান্ত বছরে প্রকল্প তৈরি করার সময় অঙ্কন, নকশা, নির্মাণ, প্রযুক্তিগত এবং শিল্পের মান ও সফটওয়্যার দক্ষতার পরিপূর্ণ একটি নথি তৈরি করে, যার মধ্যে একটি সম্পূর্ণ পণ্য লাইন এবং একটি বাস্তবায়ন কৌশল অন্তর্ভুক্ত থাকে।
ক্যারিয়ার হিসেবে ফ্যাশন ডিজাইন বা পোশাক শিল্পকে বেছে নেয়া প্রথমে দুঃসাধ্য মনে হতে পারে। এ পেশা একটি দুর্দান্ত পেশা কেন তার স্বপক্ষে অনেক যুক্তি রয়েছে। প্রথমত, ফ্যাশন ডিজাইন হলো সৃজনশীল ক্যারিয়ারগুলোর মধ্যে একটি, যা আপনি বেছে নিতে পারেন। ফ্যাশন ডিজাইন একটি ক্রমবর্ধমান শিল্প। একজন ডিজাইনার হিসেবে আপনি আপনার নিজের ক্যারিয়ারের পথ নিজে নিয়ন্ত্রণ করবেন। আপনাকে স্ক্র্যাচ থেকে ডিজাইনও তৈরি করতে হবে, যার মানে আপনার অনেক কল্পনা ও সৃজনশীলতার প্রয়োজন হবে। ভবিষ্যতে ফ্যাশন ডিজাইন সবচেয়ে ফলপ্রসূ ক্যারিয়ারগুলোর মধ্যে একটি। সুতরাং আপনি যদি পোশাক ডিজাইন করতে আগ্রহী হন এবং ফ্যাশন জগতে নাম করতে চান, তবে ফ্যাশন ডিজাইনকে ক্যারিয়ার হিসেবে বেছে নেবেন অবশ্যই।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ফ্যাশন স্টাডিজ বিভাগ
বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজি





