গ্রিন ফ্যাক্টরিগুলোকে অন্য আট-দশটি সাধারণ ফ্যাক্টরির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করেই বায়ারদের কাছে পণ্য সরবরাহ করতে হচ্ছে। আগামী দু-তিন বছর যদি দেশের গ্রিন ফ্যাক্টরিগুলো টিকে থাকতে পারে এবং ২০২৬ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ডিউটিলাইজেশন প্রণীত আইন বাস্তবায়ন হয়, তবে গ্রিন ফ্যাক্টরিগুলো মূল্যায়িত হবে। গ্রিন ফ্যাক্টরির বিভিন্ন দিক নিয়ে কথা বলেছেন নারায়ণগঞ্জের জালকুঁড়িতে অবস্থিত ফতুল্লা অ্যাপারেলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বিকেএমইএর সহসভাপতি ফজলে শামীম এহসান। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বণিক বার্তার নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি আমির হুসাইন স্মিথ

গ্রিন ফ্যাক্টরি করার ভাবনা এল কীভাবে?

ছোটবেলা থেকেই একটু খোলামেলা সবুজের মধ্যে থাকতে ভালো লাগে। ছোটকালে ঢাকা রেসিডেনশিয়াল মডেল স্কুলে পড়াশোনা করছি। প্রায় ৬০ একর ভূমির ওপর নির্মিত দেশের অন্যতম স্কুলটি। সেখান থেকেই খোলামেলা জায়গা আমার খুব পছন্দ। আমি যখন ফ্যাক্টরি করি, তখন থেকেই চিন্তা করি কীভাবে ফ্যাক্টরির ভেতরে একটু আলো থাকবে, একটু দক্ষিণা বাতাস আসবে। পাখির কলতানের আওয়াজ থাকবে এমন একটি পরিবেশ সৃষ্টির। সে বিষয়গুলো মাথায় রেখে ফ্যাক্টরি নির্মাণকাজ শুরু করি। সোলার ইনস্টল, ওয়াটার রিসাইকেলিং স্থাপন করি। পরে বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক সাহেবের সঙ্গে এসব বিষয় নিয়ে কথা হলে তিনি আমাকে পরামর্শ দেন তুমি যখন এসব স্থাপন করছোই, তবে কেন লিড সার্টিফিকেশনে যাচ্ছো না। তার অনুপ্রেরণায়ই মূলত লিডের দিকে যাওয়া এবং লিড সার্টিফিকেট নেয়া। বর্তমানে ফতুল্লা অ্যাপারেলস গ্রিনের ক্ষেত্রে ৯৭ পয়েন্ট লিডে আছে।

একটি গ্রিন ফ্যাক্টরির মৌলিক বৈশিষ্ট্য কী কী?

গ্রিন ফ্যাক্টরি বলতে আমরা মনে করি সবুজ গাছপালা থাকবে, এমন কিছু। আসলে বিষয়টা এমন নয়। গ্রিন ফ্যাক্টরির দুটি দিক। ফ্যাক্টরির নির্মাণকাজের সময় পরিবেশের যত কম ক্ষতি হয়, সেদিকে খেয়াল রেখে নির্মাণ করা। যেমন ফ্যাক্টরি নির্মাণে যে সিমেন্ট লাগবে তা কাছাকাছি কোনো ফ্যাক্টরি থেকে আনা। যাতে পরিবহনে কার্বনটা কম লাগে, পরিবেশের ক্ষতিটা কম হয়। ঠিক তেমনভাবে রড, সিমেন্ট, ইট, বালিসহ নানা নির্মাণসামগ্রী কাছাকাছি থেকে ক্রয় করা। একই সঙ্গে মাটির ওপর টপ সয়েল সংরক্ষণও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মাটির উপরিভাগের টপ সয়েল তৈরি হতে কয়েকশ বছর লাগে। বৃষ্টির পানি, বিভিন্ন জৈব সার ও প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে তৈরি হয় টপ সয়েল। ফ্যাক্টরি করতে গিয়ে আমরা উপরিভাগের মাটি যাতে নষ্ট না করে ফেলি, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। এ মাটিকে রিজার্ভ এবং পুনরায় ব্যবহার করতে হবে। এ রকম ছোট ছোট জিনিস সংরক্ষণ করতে হবে। ফ্যাক্টরিতে পানি ব্যবহারে যে কল থাকবে, তা দিয়ে যেন অতিরিক্ত পানি না বের হয়। ফ্লাসের ব্যাপারে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার করতে হবে। বিল্ডিং মেটেরিয়ালসগুলো রিসাইক্লিং করে ব্যবহার করতে হবে। ভবনের ছাদ সাদা বা হালকা রঙের হতে হবে, যাতে সূর্যের আলোর প্রতিফলন বেশি না হয়। আমার যে রাস্তা সেটি ব্লকের, যাতে বৃষ্টির পানি জমে না থেকে সহজে মাটির নিচে চলে যেতে পারে। মাটি যেন পানির লেভেল না হারায়। ভবনটি নির্মাণ হওয়ার পর যখন ব্যবহার হবে, তখন যাতে পরিবেশের কোনো ক্ষতি না হয়, পুরো ফ্যাক্টরিটি যাতে পরিবেশবান্ধব হয়। জলাধার সংরক্ষণসহ যত বেশি জায়গা খালি রাখতে পারবেন, তত বেশি সবুজায়ন হবে, অক্সিজেন বাড়বে, এ রকম ছোট ছোট বিষয় নিয়ে একটি সবুজ কারখানা হয়। এতে লিড পয়েন্ট বাড়বে। শুধু সবুজ বা খালি জায়গা রাখা শর্ত নয়।

বায়ারদের কাছে বাংলাদেশের আরএমজি খাতের ইমেজ আরো ইতিবাচক করার ক্ষেত্রে গ্রিন ফ্যাক্টরি কেমন ভূমিকা রাখছে?

অবশ্যই বড় ধরনের ভূমিকা রেখেছে। দেখেন এর আগে আমরা সেফটি, কমপ্লায়েন্স, চাইল্ড লেবার নিয়ে কাজ করেছি। প্রত্যেকটি বিষয় ছিল বায়ারদের চাপিয়ে দেয়া শর্ত। আমরা ভুল করেছি, তাদের চাপে সেগুলো সংশোধন করে আমরা এগিয়ে গেছি। এগুলোর কোনোটিই আমাদের ইচ্ছায় ছিল না। কিন্তু গ্রিন ফ্যাক্টরিগুলো বাংলাদেশের মালিকরা বায়ারের চাপে করেনি। স্বেচ্ছায়, স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে করেছে। আন্তর্জাতিকভাবে আমাদের ইমেজ বৃদ্ধিতে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। বর্তমানে দেশে দুই শতাধিক গ্রিন ফ্যাক্টরি গড়ে উঠেছে। যেগুলো লিড সার্টিফায়েড প্রাপ্ত। ফলে আন্তর্জাতিক বিশ্বে পোশাক সোর্সিং কান্ট্রিতে সবুজ কারখানা হিসেবে আমরা পরিচিত হতে যাচ্ছি। এর একটি পজিটিভ ইমপ্যাক্ট আছে।

গ্রিন ফ্যাক্টরির সংখ্যা বাড়াতে সরকার কি কোনো ভূমিকা রাখছে?

এক্ষেত্রে সরকার দ্বিমুখী আচরণ করছে বলা যায়। কিছু ক্ষেত্রে গ্রিন ফ্যাক্টরি করার সহযোগিতা করছে। যেমন বাংলাদেশ ব্যাংক গ্রিন ফ্যাক্টরি করার জন্য নানা সুবিধা দিচ্ছে। অন্যদিকে, এনবিআর বাধা সৃষ্টি করছে। সরকার বিদ্যুৎ লাইন দিতে পারছে না। বিদ্যুতের সঞ্চালন লাইন অনেক ব্যয়বহুল। সেখানে সোলার আমি কিন্তু পাচ্ছি। এখানে সরকারের কোনো ইনভেস্টমেন্ট নেই। যেখানে সরকারের গ্রিন ফ্যাক্টরিগুলোকে ভর্তুকির দেয়া কথা, সেখানে উল্টো সোলারের ওপর কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৩০, ৪০, ৫০ শতাংশ ট্যাক্স আরোপ করে রেখেছে। এতে আমার মনে হয়েছে কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরকার উৎসাহিত করেছে আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে গ্রিন ফ্যাক্টরি নির্মাণে অনুৎসাহিত করছে।

গ্রিন ফ্যাক্টরি উৎপাদনে কোনো ইতিবাচক প্রভাব রাখে কি?

উৎপাদনে গ্রিন ফ্যাক্টরির ইতিবাচক প্রভাব আছে। যেকোনো গ্রিন ফ্যাক্টরিতে গিয়ে দেখবেন কাজের পরিবেশ খুব ভালো। কারণ গ্রিন ফ্যাক্টরিতে সবুজায়ন, ডে লাইট সেভিংস, ইলেকট্রিসিটির কম ব্যবহার করে দিনের আলোর ব্যবহার বৃদ্ধি এবং ভেতরে কার্বন ডাই-অক্সাইড ও টেম্পারেচারের পরিমাণ কমিয়ে রাখতে হয়। মূলত কাজের উন্নত পরিবেশের কারণে শ্রমিকের উৎপাদন সক্ষমতা বেড়ে যায়।

সাধারণ ফ্যাক্টরির সঙ্গে গ্রিন ফ্যাক্টরিগুলো প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে কিনা? কারণ সাধারণ ফ্যাক্টরিতে বেশি ওয়ার্কার বেশি প্রডাকশন, কিন্তু গ্রিন ফ্যাক্টরিতে অনেক জায়গা খালি রেখে সবুজায়নসহ অনেক শর্ত পূরণ করতে হয়।

হ্যাঁ, গ্রিন ফ্যাক্টরির অনেক বিষয় পজিটিভ থাকলে আমরা এ বিষয়ে নেগেটিভ আছি। পরিবেশের স্বার্থরক্ষা করে একটি গ্রিন ফ্যাক্টরি নির্মাণ করতে গিয়ে অনেক খরচ পড়ে। কিন্তু পরিবেশ রক্ষা করা আমাদের সবার দায়িত্ব ও কর্তব্য। পরিবেশের ক্ষতি হলে তো আমার আপনার দেশের ক্ষতি। গ্লোবাল একটা ইমপ্যাক্ট পড়ে। পরিবেশ রক্ষায় কনজিউমারকে এগিয়ে আসতে হবে। শুধু উদ্যোক্তাদের একা এগিয়ে এলে হবে না। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য আমরা যারা গ্রিন ফ্যাক্টরি করেছি, ইনভেস্টমেন্ট করেছি আমাদের প্রডাকশন অন্য একটি সাধারণ ফ্যাক্টরি থেকে কিছুটা কম। আমরা খোলামেলা ফ্যাক্টরি করেছি। আলো-বাতাস আসার জায়গায় যদি ফ্যাক্টরি নির্মাণ করতাম, তবে আরো বেশি শ্রমিক কাজে লাগিয়ে প্রডাকশন বাড়াতে পারতাম। বায়াররা গ্রিন ফ্যাক্টরির জন্য বাহবা দিচ্ছে। কিন্তু দামের বেলায় এক পয়সাও বাড়াচ্ছে না। অন্য একটি সাধারণ ফ্যাক্টরির সঙ্গে কম্পিটিশনে আমাদেরও রাখছে। মানে বায়ারদের তেমন সহযোগিতা পাচ্ছি না।

একদিকে গ্লোবাল সিচুয়েশন খারাপ, বৈষয়িক অর্থনীতির মন্দা ও তার ওপর দেশে নতুন করে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি কীভাবে মোকাবেলা করছেন?

মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়ে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি। একে তো গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি পেয়েছে, তার ওপর সঞ্চালন লাইনে গ্যাসের প্রেসার নেই। আগে ১০০ টাকা দিয়ে যে বাতাস কিনতাম, এখন তা ৩০০ টাকা দিয়ে কিনছি। আমার কারখানায় প্রডাকশন হচ্ছে না, কিন্তু তিন গুণ খরচ বেড়েছে। আমরা যদি প্রডাকশন বাড়াতে পারতাম, তবে আমি বায়ারকে বলতে পারি আমার উৎপাদন খরচ বেড়েছে, তুমি আমাকে শেয়ার করো। গ্যাসের প্রেসার না বাড়িয়ে তিন গুণ দাম বেশি নেয়ায় শিল্পমালিকরা নিঃশেষ হয়ে পড়ছে। আমার ডায়িং ফ্যাক্টরিতে আগে ৮০ লাখ টাকা গ্যাস বিল দিতাম। এখন মূল্যবৃদ্ধি পাওয়ায় পৌনে ৩ কোটি টাকা বিল পরিশোধ করছি, কিন্তু গ্যাস পাচ্ছি না। এতে প্রতি মাসে আমাদের মোটা অংকের লোকসান গুনতে হচ্ছে, যা মোকাবেলা করা খুব কঠিন হয়ে পড়েছে।

নিট সেক্টর নারায়ণগঞ্জের আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে কেমন ভূমিকা রাখছে?

নারায়ণগঞ্জের আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে নিট সেক্টর। ‌বিশ্বের এক নম্বর গ্রিন ফ্যাক্টরিগুলো নারায়ণগঞ্জে অবস্থিত। বড় বড় গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জে ছোট মাঝারি অনেক ফ্যাক্টরি গড়ে উঠেছে। এসব ফ্যাক্টরিতে অনেক লোকের কর্মসংস্থান এবং অনেক ছোট ছোট উদ্যোক্তা তৈরি হয়েছে, যা আর্থসামাজিক বলয় তৈরি করেছে। দেশের অর্থনীতির চাকাকে যেমন সচল করেছে, তেমনি সৃষ্টি করেছে মানুষের কর্মসংস্থান। আর নিট সেক্টর এক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশে গ্রিন ফ্যাক্টরিগুলোর ভবিষ্যৎ কেমন?

বাংলাদেশের গ্রিন ফ্যাক্টরিগুলোর ভবিষ্যৎ খুবই ভালো। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ডিউটিলাইজেশন যে আইনটা করেছে, ২০২৬ সালে তা বাস্তবায়ন হবে। এরই মধ্যে জার্মান ও জাপান সরকার গাইডলাইন দিয়েছে, ফ্রান্স অনেক আগেই দিয়েছে। প্রত্যেকটি গাইডলাইনে কিন্তু পরিবেশকে খুব গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। যত বেশি বায়ার দেশগুলো পরিবেশের ওপর গুরুত্বারোপ করবে, তত বেশি গ্রিন ফ্যাক্টরিগুলোর মর্যাদা বা প্রয়োজনীয়তা বাড়বে। বর্তমানে আমরা মূল্যায়নটা পাচ্ছি না। আশা করি, দু-তিন বছর পর তা পাব।